অবাঙালি বিয়ের খাওয়াদাওয়া এবং মুন্না মহারাজ

অবাঙালি বিয়ের খাওয়াদাওয়া এবং মুন্না মহারাজ

অরিজিৎ লাহিড়ী:কলকাতার পার্কস্ট্রিটের ম্যাকডোনাল্ডস ফ্যামিলি রেস্ট্রন্টে যায় নি, আমার সমসাময়িক এরকম ছেলে মেয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। ২০১৮’র জানুয়ারী থেকেই ম্যাকডোনাল্ডসের পার্কস্ট্রিট জয়েন্ট বন্ধ হয়ে ছিল দুই মালিক পক্ষের দশ বছর ব্যাপী আইনি বিবাদে। ম্যাকডোনাল্ডসের উত্তর ও পূর্ব ভারতীয় ফ্রাঞ্চাইজি ওনার কনট প্লাজা রেস্ট্রন্ট লিমিটেড এর কাছ থেকে লিজ নিয়ে এই ৩৫০০ স্কোয়ার ফিটের রেস্ট্রন্টটি শুরু করেন দীপক কুমার সিং। এর আগে দীপক কুমার সিং ও তার ভাই সঞ্জয় সিং এখানে ব্লু ফক্স নামে আর একটি রেস্ট্রন্ট চালাতেন। যাই হোক চলতি রেস্ট্রন্টের চাবি হস্তান্তর করে দেওয়া হয় পার্ক স্ট্রিট প্রোপারটিজের হাতে যারা ঘটনা চক্রে দীপক কুমার সিং কে নিজেদের জমিতে রেস্ট্রন্ট চালানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। আমার ম্যাকডোনাল্ডসের হ্যাপি মিল খেয়ে হ্যাপি হওয়ার কোনও কারণ আমি কোনও কালেই খুঁজে পাইনি। কেন জানি না,  ম্যাক ডির বার্গার আমার কোনওদিনই ভাল লাগত না। কিন্তু এই দীপক সিং ব্যক্তি টি কে নিয়ে আমার আগ্রহ বরাবরই খুব বাড়াবাড়ি রকমের। একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমার ঠাকুরদাদার মামারবাড়ির তরফের এক জ্যাঠামশায়ের আমন্ত্রণে তাঁর মেয়ের বিয়ের ভোজ খেতে আমরা গিয়েছিলাম আলিপুরের জাজেস কোর্ট রোড। সেসময় বাঙালি কমিউনিটিতে ব্যাংকুয়েট হল এবং ডাইনিং বুফে কনসেপ্ট প্রায় নেই বললেই চলে। পাত পেরে কোয়েশ্চেন পেপার সদৃশ মেনু কার্ড নিয়ে খাওয়ানোর রীতি ছিল। তো হঠাৎ করে সেই মাড়োয়ার ব্যাংকুয়েট  আর তার অন্দরের সাজ সজ্জা এবং বুফে তে দাঁড়িয়ে দম পুক্ত বিরিয়ানি আর বিভিন্ন মহাদেশীয় রান্না এবং শুকনো ফলের প্রায় আট রকম মিষ্টি দেখে এবং খেতে খেতে  মাথা ঘুরে গিয়েছিলো। সেসময় বিগ ফ্যাট ইন্ডিয়ান ওয়েডিং কথাটা সেরকম বাজার চলতি ছিল না। এর কিছুদিন পর লক্ষী নিবাস মিত্তলের মেয়ের বিয়ে সংক্রান্ত শঙ্করের একটি প্রতিবেদনে জানতে পারি এই ব্যাংকুয়েট এর মালিক মুন্না মহারাজের ব্যাপারে। যিনি এর অনেক আগে মুম্বই গিয়ে আদিত্য বিড়লার সুপুত্র কুমার মঙ্গলমের বিয়েতে পনেরো দিন ধরে ভালো মন্দ রেঁধে বেড়ে খাইয়ে এসেছেন অভ্যাগতদের।

 লক্ষ্মী মিত্তলের মেয়ের বিয়ের সঙ্গীত অনুষ্ঠানের জন্যে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মাত্র ৯ লক্ষ টাকাতে ভাড়া করা নিয়ে অনেক অকথা কুকথা অনেক হিংসুটে বাঙালি প্রচার করেছিলেন। তবে কি জানেন, পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার বাঙালি সমাজের একটা বিরাট অংশের মাড়োয়ারি সমাজের প্রতি মনোভাব যাই থাক, আমার তাতে মাড়োয়ারি বিয়ে বাড়িতে মহা ফুর্তিতে নিরামিষ সুস্বাদু ভোজ খাওয়ার ব্যাপারে কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি। এবার মুন্না মহারাজের গল্পে আসি।

স্বাধীনতার আগে বিহারের গয়া জেলার মুকুটবিঘা   থেকে কলকাতা  আসেন মহাবীর সিং, পেশায় হালোয়াই বা হালুইকর। কলকাতাতে বর্ধিষ্ণু মাড়োয়ারি  বিড়লা গোষ্ঠীর আদি বসবাস। বিড়লাদের পারিবারিক যে কোনো অনুষ্ঠানে রেঁধে বেড়ে খাওয়ানোর সময় ডাক পড়তো মহাবীর সিং এর। মহাবীরের তিন ছেলে রাজকুমার, দীপক আর সঞ্জয় এবং দুই মেয়ে। মাড়োয়ারি ক্যাটারিং সার্ভিসের এখন যা বাজার এমনটা কিন্তু সত্তর বা আশির দশকে ছিলোনা। রুইয়া, পাই এর একচেটিয়া  যুগ তখন। মাড়োয়ারিদের বলা যায় খানদানি শাকাহারি ধনকুবের। তাঁদের রান্নার স্বাদ ও পছন্দ বাঙালিদের থেকে কিছুটা আলাদা। তবে কলকাতায় অনেক পুরুষ ধরে থাকার কারণে রসগোল্লা সন্দেশ মিষ্টিদই এর ব্যাপারে তাঁদের দুর্বলতা দিন দিন বেড়েছে।  মহাবীর হালোয়াই সামান্য হালুইকর হিসেবে শুধু মাড়োয়ারি বাড়ির ভিয়েন সামলাতেন। পুরো রান্না নয়, গৃহকর্তার নির্দেশ মেনে শুধু মিষ্টি বানাবেন হালুইকর। বড়বাজার থেকে সাগরেদের সাথে সংগ্রহ করবেন মিষ্টি তৈরির সব প্রয়োজনীয় উপকরণ। মিষ্টি রেঁধে তার কাজ শেষ। নামমাত্র পারিশ্রমিক। মহাবীর চোখ বুজেছেন | পরিবারের হাল ধরতে হাতা খুন্তি নিয়ে ফিল্ডে নামলেন দীপক ওরফে মুন্না। ব্রেবোর্ন রোডের জৈন বিদ্যালয়ে ক্লাস টেনে উঠেছেন এবং বাবার অকালমৃত্যু, পরিবার ও বাবার সহযোগী কারিগরদের পেটের দায় দায়িত্ব…সব মিলিয়ে ঘেঁটে গিয়ে পরীক্ষাতে ফেল এবং পড়াশোনায় ইতি টেনে শুরু করলেন নীলাম্বর ক্যাটারার। চেনাশোনা বলতে বাবার পরিচিতরাই কেবল। আসতে আসতে হালুইকর থেকে ক্যাটারিং এর গোটা দায়িত্ব। তাঁর বাবার সূত্রে চেনা আদিত্য বিক্রম বিড়লার পুত্র কুমার মঙ্গলমের বিয়ের কাজ পাওয়া ব্যাপারটা খানিকটা পারিবারিক পরিচিতির জেরেই। ১৫ দিন ধরে চললো এলাহী খানা পিনা মুন্না মহারাজের ত্বত্তাবধানে | তখন বয়স মাত্র ২৫ | উড়ে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে মিত্তলের মেয়ে বনিসা মিত্তলের বিয়ের ভোজের রাঁধুনি হিসেবে সেই ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে। এখনো আলিপুরের অধিকাংশ ধনকুবের মাড়োয়ারি পরিবারে বিয়ে টু শ্রাদ্ধ সব কিছুর দায়িত্বে সেই এক এবং অদ্বিতীয় মুন্না মহারাজ এবং তার দেশ বিদেশের শেফের টীম |

বড়বাজারের জৈন বিদ্যামন্দিরের ক্লাস নাইন ফেল দীপক সিং এখন একসাথে চীন থেকে আমদানি করা রুপোর থালায় ১৫,০০০ জনকে বসিয়ে রেঁধে খাওয়ানোর ক্ষমতা রাখেন।

মুন্না ভোলেননি মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের ফ্ল্যাটবাড়ি এবং বাবা মহাবীরের ১০০ বর্গফুটের সেই আদি বাসস্থান, যেখান থেকে সব শুরু। সকাল ৯টা ১০টার দিকে দেশে থাকলে এখনো মুন্না ভাইকে পাওয়া যায় তাঁর সেই বড়বাজারের গদিতে তার স্বতীর্থদের সাথে রান্না বান্না নিয়ে আলোচনায়।  লডন স্ট্রিটে মিষ্টির দোকান ছাড়াও পূর্বোক্ত ১০০০০ স্কোয়ার ফিটের মাড়োয়ার ব্যাংকুয়েট এবং আরো বেশ কিছু ব্যাংকুয়েটের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। ভেজ ননভেজ হরেক কিসিমের রান্নার মাঝে তাঁর দুটি সিগনেচার ডিশ হলো জোধপুরী চিক্কি কি সবজি এবং ৯ রকমের বাদাম মিঠাই। রান্নাবান্নাতে চিনে স্বাদের ভক্ত মুন্না মহারাজ। তাঁর অনেক পরে এসেছে গণপতি, গণনায়ক, আনন্দ, পুগলিয়ারা…হ্যাঁ ! প্রতিযোগিতা অনেক বেশি এখন যার একটা বড় কারণ প্রচার অবশ্যই। মুন্নার  একচেটিয়া আধিপত্য পড়তির দিকেই কলকাতাতে। কিন্তু, চেন্নাই, মুম্বই বা ইন্দোরে ছড়িয়েছে সুনাম। সব মিলিয়ে ক্যাটারিং ব্যবসায় বিশ্বব্যাপী প্রতিপত্তি বিস্তারে সব থেকে উল্লেখযোগ্য ভারতীয় নাম এখনো মুন্না মহারাজ বললে বোধহয় বেশি বলা হবে না।

শেয়ার করুন

0Shares
0
ব্যঞ্জন সাম্প্রতিক