সিন্ধুসভ্যতা আবিষ্কারের শতবর্ষে হরপ্পায় দুগ্ধজাত পণ্যোৎপাদন ব্যবস্থার সন্ধান

সিন্ধুসভ্যতা আবিষ্কারের শতবর্ষে হরপ্পায় দুগ্ধজাত পণ্যোৎপাদন ব্যবস্থার সন্ধান

ভাস্বতী সাহা: চলতি বছরে সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের শতবর্ষ পূর্ণ হল। গবেষণা থেকে উঠে এল নতুন তথ্য― ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও দুগ্ধজাত খাবার উৎপন্ন করা হত হরপ্পায়।

গুজরাটের কোটদা ভাদলি থেকে উদ্ধারকৃত ৫৯টি মাটির পাত্রের অবশেষের ওপর গবেষণা করে পাওয়া গেছে প্রাচীনতম দুগ্ধজাত খাবারের প্রমাণ।

“হরপ্পা সভ্যতা বলতে সাধারণত আমরা বড় শহর বা নগরগুলি নিয়ে চর্চা করে থাকি কিন্তু তার পাশাপাশি সমান্তরাল অর্থনীতি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন ৷ হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনা, বাণিজ্য ব্যবস্থা ছিল অসাধারণ; গয়না নির্মাণেও হরপ্পাবাসী ছিল দক্ষ কিন্তু সেখানকার সামন্তপ্রভুদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বেশি আলোচনা পাওয়া যায়না ৷”― বললেন পুনে-র ডেকান কলেজ পোস্টগ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব বিভাগের প্রবোধ শ্রীভালকার৷

Indus Valley Civilization
সিন্ধুসভ্যতার নিদর্শন

কার্বন আইসোটোপ গবেষণা:

গবেষকদের দল মলিকিউলার বিশ্লেষণ প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে প্রাচীন মৃৎপাত্রগুলির ভগ্নাবশেষ পরীক্ষা করে দেখেছেন ৷ কল্যাণ চক্রবর্তী যিনি এই গবেষণার প্রথম পত্রটি লিখেছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো -এর নৃতত্ত্ব
বিভাগ থেকে, জানালেন― “পাত্রগুলি ছিদ্রযুক্ত তাই কোনও তরল এগুলিতে ঢাললে, তা শুষে নেয়৷ এই পাত্রগুলি খাবারের ফ্যাট এবং প্রোটিন অংশ ধরে রাখে। C16 ও C18 পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে লিপিডের উৎস সম্পর্কে জানা গেছে।”

হরপ্পার লোকেরা চিজ বা দই বানাতো কিনা সেই প্রশ্নের উত্তরে ডঃ চক্রবর্তী বলেন “নির্দিষ্ট করে কিছু বলা শক্ত৷ রান্নার বাসনে ছিদ্র দেখে ধরে নেওয়া যায় যে দুধ ফুটিয়ে খাওয়া হত৷ একটি ছিদ্রযুক্ত পাত্র পাওয়া গেছে যা দেখে মনে হয় গরম দুধ বা দই সেই পাত্রে করে পরিবেশন করা হত৷ ছিদ্রযুক্ত পাত্রগুলি অনেকটা ইউরোপের চিজ বানানোর পাত্রের মতো দেখতে ৷”

পশুপালন:

গবেষকের দলটি পশুপালনের দিকটিও তুলে ধরেছেন ৷ কোন ধরনের পশু দুধ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হত, তাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে ৷ গবাদি পশুর দাঁতের মাড়ি পরীক্ষা করা হয়েছে ৷ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার অস্থিসার পাওয়া গেছে এই এলাকায় ৷ গরু, মহিষ এরা বাজরা খেত আর ছাগল সাধারণত ঘাস খেত৷ প্রাথমিক গবেষণায় জানা গেছে যে বেশির ভাগ গবাদিপশু বেশ বেশি বয়স অবধি বাঁচত৷ মনে করা হয় যে এদের মূলত দুধ উৎপাদনের জন্যই পালন করা হত৷ অন্যদিকে বেশিরভাগ ছাগল বা ভেড়া অল্প সময় পর্যন্ত বাঁচত৷ ধারণা করা যায় যে এদের মূলত মাংসের জন্য পালন করা হত ৷

হরপ্পার মানুষেরা শুধু ঘরোয়া প্রয়োজনেই দুধের ব্যবহার করত, তা নয় ৷ পশুর সংখ্যা ছিল অনেক৷ এর থেকে বোঝা যায় দুধের উৎপাদন ছিল পর্যাপ্ত৷ এই অতিরিক্ত পরিমাণ দুধ আদান প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হত৷ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গার বসতির বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল৷ ডক্টর চক্রবর্তীর মতে এইভাবে হয়তো একটি বড় ডেয়ারি বা দুগ্ধ শিল্প গড়ে উঠেছিল৷

তিনি আরও বলেন― সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতার সবচেয়ে আশ্চর্য দিকটি হল এর কোনও মুখপাত্র ছিল না ৷ সেখানে কোনও রাজা বা শাসক ছিল না, না ছিল প্রশাসনিক স্তরের লোকজন৷ কিন্তু বসতিগুলির মধ্যে একটা খুব নিকটস্থ পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল৷ এটি আদান-প্রদান ব্যবস্থার একটি প্রতীকী স্বরূপ বলে ধরা যায়, যা সিন্ধু সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ও দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করেছিল ৷

ছবি : ইন্টারনেট

শেয়ার করুন

0Shares
0
তখন সাম্প্রতিক