সৌর-সন্দেশ― চন্দননগরের তিনশো বছরের ঐতিহ্য

সৌর-সন্দেশ― চন্দননগরের তিনশো বছরের ঐতিহ্য

চন্দননগরের ঐতিহ্য -সূর্য্য কুমার মোদকের জলভরা সন্দেশ নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ রইলো যুগান্তরের ব্যঞ্জন বিভাগে।

অরিজিৎ লাহিড়ী: শিরোনাম দেখে মনে হচ্ছে যে সূর্য নিয়ে কোনো সারগর্ভ বিজ্ঞানচৰ্চামূলক প্রবন্ধ বা নিবন্ধ পড়তে হবে, আর তাও আবার এই সুখপাঠ্য বাংলা ভাষায়? না, মহাকাশ বিজ্ঞান বা সৌরবিজ্ঞান নিয়ে চর্চার জন্য নামী পত্র পত্রিকার বিশিষ্ট বিজ্ঞানানুসন্ধিৎসু লেখক ও তার্কিকদের ওপর অগাধ আস্থা রেখে বরং মিষ্টি এই বাংলা ভাষায় একটা ততোধিক মিষ্টি ইতিহাস আবার ফিরে দেখা যাক।

আমরা এখন পিছিয়ে যাব ঠিক তিনশো বত্রিশ বছর আগে অর্থাৎ ১৬৮৮ সালে । অবিভক্ত বাংলা তখন শাসন করছেন মুঘল সুবেদার ইব্রাহিম খাঁ। ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদাধিকারী এবং কর্ণধার আন্দ্রে বৌরিউ দেজলানদেজ এসে চল্লিশহাজার মুদ্রা ভর্তি একখানা থলি দিলেন ইব্রাহিমের হাতে আর জোগাড় করে ফেললেন হুগলি জেলার গঙ্গার ধারে কল কারখানা গড়বার অনুমতি। তারপর অবিশ্যি ডুপ্লেসি নামের আরেক ফরাসি সাহেব ওই এলাকারই উত্তরদিকে কিনে ফেলেন ৪০১টাকা দিয়ে ১৩ একর জমি। গঙ্গার তীরবর্তী এই জায়গাটা আদতে ছিল তিনখানা গ্রাম― বড়কিষাণপুর,খলিসানি এবং গোলদলপাড়া জুড়ে। তবে ফরাসিদের আমলে অবিশ্যি জায়গাটা জাতে উঠেছিল। নাম হয়েছে ফরাসডাঙ্গা। শিক্ষিত বাঙালিরা বলতেন চন্দননগর। ১৭৩০ সালে জোসেফ ফ্রাঙ্কয়িস ডুপ্লে শহরের গভর্নর হয়ে বসলেন। এরপর ইংরেজদের আক্রমণে একাধিক বার হাতছাড়া হলেও ১৮১৬তে ফরাসিদের হাতে সেই যে চন্দননগর ফেরৎ এল, ১৯৫২ পর্যন্ত ছিল তাঁদেরই হাতে। চন্দননগর কেন নাম হল, এর সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারে না এবং চন্দননগরের ইতিহাস ও ভূগোল চর্চা এই নিবন্ধের বিষয়ও নয়। মিষ্টি ইতিহাস শোনাবো বলছিলাম না? তাহলে এখন আমরা পৌঁছে যাব সেই আদ্যিকালের বড় জমিদার বাড়ির প্রচলিত রঙ্গ রসিকতার রীতি রেওয়াজের সাথে জড়িয়ে থাকা এক মিষ্টান্নের মিষ্টিকথায়।

চন্দননগরের অদূরেই ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ার জমিদার বাঁড়ুজ্যে মশায়ের মেয়ের বিয়ে হয়েছে বৈদ্যবাটির আরেক জমিদার বংশে। তো গ্রীষ্মের জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাই ষষ্ঠী উপলক্ষে মেয়ে জামাই আসবেন। সেই সময় বাংলার সমাজে আবার শ্বশুরকূলে জামাইকে ঠকানোর এক ঠাট্টা তামাশা প্রচলিত ছিল। ১৮১৮ সাল। চন্দননগরের বিখ্যাত ময়রা সূর্য কুমারের বেশ নামডাক হয়েছে চারদিকে। তাঁর প্রতি জমিদার মশাইয়ের আজ্ঞা হয়েছে জামাই ষষ্ঠীর ভোজের এমন এক মিষ্টি তৈরি করতে যা দিয়ে বেশ একটা অতিথি আপ্যায়নও হবে, হালকা মস্করাও হবে জামাই বাবাজীবনের সাথে।

তো, যথারীতি জামাইষষ্ঠীর ভোজানুষ্ঠান চলছে। সূর্য মোদকের তৈরি করা পেল্লায় সাইজের তালশাঁস সন্দেশ পড়েছে রসিক জামাইয়ের পাতে। “বাবাজীবন, এ জিনিস তোমার বদ্যিবাটিতে পাবে না হে। সূয্যি মোদককে দিয়ে তোমার জন্য বানিয়ে এনেছি। চেখে দ্যাখো দেখি”― শ্বশুরমশায়ের সস্নেহ অনুরোধ শুনেছেন জামাই বাবাজীবন। সূর্য মোদকের নামডাক সম্পর্কে হুগলি থেকে কলকাতা বা প্রায় গোটা বাংলা সকলেই অবগত। নিজের বিয়ের ভোজের জমাটি সন্দেশ, মিষ্টির স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। শ্যালক, শ্যালিকারা সবাই ড্যাবড্যাবিয়ে দেখছেন বটে। নাঃ, চক্ষুলজ্জায় কাম নাই। তারচেয়ে দক্ষিণহস্তের সদ্ব্যবহার করা যাক। হাসি হাসি মুখে একটা কামড় বসালেন হুগলির খাঁটি ছানার সন্দেশে বাঁড়ুজ্যেদের আদরের জামাই বাবাজীবন। কিন্তু, এ হে হে… একি অনাসৃষ্টি কান্ড দেখো দেখিনি… মিষ্টিটা কামড় দিতেই মিষ্টির ভেতর থেকে গোলাপের খুসবু ওয়ালা জল( কনৌজ থেকে আমদানি করা) ছিটকে বেরিয়ে এসে তাঁর সাধের পাঞ্জাবীর খানিকটা একেবারে ভিজিয়ে দিল যে…। শ্যালক শ্যালিকাদের হাসি আর ধরে না। স্বশুরমশায় গোঁফে তা দিচ্ছেন আর সকলের সাথে মুচকি মুচকি হাসছেন। জামাই বাবাজীবন আর কি করেন… এ অপ্রত্যাশিত নিরামিষ ঠকা ঠকে তাঁর খানিকটা অপ্রস্তুত লেগেছে বটে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সূর্য মোদকের বিখ্যাত জলভরা সন্দেশের প্রথম আস্বাদনকারীর বিরল কৃতিত্বটা নিজের অজান্তেই অর্জন করে ফেলেছেন যে।

সূর্য্য মোদকের জলভরা সন্দেশ
সূর্য্য মোদকের জলভরা সন্দেশ

জামাই ঠকিয়ে খোশমেজাজে জমিদার মশায় সূর্য্য মোদককে ডেকে বখশিস দিলেন আর বললেন “বুঝলে হে সূয্যি ময়রা! এ অদ্বিতীয় জিনিস তৈয়ারির কৌশল সারা পৃথিবীর জন্য নয়… এ তোমার জিনিস। নিজের সন্তানের মত এ জিনিস তৈয়ারির কৌশল নিজের কাছেই রেখে দিও।” সূর্য মোদক বিচক্ষণ মানুষ। আজ তাই এতো বছর পরেও যখন জি টি রোডের ওপর বিখ্যাত সূর্য্য মোদকের মিষ্টির দোকানে গিয়ে আমরা জলভরা সন্দেশ কিনি, ছানার ওপরে সূক্ষ কারিকুরিতে সূর্য আঁকা এমব্লেমটা চিনিয়ে দেয় তার জাত। কলকাতার নকুড় নন্দীর জলভরা অবশ্য গোলাপজল দিয়ে ভরা নয়, নলেন গুড়ে ভরা থলথলে শরীরে শুতে পারলেই বাঁচে, এদিকে নরম আর সরু পেটের ওপরে থলথলে লাস্যময়ী সূর্য মোদকের জলভরাটি একদম খাঁড়া দাঁড়িয়ে থাকে। সাধে কি আর নাম রাখলাম “সৌর সন্দেশ”? তবে শীতে এই সন্দেশের ভেতরেও মাজদিয়ার খাঁটি নলেন গুড় ঢেলে দেওয়া হয়। স্বাদ যা হয় বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

চন্দননগরের সূর্য মোদক গত হলে আর পাঁচটা বাঙালি ব্যবসায়িক পরিবারের মত পরিবারের লোকজন নিজেদের মত বাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন মিষ্টান্ন ব্যবসা। তাতে নজরটা জলভরার গুণমান থেকে সরে গিয়ে চলে গিয়েছে কে প্রমাণ করবে সূর্য মোদকের পরিবারের কত নিকট আত্মীয়তা কার সাথে সেই দিকে। তাই কারিগরদের ভাঙিয়ে এনে অন্যান্য মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরাও দেদার বিক্রি করছে “আসল জলভরা সন্দেশ”। স্বাদের আসল নকল ফারাক করতে যাওয়া মূর্খামি |

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর আলোকসজ্জা আর রবি ঠাকুরের স্মৃতিধন্য পাতালবাড়ির ইতিহাসও বোধহয় ম্লান করে দেয় সূর্য আঁকা জলভরা সন্দেশের অদ্বিতীয় স্বাদ। ফুড ব্লগারদের লুব্ধ আঙ্গুল ভার্চুয়াল পাতা জুড়ে আঁকতে থাকে সুতন্বী এই পৃথিবী বিখ্যাত মিষ্টির বিজয়গাথা। ইউটিউবারদের মোবাইল ক্যামেরা বা ডিএসএলআরের ফ্রেম জুড়ে সূর্যকে দেহপটে বন্দী করে একাকী অথবা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন এই আটপৌরে রমণীরা, থুড়ি সৌর-সন্দেশ। রমণ বিলাসী হয়ে ওঠে আমাদের স্বাদকোরক গুলো সন্দেশে প্রতিটা কামড়ে।

ছবি : ইন্টারনেট

শেয়ার করুন

0Shares
0
ব্যঞ্জন