বিদায় মহাশয় ধরমপাল গুলাটি

বিদায় মহাশয় ধরমপাল গুলাটি

কৌস্তভ দাস চাকলাদার: প্রখ্যাত মশলা উৎপাদন সংস্থা এমডিএইচ-এর কথা জানে না এমন অন্দরমহল ভারতে খুঁজে পাওয়া বড়ই মুশকিল। এই বিখ্যাত সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মহাশয় ধরমপাল গুলাটি গত ৩ ডিসেম্বর, ৯৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হটাৎ করেই ঘটা সম্পূর্ন অপ্রত্যাশিত হৃদরোগে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মনে পড়ে নিশ্চয়ই, টেলিভিশনে সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপন যাতে স্বয়ং এমডিএইচ-এর কর্ণধার এক সদা হাস্যমুখ দাদুর অভিনয় করছেন ও নতুন বিয়ে হয়ে আসা তার পৌত্রবধূকে আশীর্বাদ করছেন?
এতবড় একটি সংস্থার কর্ণধার হয়েও একদম মাটির মানুষ ছিলেন মহাশয় ধরমপাল গুলাটি। এমডিএইচ কম্পানির কর্ণধার পদ্মভূষণ সম্মান পেয়েছিলেন ২০১৯ সালে। বয়স এত বেশি হলেও কখনও ক্লান্ত হননি তিনি এবং তার কারণ ছিল তাঁর সদাঅক্ষয় স্বাস্থ্য। ৯০-এর কোঠায় বয়স হলেও প্রতিদিন ভোর ৪টের সময় দিল্লির নেহেরু পার্কে প্রাতঃভ্রমণ করতেন তিনি। যোগব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়ার কারণেই যে তাঁর স্বাস্থ্য এমন সুঠাম তা নিজ মুখে বহুবার বলেছেন তিনি।

মহাশয় ধরমপাল গুলাটি
মহাশয় ধরমপাল গুলাটি

মহাশয় ধরমপাল গুলাটির জন্ম হয়েছিল অধুনা পাকিস্তানের শিয়ালকোট শহরে ২৭ মার্চ, ১৯২৩ সালে। দেশভাগের সময় একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় মাত্র ১৫০০ টাকা হাতে নিয়ে এপারে আসেন তাঁর পরিবার। একপ্রকার বাধ্য হয়েই পড়াশুনা ছাড়তে হয় তাঁকে। ক্লাস ফাইভ অবধি পড়ে পড়াশুনার পাট চুকিয়ে এক্কাগাড়ি চালানোর কাজ করতেন তিনি। তারপর ১৯৫৮ সালে দিল্লির করোল বাগে নিজের দোকান খোলেন তিনি। সেই শুরু পথ চলার। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে দেখেননি তিনি। দিল্লির চাঁদনী চকে নিজের দ্বিতীয় দোকান ও পরে ১৯৫৯ সালে দিল্লির কীর্তিনগরে নিজেদের প্রথম মশলার ফ্যাক্টরি তৈরি করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে তিঁনি প্রথম এমডিএইচ কোম্পানির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৮ সালের হিসেব অনুসারে এফএমসিজি প্রোডাক্টের জগতে যা অর্থ উপার্জন করেন তিনি তার ভারতীয় টাকায় হিসেব প্রায় ২৫ কোটি। ভারত ও দুবাই মিলিয়ে মোট ১৮টি ফ্যাক্টরি আছে এমডিএইচ সংস্থার ও প্রায় ৬২টির উপরে প্রোডাক্ট বিক্রি করেন তাঁরা যার ৮০ শতাংশ মার্কেট উত্তর ভারতে।

শিক্ষা ও শিক্ষার মূল্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন এই মানুষটি। প্রায় 20টি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরের স্কুল নির্মাণ করেছে এই এমডিএইচ সংস্থা। এছাড়া ২০০ টি বেডের একটি হাসপাতাল ও দুঃস্থ বস্তিবাসীদের জন্য চিকিৎসার সুব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া তার স্বর্গত পিতার নামে তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থাও নির্মাণ করেছেন যার নাম মহাশয় চুনিলাল চ্যারিটেবল ট্রাস্ট। কোভিড অতিমারীর সময়ে দিল্লি সরকারকে অর্থসাহায্য সমেত প্রায় ৭৫০০ PPE কীট সরবরাহ করেছে তাঁর সংস্থা। সব মিলিয়ে বলতে গেলে সত্যি এক অতুলনীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি।

সর্বদাই তিনি গর্ব করে বলতেন “আমি তো এখনও বেশ অল্পবয়সী আছি বলতে গেলে … “। একবার এমডিএইচ গ্রুপের টিভি বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে হঠাৎই নিজের কম্পানির বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন আর সেই থেকে এখন অবধি এমডিএইচ-এর সকল বিজ্ঞাপনেই অভিনয় করেছেন তিনি। মজার ছলে বলেছিলেন , “… সেবার যখন অ্যাড ডিরেক্টর আমাকে বলেন অভিনয় করতে তখন আমিও ভেবেছিলাম খানিক টাকা বাঁচানোও যাবে এই ফাঁকে” । চলতি বছরের গত ৩ ডিসেম্বর এমনই একজন মানুষ আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন।

শেয়ার করুন

0Shares
0
ব্যঞ্জন সাম্প্রতিক