সৌভিক কথা, পর্ব ১

সৌভিক কথা, পর্ব ১

শীতের একটা নিজস্ব মনখারাপ-রঙের হাওয়া থাকে। ঠোঁট ফাটে , দূরের গ্রহে কোথাও ভেঙে যায় বোরোলিনের সংসার, জীবনের নানা ওঠাপড়া সহজে গায়ে না লাগার দিন শেষ হয়ে আসে। বাদামি বিকেলগুলো সূর্যরশ্মির ভেতর দিয়ে বেরিয়ে পড়ে অজানা হাইওয়ে বেয়ে – ডাল্টনগঞ্জ, ম্যাক্লাস্কিগঞ্জ, হাজারিবাগ, পালামৌ। মধুপুরে পাশের যে বাড়িতে তুমি থাকতে, তাকে আজ সময় খেয়েছে, বারান্দায় বহুকাল বসে আছেন শ্রাবন্তী মজুমদার। নতুন সব্জির সবুজ-লাল-হলুদ ক্ষেতের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে নির্জন স্টেশন, প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই, বিষণ্ণ টিউবয়েল থেকে জল নিয়ে চলে যায় হারানো গ্রাম্য যুবতী। যে অনিশ্চিত ট্রেন এসেছিল একদিন, যার জানলায় গত দশকের উৎসাহী প্রেম বসে ছিল, তা চলে গেছে কুয়াশার হল্ট-স্টেশনের দিকে, খোঁজ পাওয়া যায়নি। এক যুগ আগেকার নীলচে জ্যাকেট, আলমারি থেকে হাত নাড়ে, আর্তনাদ করে, বদলে গেছে মনের সাইজ, আর ফিট করে না। খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে ছোট হয়ে আসে নির্দিষ্ট কমলালেবু। লাট্টু পাহাড়ের মাথায় ঝুপ করে সন্ধে নেমে আসে, সূর্যের হ্যালুসিনেশন নিয়ে কারও কোনও রিসার্চ পেপার রয়েছে?

গ্লেনারিজের সামনে সেই মুখ, গোলাপি জ্যাকেট, খোলা চুল, হালকা লিপস্টিক, যদিও চোখে চোখ পড়লে আজ খুব অচেনা মনে হয়… মানুষের ঢল নেমেছে ম্যালে, দাস স্টুডিয়ো বাঁ হাতে রেখে সোজা হেঁটে গিয়ে এক কাপ মকাইবাড়িতে ডুবে থাকা এক টুকরো দার্জিলিং-রঙের গোধূলি পাওয়া যায়, কেভেন্টার্সের ছাদে বেকনের প্লেটে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে ছুঁড়ে দেওয়া চিরকুট। এন.জে.পি. কিংবা বাগডোগরা থেকে চুলকাঁটা বাঁক পেরিয়ে পেরিয়ে ‘ঘুম’ পৌঁছে গেছে যে ‘কাপল’, তারা জানে, গন্তব্য আর বেশি দূরে নেই; মনে পড়ে, সেন্ট পল্স স্কুলের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, কোনওদিন কেউ জিজ্ঞেস করেছিল― “গন্তব্যের চেয়ে, যাত্রা কি বেশি জরুরি নয়…. ইজন্ট জার্নি মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান দা ডেস্টিনেশন?”, এখন লাডেন-লা রোড বেয়ে একা একা নেমে যেতে যেতে মনে হয়― কিছু কিছু জার্নি ঠিক মতো শেষ হবার আগেই একটা অপ্রয়োজনীয়, আকস্মিক গন্তব্য এসে যায়। ম্যালের আশেপাশে তিব্বতি গয়নার দোকান, “এখানে চাম্বা-লাম্বা-র চেয়ে অনেক ভালো স্টক, আমার টাইম লাগবে…”― বলে ওঠে কেউ, কেউ ম্যাল থেকে একটু নীচে নেমে, সিসিডির উল্টো দিকের সিগারেটের দোকানে দাঁড়িয়ে, সিগারেট ধরায়। প্লান্টার্স ক্লাবের বারান্দায় চা-বাগান- বাবুদের হৃত গৌরব পড়ে থাকে, গ্লেনারিজের সামনে চেনা মুখ, হাল্কা লিপস্টিক, গোলাপি জ্যাকেট, “কেমন আছো”― বলতে গিয়ে মনে পড়ে, কিছু কিছু জার্নি ঠিক মতো শেষ হবার আগেই একটা গন্তব্য এসে যায়, যা আসলে এক গভীর খাদ। খাদ থেকে হাত নেড়ে ওঠে পুরোনো রুমাল, পাইনের বনে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়, হাওয়ায় উড়ে যায় সেই নীলরঙা ছাতা, জোয়ী’স পাব থেকে ভেসে আসে পূরণ গংবা-র হারানো গিটার। দুনিয়ার টুরিস্ট এসে জড়ো হয় ম্যালে― শখের ঘোড়া চাপা, আইসক্রিম, কেনাকাটা… দার্জিলিং মানে এক হারিয়ে যাবার মরসুম, দার্জিলিং মানে এক হারিয়ে যাওয়া মরসুম― বেশি লোক সে কথা জানেনা… সময়ের টয়ট্রেনে জানলায় বসে থাকে অর্কিড; একদিন অর্কিডে বিশ্বাস হারিয়ে, পাহাড়ে স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছিল কলেজের ব্যাচমেট রোশন রাই, দার্জিলিংয়ের ছেলে….গ্লেনারিজের সামনে চেনা মুখ, তুমি ‘প্রতিধ্বনি’-র মানে জানো ? নিশ্চুপ জোনাকির মত জ্বলে ওঠে সন্ধের শৈলশহর …

“জীবন এক মায়া, আর মৃত্যু এক সত্যি”― এই কথা বলে ছেলেটি চলে গেল শীতের ধূসর টিলাপাহাড়ের দিকে, এসময় রোদের করিডরে বিষণ্ণ ছায়া হেঁটে যায়, দূরে সদ্যজাত মেঘ ঝুলে থাকে আকাশের কোলে। রাঢ় বাংলার রাঙামাটিধুলোয় গ্রামীণ ফকিরি উৎসবে নাগরিক জিন্স মুক্তি খুঁজতে এসে শালবনে, হলুদ পাতার খাটিয়ায় পড়ে থাকে যেন মৃত প্রেমিকের লাশ। নকল সম্পর্কের ছবিগুলো আসল ভেবে লোক লাইক দিচ্ছে ফেসবুকে, অকালে চলে যাওয়াগুলো মেনে নেওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই, তবু কমরেড, আমাদের এই চিউইং গাম, চোয়াল ছাড়বে না, রাতের কার্জন পার্কে রুটিনমাফিক গর্তে ঢুকে পড়বে ত্রস্ত ইঁদুর। যে মেয়েটির মেসেজ করতে বা পড়তে ভাল লাগেনা , ভাল লাগে দীর্ঘ ফোনালাপ, তাকে রাতদিন হোয়াটস্যাপ করে চলে অক্ষরপ্রিয় নভেম্বর; যে মেয়ে খুঁজে চলে অক্ষর, তাকে দিনরাত ফোন করে চলে শব্দপ্রিয় নভেম্বর― এই দুই নভেম্বরের মধ্যেই লেখা আছে যাবতীয় ফেইলড সিমফনি। এসেছিলাম, আছি, আর চলে যাব-র মধ্যে ভেসে থাকে এক বেমিসাল মলোটভ ককটেল , আমরা যাকে ব্লাডি মেরি ভেবে হেসে উঠি, অকস্মাৎ ছেড়ে যাওয়াগুলো দুর্বোধ্য ট্যাটু হয়ে আঁকা থাকে কলার বোনের ঠিক নীচে। কবিতামঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়তে গিয়ে দেখি― সামনে অন্ধকার, কোনও মাথা নেই, শুধু থার্ড রোয়ের কোণের দিকে বসে আছে আমার ভাঙাচোরা মুখ। সিনেমা দেখতে গিয়ে, চারপাশে তাকিয়ে দেখি – প্রেক্ষাগৃহ শূন্য, আর স্ক্রিনে চালু আছে আমারই জীবন। ডিরেক্টর, আপনি যা বলবেন আমি মাথা নীচু করে শুনব, শুধু আমার রোলের মানেটা ঠিক করে বুঝিয়ে দিন কোনও এক মেরুন বিকেলে। ফেড ইন, ফেড আউট বুঝি, মাঝখানের রেল-ট্র্যাক বুঝতে পারিনি কোনোদিন….

ধীরে ধীরে কমে আসে শীত, সোয়েটার-জ্যাকেট-কম্বল মৃদু বলে ওঠে ―”এবার তবে আসি …অনেক তো হল , বসন্তকাল এসে গেছে সুপর্ণা, আমি ন’মাস ঘুমিয়ে থাকবো…” ; শুকনো, হলুদ পাতার প্রান্তরে ঈষদুষ্ণ রোদের ক্যানপি , পলাশ-শিমুল-কৃষ্ণচূড়া গাছেদের সারা শরীর কেঁপে ওঠে নতুন দিনের হাওয়ায়। এ সময় শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার , খোয়াইয়ের রাঙা প্রান্তরে হারানো ফাল্গুন ছুঁয়ে দেখার সময়, সোনাঝুরি গাছের মাথা ছাড়িয়ে উড়ে যাওয়া ম্যাজেন্টা ওড়নাকে হাত নেড়ে বলে ওঠার সময় ― “এসেছি….” , সাঁওতাল গ্রামের পথ বেয়ে বহুদূর থেকে ভেসে আসে পূর্বজন্মের গান, সুর মিলিয়ে যায় হাওয়ায়, বেলা বাড়ে, সূর্যরশ্মির ভেতর থেকে নেমে আসে দৃশ্য, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যেতে যেতে মনে পড়ে এখানেই, আবির-মাখানো কোনও দুপুর-বিকেলে ঠোঁটে ঠোঁটে আচমকা ঘটে গিয়েছিল বিপ্লব। শীতের অন্ধকার টানেল পেরিয়ে উজ্জ্বল ফাগুন-ইশারায় সাড়া দিতে দিতে তবুও কেন মনে হয় আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে, কেন মনে পড়ে সানগ্লাসের কাচে নেমে আসা প্রিয় কোনও ছায়া , ব্যালেরিনা ক্যাফের টেবিলে কেন দুলে ওঠে মায়া-বিস্মরণ … ফুলডাঙার দিক থেকে এসে একটা নিবিড় সাইকেল রিক্সা দিগন্তে মিলিয়ে যায়, দিগন্ত এক আশ্চর্য ঘাতক, তার নিশানায় থাকতে থাকতে কেটে যায় দিন, ফাল্গুন-পরবে দেখা হয়না আর, অক্ষর প্রদেশ পাল্টেছে আজ বহুকাল। মাথার মধ্যে খটখট করে চলে টাইপরাইটারের নীচু গলি, পথগণিকার স্ট্রাগলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্ট্রাইক ডাকে শহরের কোকিল-বাহিনী, না-যাওয়া শীত আর না-আসা বসন্তের মধ্যে জ্যাকেট-কম্বলের ছুটির দরখাস্ত এলোমেলো ওড়াউড়ি করে, রোদ পড়ে আসে, নিস্তব্ধ আলোড়নে দুলে ওঠে ধুলোপথ, জাতীয় সড়ক। হাওয়াকল ঘুরে চলে, আনমনে।

প্রচ্ছদ ও ছবি: ত্রিনাথ মজুমদার

শেয়ার করুন

0Shares
0
সৌভিক কথা