লিখছেন রূপম ইসলাম – ১

লিখছেন রূপম ইসলাম – ১

রূপম! শোনো—

অনেকদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। ক্রিটিকাল ছিলেন। লড়ছিলেন। তারপর এমন খবরও পেলাম— একটু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কিছু চিকিৎসায় নাকি সাড়া দিচ্ছেন।

আমার প্রিয় নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলছি।


আমার প্রিয় নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলছি।

আমি রূপসাকে বললাম, ভাল লাগছে না। এখন বললে আশা করি মনে হবে না যে কুডাক ডেকেছিলাম— কিন্তু আমি রূপসাকে বলেছিলাম সেদিন— প্রদীপ ঠিক নেভবার আগে দপ করে জ্বলে ওঠে না একবার? ভাল লাগছে না। তেমন যেন না হয়।

তেমন করে অন্তরঙ্গতা তৈরি করতে পারিনি তাঁর সঙ্গে। সুযোগ ছিল। কিন্তু আমার সে স্পর্ধা ছিল না।

অথচ একই কমিটিতে আলোচনা সভা করেছি একাধিকবার। সরকারী উদ্যোগে সে বার একটা কমিটি করা হয়েছিল নন্দন-রবীন্দ্রসদন-শিশির মঞ্চের সংস্কারের লক্ষ্যে। সৌমিত্রবাবু, অপর্ণা সেন প্রমুখের মতো মানুষরা এসেছিলেন। আমারও ঠাঁই হয়েছিল সেখানে, কিন্তু কী আর বলি— ওঁদের মাঝে সংকুচিত হয়েই ছিলাম। এ মনোভাব প্রকাশ করিনি, কিন্তু আমার ছোটবেলার আত্মপ্রশ্রয়ের উঠোনে ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক রূপকল্পের পরিণতি যাঁদের কাজ অবলম্বন করে, আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে— তাঁদের সঙ্গে এক পংক্তিতে আমি বসতে পারি না মানসিকভাবে। বাধ্য হয়ে বসতে হলেও অপরিসীম কুণ্ঠা জাগে। মনে মনে ভাবি, অন্যায় হচ্ছে। তেমনই এক আত্মদংশনমণ্ডিত আলোচনাসভার শেষে নন্দনের ভরা দুপুরে বেরচ্ছি সভাগৃহ থেকে, লাল রঙা টিশার্ট পরিহিত ছোটবেলার নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মিটিং-নির্গমন পথে যেভাবে আমার নাম ধরে সহজ স্বাভাবিকভাবে কথা বলে উঠলেন— উনি বুঝলেন না হয়তো— মনের মধ্যে কী যে আলোড়ন হল আমার। আমিও কথা বললাম— কিন্তু তাঁর ছবি তুলবার বা সই নেবার সাহস হল না। নেহাতই দৈব-দুর্ঘটনায় তাঁর নৈকট্যে পৌঁছেছি— সে সুযোগ নিয়ে অন্যায় আবদার করে তাঁকে বিরক্ত করতে পারব না।


নেহাতই দৈব-দুর্ঘটনায় তাঁর নৈকট্যে পৌঁছেছি— সে সুযোগ নিয়ে অন্যায় আবদার করে তাঁকে বিরক্ত করতে পারব না।

তাঁর চলে যাওয়ার খবর আমায় স্তব্ধ করে দেওয়ার পর লক্ষ করলাম, এক কার্টুন চিত্রে তিনি আর আমি পাশাপাশি অবস্থান করছি। আনন্দমেলার এক প্রচ্ছদ হয়েছিল ‘বড়দের ছোটবেলা’ নাম্নী। সেখানে ছ’জনের ব্যঙ্গচিত্র ঠাঁই পেয়েছিল মলাটে। তিনি ছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন। গণেশ পাইন ছিলেন। হংসমধ্যে বকযথা আমিও ছিলাম। ছিঃ ছিঃ— নিজের ঐ প্রতীকী অবস্থানের জন্য আজ পরিতাপ হল। নিজেকেই দুষলাম। অথচ আমার কোনও হাত ছিল না ঐ ছবির কল্পিত সমাবেশটি রচনায়। তবুও…

ময়ূখ ভৌমিক ‘দ্বন্দ্ব’ ছবির প্রিমিয়ারের ছবি পোস্ট করলেন, দেখলাম। সুমন ঘোষের ছবি, সৌমিত্রবাবু মুখ্য চরিত্রে। ময়ূখ সংগীত করেছিলেন, আমি একটি গান গেয়েছিলাম— ‘জীবন থেকে যদি পালাই দূরে—‘। রূপসা ছবিটি দেখে বললেন— “তুমি সৌমিত্রবাবুর থেকে দূরে পালিয়ে প্রায় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে কেন ছবিটায়?”

আমি উত্তর দিলাম না।

তিনি কিন্তু অতি সহজ অতি আপন ছিলেন। হ্যাঁ, সহজ ছিলেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অবশ্য সহজ স্বাভাবিক থাকাটা প্রকৃত বড়দের বড় বৈশিষ্ট্য। সৌমিত্রবাবু গল্ফ গ্রীনের রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে যথেচ্ছ হেঁটে চলে বেড়াতেন। আত্মম্ভরী আড়াল ছিল না। অন্য একটা দূরত্ব অবশ্য ছিল। সেই দূরত্বে তিনি উজ্জ্বল হয়ে বিকশিত হতেন গড়পরতাদের ভিড়ে। আমি তাঁর গদ্যের নিবিষ্ট পাঠক ছিলাম। কবিতার উচ্চারণ তাঁর ছিল তা বুঝতাম— তবে আমায় অনেক বেশি টানত তাঁর গদ্য। আমার ছোটবেলায় তাঁকে ঘিরে একটা কেলেংকারি হয়েছিল। একটা বেফাঁশ সাক্ষাৎকারে ‘ফেলুদা’ বলে বসেছিলেন— ফেলু চরিত্র তাঁর কাছে স্রেফ আরেকটা চরিত্রমাত্র, সাংঘাতিক কিছু না। ব্যস, আর যায় কোথায়? আমাদের মতো কিছু ফেলুভক্তের গায়ে লেগেছিল খুব। তবে মনে আছে, গায়ে লাগলেও তা আমি সহ্য করে নিয়েছিলাম। আমার একটা ব্যাপার আছে— কড়া করে বলে দেওয়া সত্যি কথা আমায় ছোটবেলা থেকেই টানে। তাই অন্য একটা লেভেলে গিয়ে সৌমিত্রকে ভাল লাগছিল। ভাল লাগছিল অন্য রকম একটা কথা তিনি বলেছিলেন বলে। কথাটা আমার পছন্দ নয়— কিন্তু সে তো আমার ব্যক্তিগত এলাকা। তার জন্য তাঁকে দায়ী করিনি।


আমার একটা ব্যাপার আছে— কড়া করে বলে দেওয়া সত্যি কথা আমায় ছোটবেলা থেকেই টানে। তাই অন্য একটা লেভেলে গিয়ে সৌমিত্রকে ভাল লাগছিল। ভাল লাগছিল অন্য রকম একটা কথা তিনি বলেছিলেন বলে।

‘এক্ষণ’ খুব একটা আমার বিচরণক্ষেত্র না হলেও হাতে পৌঁছত মাঝেমধ্যে। সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য পড়বার বিরাট বাসনা ছিল। তার জেরে এক্ষণে বেরনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধও পড়ে ফেলেছিলাম। কলকাতার নামকরণের ইতিহাস— তেমনই একটি। জোব চার্ণক বৃত্তান্তও পড়েছিলাম। তবে তখন বোধহয় নির্মাল্য আচার্য একাই সম্পাদনা করছেন। আমি ভুলও হতে পারি।

কিন্তু এ পত্রিকার প্রসঙ্গে সৌমিত্রবাবুর নাম যখনই উচ্চারিত হত— বিস্মিত হতাম। অদ্ভুত আনন্দ হত। যেন এ গর্ব আমারই গর্ব।

ফেলু-কেলেংকারির ব্যাপারটা সৌমিত্র নিজেই লিখেছেন একটা প্রবন্ধে। সেদিন লেখাটা পড়তে পড়তে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ল। কড়া কিছু কথা সহজে বলে তিনি যে সরকারী খেতাব ‘পদ্মশ্রী’ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন— মনে পড়ল। আবার তাঁর দাদাসাহেব ফালকে সম্মানপ্রাপ্তির পর কী যে আনন্দ হয়েছিল— সে কথাও মনে পড়ল। তাঁর একটি বক্তৃতা আমাকে প্রাণিত করেছিল একটা প্রবন্ধ লিখতে। সেই বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন তাঁর সম্বর্ধনা মঞ্চে। কলকাতার চলচ্চিত্র শিল্পীদের একটি সমিতি দাদাসাহেব পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে তাঁর জন্য ঐ সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করেছিলেন। দুরুদুরু বক্ষে আমি গিটার বাজিয়ে দুটি গান গেয়েছিলাম সে সন্ধ্যায়। ‘জীবনে কী পাব না’ আর ‘হয়তো তোমারই জন্য’। আমার প্রিয় নায়ক সম্মুখে বসে শুনছিলেন। মনে পড়ল।

এই দু’টি গানই সুধীন দাশগুপ্তের সুরারোপিত— ছবির নাম ‘তিন ভুবনের পারে’। ছোটবেলা থেকেই সুধীন দাশগুপ্তের সুর আমার ভীষণ প্রিয়। এটা প্রসঙ্গের বাইরে বেরিয়েই বললাম। আরেকটা প্রিয় সাদা কালো রোমান্টিক ছবিও তাঁর সুরধন্য। ‘বসন্ত বিলাপ’। সৌমিত্র অপর্ণা দু’জনেই ছিলেন। সত্যজিতের সংগীত ও চিত্রনাট্য, অথচ পরিচালক সত্যজিৎ নন, তাঁর সহকারী নিত্যানন্দ দত্ত— ছবির নাম ‘বাক্সবদল’— সৌমিত্র অপর্ণার আশ্চর্য আরেক ছবি। প্রসঙ্গের বাইরে থেকেই বলছি। প্রসঙ্গের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে অনেক কিছু মাথায় আসছে। সেগুলো আবার নতুন প্রসঙ্গ তৈরি করে দিচ্ছে। মনে পড়ছে ‘রাজা লিয়ার’ নাটকের ঐ দৃপ্ত পদচারণ— ঐ ডায়লগ থ্রোয়িং। বাপরে বাপ। কত বলব? ‘টিকটিকি’ নাটক দেখে এসে বাবার উচ্ছ্বাস। সাদা কালো স্মৃতি। রঙিন স্মৃতি। স্মৃতি নানা রকম।

সাদা কালো ছবির দুনিয়াটা বরাবরই কেমন যেন মায়াকাড়া। ছায়াময়। একটা সাদা কালো আলোকচিত্র আমার কাছে ছিল। তাতে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে সৌমিত্র ছিলেন। হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সত্যজিৎ। দু’পাশে আমার বাবা মা। যেন অল্প আড্ডার মেজাজ। শৈলেন মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন। সত্যজিৎ আমার মা-কে একটা চরিত্র করতে বলেছিলেন। মা করেননি। সেটা অন্য গল্প। সাদাকালো ঐ ছবিটার কথায় আসি।—ভাগ্যিস আমার তেমন কোনও ছবি নেই এই মহারথীদের সঙ্গে। এই একটা জায়গায় আমার বাবা মা আমাকে চিরদিন হারিয়ে দিলেন। এটাও তো সুখ। বাবা মার জন্য গর্ব হচ্ছে।


এই একটা জায়গায় আমার বাবা মা আমাকে চিরদিন হারিয়ে দিলেন। এটাও তো সুখ। বাবা মার জন্য গর্ব হচ্ছে।

আমার সংগ্রহে আরেকটা রঙিন ছবি ছিল। আমার প্রথম দেখা আনন্দলোকের প্রচ্ছদ। হাতে চায়ের ভাঁড় নিয়ে ফেলুদা বসে আছেন বেনারসের ঘাটে। সমুদ্র-সবুজ পাঞ্জাবী আর চাদর। ভুরু কুঁচকে আছে। ‘হয় এর বদলা নেব, না হয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব।’— এরকম একটা ব্যাপার! যেদিন আনন্দলোক থেকে আমায় জানানো হয় যে ওঁরা আমায় নিয়ে প্রচ্ছদ-শ্যুট করবেন— সেদিন আর তেমন একটা কুণ্ঠা জাগেনি, সত্যি বলছি। ততদিনে আমিও পোড় খাওয়া, এসব আবেগ দমন করতে শিখে গেছি। কিন্তু প্রস্তাবটা পাওয়ার পর থেকে সারাদিন শুধু ঐ রঙিন ছবিটাই চোখে ভেসেছে। আমার দেখা প্রথম ফিল্ম ম্যাগের প্রচ্ছদ। ঝকঝকে বুদ্ধিমান কপালে ভাঁজ ফেলা নজর, শীতের আমেজ, শালটা আলগোছে জড়িয়ে নিয়ে বসে আছেন সৌমিত্র। মুখে এসে পড়েছে রোদ। শুধু ঐ ছবিটাই যে কতবড় মাইলফলক আমার জীবনে। যুক্তি দিয়ে তো বোঝাতে পারব না! কী একটা যেন সম্পর্ক। কী যেন একটা অন্তরঙ্গতা…

সাধারণ মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে। বিভাসকাকু বারান্দা থেকে শোকস্তব্ধ, দেখছেন। থমথমে মুখ চারিদিকে। মুখে মুখোশ থাকলেও কিন্তু অন্তরঙ্গ সম্পর্কের আভা বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে আসছেও। কলকাতার রাস্তা জুড়ে প্রবাহিত হচ্ছে অন্তরঙ্গতার বিদ্যুৎ, নৈকট্য হারানোর বেদনাবোধ। সবারই কী ভীষণ আপন ছিলেন মানুষটা।


থমথমে মুখ চারিদিকে। মুখে মুখোশ থাকলেও কিন্তু অন্তরঙ্গ সম্পর্কের আভা বেরিয়ে আসে।

ইতিমধ্যে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পৌঁছে গেলেন তিনি। ঐ তো গান স্যালুট দেওয়া হচ্ছে। কন্যা শেষ আদর করছেন পিতাকে। আর তো আমরা দেখতে পাব না তাঁকে কোনওদিন।

লাল রঙের টি শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি তক্ষুনি অতীত থেকে নাম ধরে ডেকে ওঠেন আমায়। আমি পেছন ফিরে তাকাই। কিন্তু কিচ্ছুটি দেখতে পাই না। দেখব কী করে— চোখ যে ঝাপসা!

প্রচ্ছদ ও ছবি : অন্তরূপ চক্রবর্তী 

শেয়ার করুন

0Shares
0
লিখছেন রূপম ইসলাম