ভারতীয় অর্থনীতিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক ও সুস্থির অর্থনীতি হিসেবে ঘোষণা করল জাতিসংঘ

ভারতীয় অর্থনীতিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক ও সুস্থির অর্থনীতি হিসেবে ঘোষণা করল জাতিসংঘ

টিম যুগান্তর: 

ভারতীয় অর্থব্যবস্থা ও অর্থনীতির অবস্থা সম্বন্ধে অনেক বিতর্ক-বিচার-বিশ্লেষণ চলেছিল গোটা ২০২০ সাল জুড়েই। কিন্তু বছরান্তের একসপ্তাহ আগে এল এক এমন সুখবর যা ভারতীয় সরকার, অর্থমন্ত্রক ও নেপথ্য অর্থনীতিবিদদের জন্য বছর শেষের এক উপহারই বলা চলে। ভারতীয় অর্থনীতিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক ও সুস্থির অর্থনীতি হিসেবে ঘোষণা করল খোদ জাতিসংঘ। জাতিসংঘ বা ইউএন দ্বারা সদ্য প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুসারে কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতেও ভারতের বিশাল বাজারে বিনিয়োগ হ্রাস পায়নি যা সত্যি সুস্থিরতার পরিচায়ক।

জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত অর্থনীতি নিয়ামক কমিশন বা ইউনেসক্যাপ ( UNESCAP) দ্বারা প্রকাশিত ‘ফরেইন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ট্রেন্ড অ্যান্ড আউটলুক ইন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক ২০২০/২০২১’ শীর্ষক এই রিপোর্ট অনুসারে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ায় ইনওয়ার্ড এফডিআই প্রায় ২% হ্রাস পেয়েছে ২০১৯ সালে। ২০১৮ সালে এই স্থিতিমাপের মান ছিল প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার যা কমে ৬৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে ২০১৯ সালে। যখন কোনও বৈদেশিক কোম্পানি একটি দেশে বিনিয়োগ করে অথবা কোনও একটি দেশের স্থানীয় কোম্পানিগুলি থেকে সামগ্রী ক্রয় করে, সেক্ষেত্রে সেই দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার সংযোগ ঘটে এই পরিমাপকে বলে ইনওয়ার্ড এফডিআই যা কোনও অঞ্চলের অর্থনীতি পরিমাপের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থিতিমাপ। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় গত একবছরে হওয়া ইনওয়ার্ড এফডিআই বৃদ্ধির অধিকাংশই ভারতীয় অর্থনীতির সংযোজন যা প্রায় শতাংশের হিসেবে ৭৭% এবং যার অর্থমূল্য প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ ইনওয়ার্ড এফডিআই বৃদ্ধি হয়েছে ভারতে।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই রিপোর্ট অনুসারে ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই স্থিতিমাপটির বৃদ্ধি মূলত তথ্য ও সংযোগ প্রযুক্তির (ICT) ক্ষেত্রেই ব্যাপক হারে দেখা গিয়েছে। এই রিপোর্টটি অনুসারে অন্তর্দেশীয় কোম্পানি থেকে স্থানীয় কোম্পানিগুলি প্রত্যেকেই ভারতের এই সদা উন্নতিশীল অর্থব্যবস্থার দ্বারা যথেষ্ট লাভবান হয়েছে। গত একবছরে আইসিটি বিভাগ বিশেষত ই-কমার্স বিভাগে এসেছে প্রচুর বিনিয়োগ যে কারণে যথেষ্ট লাভবান হয়েছে দেশের অর্থনীতি।

এই রিপোর্টটি অনুসারে শেষ চার বছর ধরেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া জুড়ে আউটওয়ার্ড এফডিআই ফ্লোয়ের যথেষ্ট বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। ২০১৮ সালে যা ছিল ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার সেটি ২০১৯ সালে বেড়ে দাড়িয়েছে ১৫.১ বিলিয়ন ডলার। আউটওয়ার্ড এফডিআই হল ইনওয়ার্ড এফডিআই এর বিপরীত। এক্ষেত্রে যদি কোনও দেশীয় কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে সেটির পরিমাপকেই আউটওয়ার্ড এফডিআই ফ্লো বলা হয়। ২০১৯ সালে গোটাবিশ্ব জুড়ে আউটওয়ার্ড এফডিআই এর পরিব্যাপ্তি যথেষ্ট অসম ছিল এবং মাত্র দুটি দেশ ভারত ও টার্কির ক্ষেত্রে এই আউট ফ্লো যথেষ্ট বেশি পরিমানে ঘটেছে। রিপোর্ট মতে আউটওয়ার্ড এফডিআই-এ সামান্য বৃদ্ধি হলেও সেটির বেশিরভাগটাই মূলত ভারতীয় অর্থনীতির কারণে হয়েছে (৮০%)। ভারত ২০১৯ সালে বিদেশে প্রায় ১২.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে যা তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০% বৃদ্ধি।

এই রিপোর্টটি অনুসারে খুব সামান্য সময়ের জন্যে হলেও ইনফ্লো ও আউটফ্লো এর পরিমান বৃদ্ধির বদলে হ্রাস দেখা গিয়েছে। ভারতে ২০২০ সালের প্রথম ৯মাসে গ্রিনফিল্ড এফডিআই প্রায় ৪৩% হ্রাস পেয়েছিল প্রসঙ্গত গ্রিনফিল্ড এফডিআই হল যখন কোনও বহির্দেশীয় কোম্পানি বিভিন্ন দেশে তাদের বিভিন্ন ফেসিলিটি নির্মাণ করে ও অন্য একটি দেশের অর্থব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে। এক কথায় এদের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বলা হয়। যদিও এক্ষেত্রেও ভারতীয় অর্থব্যবস্থার অবদানই সবথেকে বেশি (৮৭%) বলা চলে। ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ প্রায় ২৯% হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া কোভিড অতিমারীর কারণে ২০২০ সালে এফডিআই-এর পরিমাণ যথেষ্ট হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু তবুও ভারতীয় অর্থনীতিকেই সবচেয়ে বেশি সুস্থির ও স্থিতিস্থাপক বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তার কারণ ২০২০ জুড়ে চলা কোভিড অতিমারী সত্ত্বেও ইনওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড এফডিআই এ বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে ভারতীয় অর্থনীতিতে এবং ভারতীয় বাজারে নিরবিচ্ছিন্ন বিনিয়োগও ভারতীয় অর্থব্যবস্থার সুস্থিতিশীলতার পরিচায়ক।

এই রিপোর্ট মতে, ফেসবুক ও গুগল ২০২০ সালে রিলায়েন্স-জিওতে বিনিয়োগ করেছে যথাক্রমে ৫.৭ বিলিয়ন ডলার ও ৪.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের মধ্যেই ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি , বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল সংযোগ ইত্যাদিতে বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেতে চলেছে। কৃষি, শিক্ষা, শক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ও বিভিন্ন ছোট বড় কোম্পানিতে ডিজিটালাইজেশনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এই বছর যা উক্ত সেক্টরগুলির চাহিদা সময়ের সাথে আরও বেশি বৃদ্ধি করবে বলেই ধারণা।

ভারতীয় অর্থনীতির জন্যে ভারত সরকার দ্বারা গৃহীত বেশ কিছু বিনিয়োগনীতিকে এই উন্নতির পিছনে আসল কারন হিসেবে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে বীমা বাজারে এফডিআই-এর উর্ধ্বসীমার লঘুকরণ, এফডিআই নিয়মে উদারীকরন ইত্যাদি দায়ী। এছাড়া কোভিড-পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলি যেমন বাংলাদেশ ,আফগানিস্তান, নেপাল ও চীনে ব্যাপকহারে এফডিআই স্ক্রিনিং করেছে ভারতীয় সরকার।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ২০১৯ সালে গ্রিনফিল্ড ইনওয়ার্ড বিনিয়োগ অসমতা ছিল বেশ লক্ষ্যনীয়। গতবছর ভিয়েতনামে দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ (১১%) দেখা গিয়েছিল। ভারত (১০%) ও শ্রীলঙ্কা (৮%) ছিল যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে। এছাড়া এই অঞ্চলের বিশ্ববাজারে ইনওয়ার্ড এফডিআই এর শেয়ার ৪৫% (২০১৮ সালে) থেকে কমে হয়েছে ৩৫% (২০১৯ সালে) এবং আউটওয়ার্ড এফডিআই-এর শেয়ার ৫২% থেকে কমে ৪১% হয়েছে।

এই রিপোর্ট মতে, ক্ষণিকের জন্যে হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশ গুলিতে ওষুধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সামগ্রীর উৎপাদনে যথেষ্ট হ্রাস দেখব যেতে পারে এবং বহু কোম্পানি তাদের ব্যবসা এমন স্থানে সরিয়ে নিতে পারে যেখানে তুলনামূলকভাবে উৎপাদন সামগ্রীর সরবরাহ সহজলভ্য। এই সুযোগ ভারতীয় অর্থনীতির জন্যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মানছেন ইউনেসক্যাপের বিশেষজ্ঞরা।

 

শেয়ার করুন

0Shares
0
অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক