শিশুর শহরতলি― ১

শিশুর শহরতলি― ১

মহাকাল শিশুকাল

আমার নিঃসন্দেহে অনেক কথা বলার ছিল। নিছক হিজিবিজির মতো, অপাংক্তেয় এক বাউলের মতো, আধেক কাদা আধেক জলে শুয়ে থাকা নির্লিপ্ত তেচোখো মাছের মতো― অনেকগুলো না বলা কথা আকাশে উড়িয়ে দিলাম একদিন দুপুরবেলায়…

কী দেখে কী জানি, সেদিন রমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। অবাধ্য ও শ্রাবণ― তুমি হৃদয়ের কথা শোনো কি? শোনো না, শোনো না! না হলে, উঠোনময় প্লাবন যখন আমার গলা অব্ধি ডুবিয়ে দিল, তখনও আমার মন ভিজলো কই? হাঁসের ঘরের দরজা খোলা, চরতে গিয়েও বাড়ি ফিরছে না বুড়ো রামছাগল ফিরদৌস! কে নিল রে, কে নিল! নিশ্চয় ব্যাটা রামুচোর চুরি করেছে এই ভরা বাদলের দিনে! ফিরদৌসের জন্যে বাবা শয্যা নিলেন, মা খাওয়া ছাড়লেন। আকাশে তখন তারা জমতে জমতে মিঠে বরফের মত হয়ে যাচ্ছে। সে বরফের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি আমি। আমি আর পৃথিবীর কোনও এক প্রান্তে, তুমি…


বর্ষা থামুক না থামুক, নোয়াকে ডিঙি ভাসাতেই হবে। নোয়া ডিঙি না ভাসালে মহাঅনর্থ। তাই কাগজের নৌকো। অপটু অস্থির হাতের কাজ। নৌকো অবধি আমি বানাতে শিখেছি৷ এর পরের ধাপে কাগজ কেটে ফুল বানাব। নকশা বানাব, ইংরেজিতে একেই বলে অরিগ্যামি। শুনেছি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গোলাপ ফুলটা বানিয়ে ফেলার আগের যে সুগন্ধ, তার নাকি কোনও তুলনাই হয় না।

সেই গোলাপের একটা পাঁপড়ি খুলে যাবে।

আরেকটা পাঁপড়ি খুলবে তারপরেই।

তারপর আবার…আবার…আবার।

দিন ফুরোতে না ফুরোতেই সমস্ত পাঁপড়ি দিয়ে ডানা বানিয়ে দেব তোমার জন্যে। তুমি ডানায় ভর করে পেরিয়ে যাবে তেপান্তর, সবুজ দ্বীপ অথবা ডুংলুং ডো…

অসম্ভব ভাল লাগার একটা বাতাস বইছে। বইছে অনর্থক শান্তির কোনও কথা। আমার শরীরের কোনও শান্তি নেই। তাই আমি বারংবার একই কথা লিখি। কলম খইতে খইতে রোগক্লিষ্ট শিশুর মতো হাত পা ছড়িয়ে বসে। কোনও ফটোগ্রাফার সেই ছবি তোলে না। শান্ত একটা সমাজে অনর্থক অপুষ্টিতে মরে যায় কাগজ, কলম। মরে যায় অবাধ্য যুক্তি চিন্তারা!

হে মৃত্যু, তুমি কি প্রিয়? তুমি কি শ্যামসমান?

মৃত্যু বলে, না না না!

হে মৃত্যু, তুমি কি চিরন্তন সত্য? তুমি কি আসবেই?

মৃত্যু বলে, হ্যাঁ! আবার না!

ভোর হয়েছে। লাজুক একটা সূর্য উঠতে উঠতেও উঠছে না।

আজানের সুরে কে যেন সংস্কৃত মিশিয়ে দিয়েছে।

মেশায়নি, মেশায়নি! দুইকানে দুই জীবনের কথা কে বলে যাচ্ছে যেন…

“হাইয়া ‘আলাস সলাহ”

“নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ৷

ন চৈনং ক্লেদযন্ত্যাপো ন শোষযতি মারুতঃ৷৷”

“হাইয়া ‘আলাল ফালাহ”

“অচ্ছেদ্যোযমদাহ্যোযমক্লেদ্যোশোষ্য এব চ৷

নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোযং সনাতনঃ।।”

কে আমার আত্মা? কোথায় আমার আল্লাহ্? কিসে আমার সফলতা?

অরোরা বোরিয়ালিস দেখতে দেখতে তুমি উত্তর দিলে, “এইখানে, এইখানে, এইখানে… এই আমার কাছে, আমার মধ্যে, তোমাকে যে প্রথম ডায়েরিখানা দিয়েছিলাম, সে ডায়েরিতে, প্রথম যে বই, সে বইয়ের স-ব পাতায়-”

আকুলিবিকুলি প্রাণে তোমার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে হল। আরেকবার৷ শিশুসুলভ হয়ে, তোমার কাছে, আমার ছেলেবেলা…

সেই যে লিচুগাছ, সেই শালুক ফুল, সেই গৈরিক আকাশ, টবে স্নিগ্ধ রজনীগন্ধা― তুমি তাদের কাছে ফিরবে না?

আকাশের দিকে চাইলাম। টুপটাপ ঝরে পড়ছে আমার উড়িয়ে দেওয়া ভাসিয়ে দেওয়া কথাগুলো। ভালোবাসার টানে রামুচোরের হাত ধরে ফিরে আসছে ফিরদৌস। না, রামু ‘চোর’ না, সে অসম্ভব ভালো একটা মানুষ।

হেসে বলছে, “কী কত্তা? হারায়েছিল বলে নাওয়াখাওয়া ছাইড়েছেন শুনি। ব্যাটা আমার ঘরে লুকায়েছিল, কাঁঠালপাত্তা খাইতে খাইতে হতচ্ছাড়া গাছখানাই প্রায় সাফা কইর‍্যা দিছে!”

তুমি বলেছিলে, “ছেলেবেলায় ফিরে যাও। সব্বাইকে ছেলেবেলায় ফেরত পাঠাও। ফেরত পাঠাও রূপকথায়, কাশবনে, জংলা নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে শেখাও।

সব খারাপকে, সব দুষ্টু লোককে মুড়ে দাও ভালোর চাদরে; মনের গোপন সিন্দুকে বন্দী ছেলেবেলাকে মুক্ত করো।”

কাগজ কলম নিয়ে তাই ফের বসলাম। মেঠো বাঁশির সুরে, ভাল লাগার সুর দিয়ে সব খারাপকে মুড়ে দিতে হবে। যাতে আর কেউ কাউকে খুন না করতে পারে, কেউ কাউকে জাত-ধর্ম তুলে কথা না বলতে পারে, সেই চেষ্টাই করতে হবে আমাকে। তোমাকে।

সবাইকে।

পচতে থাকা, মৃতপ্রায় সমাজটাকে বাঁচিয়ে তুলতেই হবে যে…

সব মৃত্যুর কাছে কি আর রাধার মত আত্মসমর্পণ করা যায়? বলো?

শেয়ার করুন

0Shares
0
শিশুর শহরতলি