অন্য একতারা — ২

অন্য একতারা — ২

তোমার চরণধূলার তলে

 

“I pushed my body from one city to another “

অজস্র আখ্যান ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমাদের জন্ম বয়ে যায়। অখ্যাত গাছের পাশে, অখ্যাত নদীর পাশে স্বেচ্ছানির্বাসনে বসে থাকে যে মানুষ, আত্মআবিষ্কারের লিপি হয়তো তার লিখে রাখা হয় না সেভাবে। এরকম কত অলিখিত কবিতা নিয়ে বেঁচে থাকে মানুষ, স্বপ্ন দেখে, স্মৃতির ফোঁড় তুলে সাজিয়ে রাখে তার নিজস্ব নকশিকাঁথাটি।

আমার ছোটবেলা মফস্বলের গন্ধে মাখামাখি। কলকাতার বুকে বড় হয়ে উঠলেও লম্বা ছুটির দুপুরগুলো অনেক সময়ই কেটেছে বহরমপুরে। খাগড়া, মধুপুর রোড, লালদিঘির পাড় ধরে হেঁটে যাওয়া সেই ছোটবেলা, যার কোন ফটো অ্যালবাম নেই। মনে মনে তাকে বারবার ফিরে দেখি, বুঝি। বুকের ভেতর সেই শান্ত সেপিয়া ছায়া নিয়ে বেঁচে থাকি। সেই ছায়া সমস্ত উড়ে আসা কঠিন শব্দকে আচ্ছাদন দেয়, আঘাতের তীব্র দাগে লেপে দেয় মায়াবী জলছবি।

একাকিত্ব আমাদের মতো মানুষের কবচকুণ্ডল। কিছু ভুলতে দেয় না, অথচ সবকিছুর ওপর একটি মিঠে স্বাদের আর্দ্র স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে রাখে। ঠিক যেন সদ্য ভোরের দোকানে কেউ একা এক উনুনের ধারে বসে আঙুলের নিখুঁত কায়দায় কড়াভর্তি জিলিপি ভাজছে, গন্ধে ম ম করে উঠছে দোকানের পাশের রাস্তাটি। নিজেকে দূর থেকে দেখি আর বিশ্লেষণ করি হঠাৎ করে পাওয়া সম্পর্কগুলোকে। রানিবাগান থেকে মধুপুর রোডের দিকে যেতে যেতে যে বন্ধুটির সঙ্গে রোজ দেখা হয়ে যেত, তার সঙ্গে আমার মন কেমনের নিবিড় সদ্ভাব। সে তার উদার শ্যামলিমা বিছিয়ে ডাক দিত আমাকে। বাঁধানো রাস্তার দু’ধারে নৃত্যের বিভঙ্গ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোহিনী গাছেরা কুশল সংবাদ জানতে কুসুম গন্ধ বিলিয়ে দিত হাওয়ায়। সেই গন্ধই যেন তাদের চিঠি লেখালেখি, আবেগের ভাষালিপি। সেই নিরুচ্চারের সৌরভ সমস্ত তীক্ষ্ণকে প্রশমিত করে দিতে পারে। যদিও তীক্ষ্ণের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি তখনও। সেরিকালচার গার্ডেনের সেই শ্যামল বিস্তৃতি আজও তেমন সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হয়তো। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে  আমি তাকে অনুভব করেছি। তাকে আমি আমার একাকিত্বের সত্য মনে করে তুলে রেখেছি গোপন সিন্দুকে। বিক্ষত  হবার মুহূর্তগুলোতে সেই সিন্দুকের নামেই নিরাময় হয়ে যায় অর্ধেক আঘাত ।

একটি মানুষের কথা বলি। এই পথেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে বারবার। জমাট মধুবর্ণ সেই মানুষটির কন্ঠের উত্তাপ আজও শ্রবণের ঘরে বাসা বেঁধে আছে । শীর্ণ বৃক্ষের মত তার দেহ, অথচ চোখ দুটি ভারী কমনীয়। আমার সেই শ্যামল বন্ধুটির সঙ্গে তারও নিবিড় সখ্য ছিল। টুকটুকে  হাতলের এক বিরাট কাঁচি নিয়ে সে গাছের পাতা ছেঁটে বেড়াত। ধুতিটি হাঁটুর ওপরে গুটিয়ে থাকতো, কোমরে গামছা, মাথায় পাগড়ী। সুর যেন  তার দোসর। একদিন তার দেখা না পেলে মন চঞ্চল হয়ে উঠত আমার। মাকে বিরক্ত করতাম খুব। দাদু বুঝতেন, সে আমার নিভৃতের আত্মীয় হয়ে উঠছে অজান্তেই। খুঁজে পেতে ধরে আনতেন তাকে। আপনভোলা সেই মানুষটি কিছুতেই চেয়ারে বসতো না। তাতে নাকি তার স্বভাব নষ্ট হয়ে যাবে। লাল মেঝেওয়ালা গোল বারান্দায় বসে আশ্চর্য সব গান গাইত। দাদু রুপোর গড়গড়া হাতে আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসে আছেন, ফ্রক পরিহিত আমি দু হাতে জানলার লম্বা গারদ ধরে দাঁড়িয়ে দোল খাচ্ছি , আর সেই মধুবর্ণ মানুষটি তার বয়সের শেকড়বাকড় নস্যাৎ করে শরীর দুলিয়ে গান গেয়ে চলেছে। শরীরের অপরাহ্ন তার কণ্ঠের যৌবনকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি।


সুর হল গাছের মতন। সুরে জল, মাটির টান না থাকলে সে সুর সারাজীবন বাঁচে না। তখন সে কথার অর্থ কিছুই বুঝিনি। এখন মনে হয়, জল আর মাটির টান না থাকলে মানুষ বাঁচে?  তার সৃষ্টি?
সুপারফিসিয়ালিটি আসলে একটা অসুখ। একটা জাতিকে ভুল স্বপ্নের দিকে চালিত করতে পারে। লাটাই এর সুতো ছিঁড়ে গেলে ঘুড়ি যেমন গোঁত্তা খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়ে, ঠিক তেমনি।


বহরমপুরের মানুষের কথায় এক আশ্চর্য সুরেলা টান আছে। অতি সাধারণ কেজো কথাও যেন সেই সুরের ছোঁয়ায় নরম হয়ে আসে। আমার গায়ক বান্ধবের কথাতেও এই মোহন টান ছিল। তার গানের গল্প শুনতে-শুনতে কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে যেত, টের পাওয়া যেত না। সে একবার এমন একটা কথা বলেছিল, সারা জীবন মনে সেই কথাটির দাগ রয়ে গেছে। সুর হল গাছের মতন। সুরে জল, মাটির টান না থাকলে সে সুর সারাজীবন বাঁচে না। তখন সে কথার অর্থ কিছুই বুঝিনি। এখন মনে হয়, জল আর মাটির টান না থাকলে মানুষ বাঁচে?  তার সৃষ্টি?
সুপারফিসিয়ালিটি আসলে একটা অসুখ। একটা জাতিকে ভুল স্বপ্নের দিকে চালিত করতে পারে। লাটাই এর সুতো ছিঁড়ে গেলে ঘুড়ি যেমন গোঁত্তা খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়ে, ঠিক তেমনি।
মজার কথা হল-  অন্য কারোর মতো যখন হতে চাই, আমরা ভুলে যাই যে  যার মত হতে চাইছি, সে তার নিজের মতো বলেই সে সফল। বাবর তাঁর বাবরনামা লিখেছিলেন চুঘতাই তুর্কিতে। ফারসি ভাষায় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ফারসি ভাষায় বইটি রচনা করেননি। অথচ ফারসিতে  লিখলে বইটির পাঠক আরও বৃদ্ধি পেত। বইয়ের সাফল্য নয়, লেখার তাগিদ আর নিজের জলমাটির টানই তাঁকে চুঘতাই তুর্কির দিকে টেনে নিয়ে গেছিল। আমাদের নিজস্বতাই আমাদের জল আর মাটি। কোহেনের কবিতায় এই জলমাটির স্বাদ পেয়েছি বারবার। যেমন পেয়েছি রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দিন, বিভূতিভূষণ বা জীবনানন্দে। নিউইয়র্ক টাইমস একবার কোহেন সম্পর্কে একটি অসাধারণ মন্তব্য করেছিল। “Leonard Cohen was the poet Laureate of the lack, the psalmist of the privation, who made Imperfection gorgeous.” 


চূড়ান্ত পারফেকশনের অর্থ, সেখানে আর পাওয়ার কিছু নেই। Perfect-এর আর আলাদা করে কোনও বৈশিষ্ট্য থাকে না। ভাবুন তো! লোভহীন ম্যাকবেথ বা সংশয়হীন হ্যামলেট কি ক্লাসিক চরিত্র হয়ে উঠতেন কোনওদিন? কিংবা  রাবণ?
নিজের ভেতরকার খুঁত, দৈন্য আর অভাবকেই পবিত্রতম মন্ত্রের সৌকর্য দিতেন কোহেন।

ইম্পারফেকশনকে সাড়ম্বরে উপস্থাপন করার সাহস সকলের থাকে না । অথচ রেমব্রান্টের ভাস্কর্য লক্ষ্য করুন। সেখানে ইম্পারফেকশনের সদর্প উপস্থিতি। খুঁতকে উদযাপন করতে জানতে হয়। খুঁত হল নিখুঁতের দিকে আমাদের  যাত্রা।  যাত্রা একসময় না একসময় শেষ হয়ে যাবে। তখন আবার কোনও ইম্পারফেকশন খুঁজে বেড়ানো। চূড়ান্ত পারফেকশনের অর্থ, সেখানে আর পাওয়ার কিছু নেই। Perfect-এর আর আলাদা করে কোনও বৈশিষ্ট্য থাকে না। ভাবুন তো! লোভহীন ম্যাকবেথ বা সংশয়হীন হ্যামলেট কি ক্লাসিক চরিত্র হয়ে উঠতেন কোনওদিন? কিংবা  রাবণ?
নিজের ভেতরকার খুঁত, দৈন্য আর অভাবকেই পবিত্রতম মন্ত্রের সৌকর্য দিতেন কোহেন।

কোহেনের আরও একটি কবিতা তুলে ধরি ।
“আনন্দ শিকারের এই সামান্য আলোতে আমার ভয় করে। দুঃখের সঙ্গে হয়তো কোনওদিনই জানাশোনা হয়ে উঠবে না। আমি চিৎকার করে যেই তোমাকে ডেকে উঠি, হৃদয়ের সব স্পন্দন এসে একজায়গায় জড়ো হয়। আর কবে আমি কৃতজ্ঞতায় কেঁদে উঠব বলতে পারো? কবে গেয়ে উঠব তোমার ক্ষমার গান? আমার অতীত ঋণে ভরা। আমার ভবিষ্যৎ? সে তো তোমাদের হাতে। মৃত্যু আমার দিকে এগিয়ে আসছে দ্রুত পায়ে। তার হাতে কাদামাটি মাখা সমর্পণের পতাকা।
সহজের  দক্ষতা থেকে উদ্ধার করো আমাকে। পবিত্র শৈল্পিকের দিকে নিয়ে যাও। নিজের আত্মাকে আমি যতদূর টেনে  নামিয়েছি, দেখে ভয় করে। তোমার বিচার বড়ো তীব্র ;স্তব্ধতা বিদীর্ণ করা আচমকা  চিৎকারের মতো । অনড়, অমোঘ।  আমাকে নত করো প্রভু। তোমার ক্রোধের সামনে আমাকে নত করো। ঈপ্সিতের শবের পাশে শুয়ে আছি। চিতার ধোঁয়া আর ছাইয়ের জাদু ঘিরে ধরেছে আমাকে। আমার সব অনুতাপ, সব ক্ষমাপ্রার্থনা আমি বিস্মৃত হয়েছি। আমার স্মৃতি ফিরিয়ে দাও প্রভু। পরম পিতার দিব্যি। তোমার যে নামে স্বর্গ-নরক মুখরিত,  মধুময়,  সেই নামের দিব্যি তোমাকে। যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে, যে পৃথিবী আসেনি এখনো, সেই সমস্ত গোপন ও উন্মুক্তের মধ্যে বেজে চলা সুস্পষ্ট সংগীত আমার কানে বিকৃত হয়ে বাজছে এখন। হে পরম সত্য, হে অমোঘ, আমাকে নতুন করে স্পন্দন দাও। তুলে ধরো। যে মানুষের বুক শুধু ঘৃণায় ডুবে আছে, সেও একদিন নত হবে। দেবদূতেরা একদিন তার ঘরে এসে ভিড় করবেন ঠিক। বিকৃত, ধূসর এই দুনিয়ায় আবার সবুজের বীজ বপন  করে যাবে কেউ। দুই হাতে বেড় দিয়ে ঘিরে রাখবে সজীব চারাগুলি । শিক্ষা শুধু শিক্ষার কথাই বলবে, অন্য কিছু নয়। কাল যে ছিল ভয়াবহ  শয়তান, আজ তাকে দ্যাখো।  ক্লান্তি এসে ঘিরে আছে তাকে। যুদ্ধজাহাজের চালক ভয় পাচ্ছে, তার সন্তানের শরীরেই বুঝি বোমা  বর্ষিত হবে। দাঙ্গা নিজেই ভীত, কেঁদে উঠছে শান্তির দরজায়। এই ক্ষত আমাদের হৃদয়কে চিরে দিচ্ছে। নির্বাসিতের ভিড় ঘন হচ্ছে আরও। আমাদের সমস্ত পৃথিবী তোমার অনুপস্থিতির স্মৃতি হয়ে উঠছে ক্রমশ।
আর কতদিন তুমি দুঃখের শরে আমাদের বিদ্ধ করবে বলো! আর কতদিন মানুষকে এই আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হতে হবে! রক্ত নিজেই রক্তকে পান করছে, ক্ষত গ্রাস করছে ক্ষতকে। এক দুঃখ পিষে দিচ্ছে আরেক দুঃখকে । তোমার এই অন্তহীন ধৈর্যের রাতে ক্রুরতা মহড়া দিচ্ছে আরও অবিমৃষ্য ক্রুরতার। তোমার শপথ সত্য করে তুলতে সত্য কবে আসবে আবার? আজ যখন মানুষ শুধু মানুষের কথা শুনছে, ঘোর নরকেও তোমার নাম প্রতিষ্ঠিত হোক। তোমার নিয়মের নিগড়ে বেঁধে মুক্ত করো আমাদের। ক্ষমা পৃথিবীর বধূ। তুমি তার পিতা। ক্ষমা করো। আমরা তোমার সন্তান। এই ক্ষণিকের পৃথিবীতে তুমি আমাদের নিরাময়ের মন্ত্র দাও”।

কোহেনের এই কবিতা কোনও দেশকালের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। প্রকৃত কবিতার কোনও গণ্ডি হয় না। প্রকৃত কবিতা একটি আলো জ্বালে। কখনও সেটি প্রলেপ হয়ে ওঠে, কখনও বা হয়ে ওঠে একটি উন্মুক্ত ক্ষত । কোহেনের এই কবিতাও নিজেই ক্ষত, নিজেই তার নিরাময়।

কবি যখন বলেন ‘আমাকে নত করো’, এখানেই তিনি উত্থিত হন। এই অদ্ভুত শতকে যখন শুধু অন্যকে নত করার প্রচেষ্টায় আমরা নিজেদের খোলসছাড়া কুৎসিত রূপকে মেলে ধরছি, ঠিক তখনই একজন প্রার্থনা করছেন – আমার অহংকার কেড়ে নাও। সমর্পণের এই পবিত্রতা আমরা রবীন্দ্রনাথের গানে কবিতায় পেয়েছি, পেয়েছি বৈষ্ণব সাহিত্যে, কীর্তনে, লালন এবং বাংলার লোকগানে।
(ক্রমশ)

শেয়ার করুন

0Shares
0
অন্য একতারা যুগান্তর Exclusive