সৌভিক কথা, পর্ব ২

সৌভিক কথা, পর্ব ২

একটা শীতের মতো শীত পড়েছে কলকাতায়। সিলিং ফ্যান হাতজোড় করে বলেছিল – “স্যার, ছেড়ে দিন, আর কটা দিন আমাকে একটু রেস্টে থাকতে দিন, এরপর তো সারা বছর ঘুরতে ঘুরতে জান কয়লা হয়ে যাবে…” …পারলাম না, তোমার কথা রাখতে পারলাম না ফ্যান, তাতে তুমি আমার ফ্যান থাকলে না হয়তো , কিন্তু অউর কোই চারা নহি থা। ফ্যানের বড় ভাই এ.সি. আতঙ্কে এন্টিসিপেটরি বেইল নিয়ে বসে আছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি জ্যাকেট-সোয়েটার-মাফলার বিদায় নিয়েছে, নিভিয়া ক্রিম ঢুকে পড়েছে কৌটোয়, এ যেন শীতকাল নয়, অকাল-বসন্ত। কপালে ফুটে উঠছে বিন্দু বিন্দু ঘাম যা অচিরেই সিন্ধু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল , মিসেস মালহোত্রার গোলাপি উলেন স্কার্ফ বাসন্তী দোপাট্টা হয়ে উড়ছে আকাশে, কম্বল নিয়েছে ছুটি। এ বছর শীত কি তবে চলে গেল? অচানক শেষ হয়ে গেল শীতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক? যদিও, সম্পর্ক এভাবেই হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, এক্সপায়ারি ডেট এগিয়ে আসে অনেক সময়েই, পুরনো বারান্দায় বসে বাঁশি বাজায় বিষণ্ণ বাঁশিওয়ালা। গত প্রায় এক বছরে, কতজন ‘নেই’ হয়ে গেল― কার্টেসি অতিমারি, একটা মাস্ক-পরিহিত নীল গ্রহে নিঃশব্দে রক্তাক্ত হল কত, কতশত হার্টবিট স্ট্রেট লাইন হয়ে গেল, তার ইয়ত্তা নেই। এই মনখারাপের পৃথিবী কি এই ২০২১-এ সেরে উঠবে কিঞ্চিৎ, আমাদের ‘হার্ড ইমিনিউটি’ কি তৈরি হয়ে গেছে , ভ্যাকসিনের কী সিন এক্সাক্টলি ― এইসব প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব, ম্যাজিশিয়ান ছাড়া কেউ জানেনা।

সম্পর্ক হারিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে মনে এল বইমেলা এ বছর অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত , হয়তো বা হবেই না। বইমেলা তো একটা সম্পর্ক, স্মৃতি-বিস্মৃতির মধ্যে থেকে মায়াবী আলো নিয়ে ফুটে ওঠা একটা মুখ, কলকাতা বইমেলা। সেই বইমেলা এবার নেই। শেষ শীত আর বসন্ত শুরুর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রিয় ঘ্রাণ এবার নেই , নেই সেই ধুলো, “গার্গী-শ্রেয়সী-চেনা মুখগুলো , পরিচিত হাসি”, নেই বইমেলার সেইসব অলি-গলি, মুক্তমঞ্চের কবিতা-মাইক, টেবিলে টেবিলে নতুন অক্ষর-অভিমান, শব্দ-অভিযান; অতিমারির প্রকোপে কত কিছু ঝাপসা হয়ে গেল― কতদিন পর দেখা হওয়া কবিতা-কমরেড, লেবু চা আর গোপন মদের স্রোতে বয়ে চলা বাংলা কবিতার নতুন নতুন প্রেরণারা, একটু ধুলো, একটা সেল্ফি, পুরনো শত্রুর চোখে চোখ রেখে “কী খবর, ভালো?”; পাকা দাড়ি ধরে ঝুলে পড়া স্লিভলেস পদ্যতরুণী , ছন্দ না শিখেই “ছন্দে লেখা আর হয় না” – বলে ওঠা পাকা-পেঁপে কলেজ-যুবক, হারানো কবি, কবেকার কুয়াশা-কবিতা , এস.বি.আই. অডিটোরিয়ামের উঁচু মঞ্চের পাশ থেকে থেকে গা ঝেড়ে উঠে আসা লড়াকু সম্পাদক― এইসব ছোট ছোট আশা , ছোটখাটো ব্রিজ , আনমনা করমর্দন…
আমরা যারা লেখালিখি করি , তাদের জন্যে কলকাতা বইমেলা এক বাৎসরিক মিলন-উৎসব। এই “নেই”-রং সময়ে দাঁড়িয়ে তাই এ বছর ধূসরতাই আমাদের সম্বল। হয়তো, এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বইমেলা না করার বা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তই সঠিক কারণ মেলায় প্রচুর সংখ্যক মানুষ আসেন, ভিড় হয় এবং ও রকম জমায়েতে ‘করোনা’ সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। তবুও, প্রশ্ন জাগে― সব কিছুই তো চলছে যেমন চলার, জমায়েতও হচ্ছে এদিক-সেদিক, রাজনৈতিক সভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে চলেছে অহরহ, যত দোষ বইমেলার? এ কথা হয়তো অভিমানের মনে হতে পারে, তবে বইমেলা না হবার আর্থিক ক্ষতিও তো বিশাল। অনেকে মনে করছেন বাংলা প্রকাশনার স্বার্থে কলকাতা বইমেলা হওয়া জরুরি ছিল। মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষদের ভাত-কাপড়ের সংস্থান হয় বইমেলা থেকে। কলকাতা বইমেলার পরিচালকদের বক্তব্য অনুযায়ী গতবার ২২ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছিল কলকাতা বইমেলায়। এর অর্ধেক টাকাও যদি বাংলা বই বিক্রির জন্য হয়ে থাকে সেই টাকাটাও বাংলা প্রকাশনার জন্য বিরাট ব্যাপার। এই টাকা ভাগ হয়ে যায়, প্রকাশক, প্রকাশনা কর্মী, লেখক, ডিটিপি অপারেটর, প্রুফ রিডার, ছাপাখানার মালিক এবং কর্মী, ল্যামিনেশনের মালিক এবং কর্মী, প্রচ্ছদ শিল্পী, কাগজের দোকান, বাঁধাই কর্মী, বিজ্ঞাপন কর্মী, ভ্যানওয়ালা, ডেকোরেটর কর্মীসহ আরও নানান মানুষের মধ্যে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্যে গত প্রায় এক বছর ধরে ভারতীয় অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। জি.ডি.পি. নীচে নামতে নামতে তলিয়ে গেছে, উঠে গেছে ছোট-মাঝারি ব্যবসা, চাকরি চলে গেছে হাজার হাজার মানুষের, ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে। এ সময় ইকোনোমি-র , তা সে জাতীয় বা প্রাদেশিক যাই হোক, দরকার একটা ‘বিগ পুশ’ , মানুষের হাতে টাকার যোগান দেওয়া খুব প্রয়োজন। কলকাতা বইমেলা সেদিক থেকে কিছুটা হলেও এই রাজ্য বা পূর্ব ভারতের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারত বলেই মনে হয়। সে যাই হোক, কথা হচ্ছে এবার জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা বইমেলা নেই , “বই ডাকছে বই” গান নেই , “বন্ধু কী খবর বল” নেই। অনেক কিছুই মেনে নিয়েছি আমরা এই কয়েক মাসে , এটাও মেনে নিতে হবে , কারণ ‘living’ এবং ‘surviving’-এর মধ্যে যে ‘red line’ , সেই লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে এখন দোদুল্যমান আমাদের ইহকাল।

চলে যাওয়া শীত আর না-আসা বসন্তের মধ্যবর্তী বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, এ বছর বসন্তও কি আসবে সেইভাবে ? গুলাল-ইশারায় রক্তিম হবে মনদিগন্ত ? খোয়াইয়ের রাঙা ধুলো পেরিয়ে কেউ হেঁটে আসবে গতজন্ম থেকে, পলাশ-শিমুলবনে হলুদ পাতার খাটিয়ায় গা এলিয়ে দিয়ে সে শুনতে চাইবে, কবিতা? বন্ধু অনির্বান দাশ গানের লিরিকে লিখেছিল -“ছাড়ো, এসব কথা রাখো / কোনও বান্ধবীকে ডাকো / তার হৃদয় ঘেঁষে বসি / তার শিরায় আউশ চষি” ; হে রোগক্লান্ত নীল গ্রহ , তুমি সেরে ওঠো , আর কতদিন আমাদের আউশ চষা বারণ থাকবে?

প্রচ্ছদ ও ছবি: ত্রিনাথ মজুমদার

 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive সৌভিক কথা