নেতাজীর অন্তর্ধান : শতাধিক বছরের রহস্য — ১

নেতাজীর অন্তর্ধান : শতাধিক বছরের রহস্য — ১

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে যুগান্তরের বিশেষ প্রতিবেদন লিখলেন অনন্যা মাইতি। 

 

কেউ বলে রোম, আবার কেউ বলে জার্মানি, কেউ বলে রাশিয়া, আবার কেউ বলে জাপান বা আরও অন্য কোথাও।
আবার কেউ কেউ বলে সাবমেরিনে করে তিনি কোথাও চলে গেছেন।
কেউ বা বলে, মহিলা ছদ্মবেশ ধারণ করে আফগানিস্তান তারপর আবার অন্য কোথাও।
কেউ মনে করেছেন, তিনি সন্ন্যাস নিয়ে হিমালয় আরোহণ করেছেন।
গুজবের শেষ নেই তাঁকে ঘিরে।

তারপর একদিন রেডিওতে, ” আমি সুভাষ বলছি।”
ভারতবাসীর চোখে জল, গায়ে কাঁটা। কারণ, ততদিনে স্বাধীনতা আর সুভাষচন্দ্র সমার্থক হয়ে গেছে।

১৯৪৫ এর ১৮ই আগস্ট। তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষ মারা গেছেন এমনই খবর প্রকাশ পায় পাঁচ দিন পরে, ২৩শে আগস্ট। যুক্তিতর্ক, চাপানউতোর চলতে থাকে। কেন, কীভাবে, কোথায়, কখন? বিশ্বাসযোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য কোনও ব্যাখ্যা আজ অবধি সরকারিভাবে পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে তা হল, তথাকথিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ওপর ভিত্তি করে কতগুলি সম্ভাব্য অনুমানমাত্র।

১. ফিগেস রিপোর্ট, ১৯৪৬

প্রচলিত গুজবের চাপে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সুপ্রিম অ্যালায়েড কমান্ড কর্নেল জন ফিগেসকে তদন্তভার দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সালের ২৫শে জুলাইতে তাঁর পেশ করা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৯৪৫ এর ১৮ই আগস্ট তাইহুকু সেনা হাসপাতালে বিভৎসভাবে পুড়ে যাওয়া এবং প্রচন্ড আঘাতে হৃৎস্পন্দন থমকে যাওয়ার কারণে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা থেকে ৮টার মধ্যে নেতাজীর মৃত্যু হয়।

২. শাহ নওয়াজ কমিশন, ১৯৫৬

জনঅসন্তোষ থামে না। নেতাজীর মৃত্যু সম্পর্কিত বিতর্কে রাশ টানতে ভারত সরকার আইসিএস এস. এন. মৈত্র এবং সুভাষচন্দ্রের দাদা সুরেশচন্দ্র সহযোগে প্রাক্তণ সাংসদ ও আজাদ হিন্দ কমিটির লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ নওয়াজের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল গড়লেন। ১৯৫৬-এর এপ্রিল থেকে জুলাই মাস অবধি ভারত, জাপান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের ৬৭ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাথে কথোপকথনের পরে কমিশন নেতাজীর মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা হিসেবে রিপোর্টে পেশ করেন। প্রাথমিকভাবে একই সিদ্ধান্ত পোষণ করেও সুরেশচন্দ্র পরে চূড়ান্ত রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। তিনি মনে করেন, জওহরলাল নেহেরু এবং তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের প্রবল চাপের মুখে পড়ে কমিশন তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করছে।

৩. খোসলা কমিশন, ১৯৭০

ষাটের দশকে নেতাজীর পুনরাবির্ভাবের গুজব প্রবল হয়। ভারত সরকার পাঞ্জাব হাইকোর্টের প্রাক্তণ বিচারপতি জি. ডি. খোসলাকে তদন্তভার অর্পণ করেন। ১৯৭৪ এর পেশ করা রিপোর্টে তিনিও সহমত পোষণ করেন এবং বলেন মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা ছাড়া কিছুই নয়।

৪. মুখার্জি কমিশন, ২০০৫

১৯৯৯ সালে আদালতের আদেশানুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তণ বিচারপতি মনোজ কুমার মুখার্জি কমিশন জাপান, রাশিয়া, তাইওয়ানসহ আরও কয়েকটি দেশ সফর করে, বিভিন্ন স্বাক্ষী, প্রমাণ, বিশ্লেষণ বিভিন্ন ব্যাখাসম্বলিত একশোরও বেশি ফাইল পেশ করেন যাতে মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছিল,  নেতাজিকে নিরাপদে রাশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল যা শুধু জাপানি কর্তৃপক্ষ এবং হাবিবুর রহমান জানতেন। মুখার্জি অবশ্য এও বলেছিলেন, রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত চিতাভস্ম হৃদরোগে মৃত ইকিরো ওকুরা নামক এক সৈনিকের। রিপোর্টটি ২০০৬ সালের ১৭ই মে সংসদে আলোচিত হয় ও খারিজ হয়ে যায়।

৫. জাপানের সরকারি রিপোর্ট, ১৯৫৬ (২০০৬-এ প্রকাশিত)

“প্রয়াত সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু এবং অন্যান্য বিষয়” শিরোনামে ১৯৫৬ সালে জাপান সরকার একটি রিপোর্ট পেশ করেন যাতে বলা ছিল  ১৯৪৫ সালের ১৮ ই আগস্ট তাইওয়ানে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয়। রিপোর্টটি টোকিওর ভারতীয় দূতাবাসে স্থানান্তরিত হয়। ৬০ বছর পর  প্রকাশ্যে আসা এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিমানটি  আকাশে ওড়ার পর ভেঙে পড়ে এবং বিস্ফোরণ ঘটে। নেতাজীর পোশাকে আগুন লেগে সারা শরীর পুড়ে যায়। হাসপাতালে যাওয়া অবধি জ্ঞান থাকলেও কয়েক ঘন্টা বাদে তাঁর মৃত্যু হয়।

৬. সহায় কমিশন, ২০১৬

২০১৬ সালের ২৮শে জুন এক সদস্যের কমিশন গঠিত হয় এবং রিপোর্ট পেশ হয় ২০১৭ সাথে ১৯শে সেপ্টেম্বর। উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদের গুমনামী বাবার সাথে নেতাজীর মিল পাওয়া গুজবের ভিত্তিতে তদন্ত করে কমিশন রিপোর্ট দেয়, গুমনামী বাবা আর নেতাজী আলাদা ব্যক্তি।

নেতাজী বিশেষজ্ঞ চন্দ্রচূড় ঘোষ এবং অনুজ ধর অবশ্য কোনও কমিশনের রিপোর্টকে পুরোপুরি সমর্থন করেননি। বহু অনুসন্ধানের পর তাঁরা মনে করেন, কেউই পুরোটা সঠিক বলছেন না। “Conundrum” নামক বইতে তাঁরা তাঁদের মতামত যুক্তি, প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান যথেষ্ট অসঙ্গতিপূর্ণ যাতে এটি স্পষ্ট কেউ বা কারা আসল সত্য চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সামান্য স্মৃতিবিভ্রম হতেই পারে কিন্তু এটি কোনও সাধারণ ঘটনা নয় আর নেতাজীর সঙ্গীরাও কোনও সাধারণ নাগরিক নন। প্রত্যেকে উচ্চমর্যাদা এবং ক্ষমতাসম্পন্ন দায়িত্ববান সেনানায়ক। তাই ঘটনার গাম্ভীর্য, সময়জ্ঞান, সম্ভাব্য বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁরা যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তবুও আজ অবধি এত তদন্তের পর ভারত, জাপান, আমেরিকা— কোনও সরকারই নেতাজীর মৃত্যু প্রমাণ করার জন্য যথাযথ প্রমাণ দিতে পারেনি। “Circumstantial evidence” এর ওপর ভিত্তি করে রিপোর্টগুলো বানানো।

তাঁদের গবেষনায়, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খুঁটিয়ে দেখলে, পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যে সমস্ত তথ্যাবলী সরবরাহ করে সেগুলো দেখলে আমাদের মনেও একই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যার কোনো সদুত্তর মেলে উত্তর মেলে না:

১. ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট নেতাজী মারা গেলেও ‘দ্য জাপানিজ নিউজ এজেন্সি’ মৃত্যুর ৫ দিন পর অর্থাৎ ২৩শে আগস্ট তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ করল কেন?

২. খোসলা কমিশনের তদন্তে পাওয়া গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত বোমারু বিমানে ১৪/১৫ জন যাত্রী ছিলেন যার মধ্যে ৬ জন সাক্ষী জীবিত ছিলেন এবং তাঁরা সকলেই টোকিও যাচ্ছিলেন এবং মাঞ্চুরিয়াগামী যাত্রীরা সকলেই মৃত। জাস্টিস খোসলা যুক্তি দেন, তাইওয়ান সৈন্য তাদাশি আন্দোকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে জীবিতদের মধ্যে ২ জন— নোনোগাকি এবং তারো কোনো মাঞ্চুরিয়া যাচ্ছিলেন। কিন্তু দুজন সাক্ষীই যখন প্রত্যেক কমিশনকে বহুবার জানিয়েছেন তাঁরা টোকিও যাচ্ছিলেন তখন এই তৃতীয় ব্যক্তির বয়ান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? তাঁরা মনে করছেন, পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে খোসলা কমিশন রিপোর্ট পেশ করেন।

৩. জিজ্ঞাসাবাদের তালিকার ৩০ জনের মধ্যে ৬ জন জীবিত ছাড়া মোট ৫ জন ঘটনাটি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন যাঁদের মধ্যে মাত্র ১ জন— নাকামুরা ও দুর্ঘটনায় জীবিতদের মধ্যেও হাবিবুর ছাড়া অন্য কেউ ব্যক্তিগত ভাবে নেতাজীকে চিনতেন না। সায়গনে বিমান ছাড়ার আগে তাঁদের সাথে নেতাজীর প্রথম পরিচয়। তার ওপর ডাক্তার, স্থানীয় সেনা অফিসার হসপিটালে সারা শরীরে  ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় দেখেছিলেন।

৪. রহস্যজনকভাবে তাইহোকু বিমানবন্দরে নেতাজির বিমান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ কিছু জানতেন না। এটা আর যাই হোক, স্মৃতিবিভ্রম নয়।

৫. কেকিচি শাহ নওয়াজ কমিটিকে জানান, তিনি দাইরেন যেতে চান না, মুক্তেহ যেতে চান। হাবিবুরকে বলা নেতাজীর এই কথাগুলি তিনি আড়াল থেকে শুনতে পান। বোঝাই যাচ্ছে হঠাৎই পরিকল্পনা পরিবর্তিত হয়েছে। হাবিবুর অবশ্য এ কথা কোনও দিন স্বীকার করেননি। এটি আর যাই হোক ভুলে যাওয়ার মতো নয়।

৬. বিমানটি তাইহোকু ছাড়ার সময় সম্পর্কেও বিভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে।
লেফটেন্যান্ট কর্ণেল নোনোগাকি: দুপুরে বিমান পৌঁছোয় এবং দুপুর ২টোর সময়ে তাইহোকু থেকে ছাড়ে।
মেজর তারো কোনোও একই কথা বলেন।
মেজর তাকাহাশি:  সকাল ১১ টায় পৌঁছোয় দুপুর ১২.৩০/১ টায় ছাড়ে।
লেফটেন্যা্ট কর্নেল তাদিও সাকাই- দুপুরের দিকে আসে এবং দুপুর ১ টায় ছাড়ে।
ক্যাপ্টেন কেকিচি:  একই কথা বলেন।
হাবিবুর: দুপুর ২ টোয় আসে ২.৩৫ এর দিকে ছাড়ে।
মিলিটারি অফিসার হিসেবে তাঁদের সময় সচেতনতা থাকবে না, হতে পারে না।

৭. দুর্ঘটনার উচ্চতা সম্পর্কেও মতভেদ।
নোনোগাকি: ২০ মিটার।
তারো কোনো: ৩০ মিটার।
তাদিও সাকাই: ৫০ মিটার।
কেকিচি: ৫০০ মিটার।
নাকামুরা: ৩০/৪০ মিটার।
হাবিবুর: দুর্ঘটনার পর জাপানে আইয়ারকে বলেন  বিমানটি ২২০০- ৩০০০ ফিট (৯০০ মিটার)।
আবার তিনি সিএসডিআইসি (কম্বাইন্ড সার্ভিস ডিটেইলড ইন্টারোগেশন সেন্টার)-কে বলেন বিমানটি ৩০০ মিটার উচ্চতায় ছিল।
দুর্ঘটনাকবলিত বিমানের সঠিক উচ্চতা আন্দাজ করা সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে মুশকিল হলেও মিলিটারি অফিসার হিসেবে বয়ানে এত ব্যাপক গরমিল কীভাবে সম্ভব?

৮. বিমান দুর্ঘটনা কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। জীবনমরণের মাঝে তখন সূক্ষ্ম একটা সুতো। স্বাভাবিকভাবেই মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু দুর্ঘটনার পরে দেখা দৃশ্য মনে পড়ার কথা।
হাবিবুর শাহ নওয়াজ কমিটিকে বলেন, বিমানের ডানদিক থেকে প্রচন্ড একটা শব্দ হয়।
কিন্তু সিএসডিআইসি-কে বলেন, শব্দ বিমানের সামনের দিক থেকে আসে। হাবিবুর প্রপেলারের
পাশে বসে সামনের দিক থেকে আওয়াজ আর পাশ থেকে আসা আওয়াজের পার্থক্য করতে কীভাবে ভুল করলেন? এত ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার কীভাবে তিনি ভুলে গেলেন?

৯. বিমানটি কোন দিক দিয়ে পড়েছিল?
নোনোগাকি জানান, বিমানটি ডানদিকে ভেঙে পড়েছিল।
তাকাহাশি জানান, বিমানটি মাথার দিক থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ে।
নাকামুরা এরোড্রম থেকে দেখেন,  বিমানটি বামদিকে পড়ে যায়।
কোনটা সত্যি?

১০. দুর্ঘটনা ঘটার পর কী হল?
হাবিবুর জানিয়েছিলেন, এয়ারফিল্ডের বাইরে ১ বা ২ মাইল দূরে আছড়ে পড়ে।
নোনোগাকি জানান, বিমানটি রানওয়ের ওপর পড়ে।
টাকাহাশির মতে, একদম রানওয়েতে নয়, রানওয়ের সামনের দিকে মাঠে।
তাদিয়ো সাকাই বলেন, এয়ারফিল্ডের একদম শেষের দিকে বিমানটি আছড়ে পড়ে।
নাকামুরা বলেন, এয়ারোড্রোমের শেষ সীমানায় বিমানটি আছড়ে পড়ে।

১১.  তারপর?
শাহ নওয়াজ কমিটিকে হাবিবুর বলেন, বিমানটি ৪ টুকরো হয়ে যায়। নেতাজী যখন পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে আসার চেষ্টা করছেন, তখন হাবিবুর তাঁকে সামনের দিক থেকে বেরোতে বলেন  কারণ পেছনের রাস্তা বন্ধ। নেতাজী সামনে যান এবং আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
কিন্তু আবার তিনিই সিএসডিসিআই-কে দেওয়া বয়ানে বিমানটি ৪ টুকরো হয়ে যাওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন পাইলটের মাথার ওপর প্লাস্টিকের আস্তরণ ছিঁড়ে নেতাজী বাইরে আসেন।
নোনোগাকি জানান, বিমানটি ২ টুকরো হয়ে যায় এবং তিনি বাইরে ছিটকে পড়েন।
তারো কোনো বলেন, বিমানটি একদিক থেকে ভেঙে অপরদিকে দুমড়ে যায়। তিনিও পাইলটের মাথার ওপর বিমানের ছাদের প্লাস্টিকের ঢাকনা খুলে বাইরে আসেন। তারো কোনো পাইলট আর নেতাজীর মাঝখানে  ছিলেন। তাহলে কে প্রথম বাইরে এল? দুজনেই এক রাস্তা দিয়ে বেরিয়েছেন?
কেকিচি বলেন, বিমানটি একদম মাঝখান বরাবর ভেঙেছিল। তিনিও যেহেতু পেছনের দিকে ছিলেন তিনিও ছিটকে পড়েন বাইরে।
তাকাহাশি এবং তাদিও সাকাই অজ্ঞান হয়ে যান। তাকাহাশি জ্ঞান ফেরার পর দেখেন বাইরে শুয়ে আছেন। সম্ভবত তিনিও ছিটকে পড়েন। সাকাই তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরে পান এবং বাইরে বেরিয়ে আসেন। যদিও কোনদিক থেকে তা জানা যায় না।
নাকামুরা কিন্তু জানান, তিনি বাইরে থেকে দেখতে পান বিমানটির কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং তিনি পেছনের দরজা দিয়ে যাত্রীদের উদ্ধার করেন।

৬ জন জীবিত বিমানযাত্রী এবং নাকামুরা। একই ঘটনার সম্মুখীন হয়েও প্রত্যেকের আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা হয় কীভাবে?

১২.  শাহ নওয়াজ কমিটিকে হাবিবুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে বলেন নেতাজীকে তিনি সামনের দিক দিয়ে বেরোতে বলেছিলেন কারণ পেছনের রাস্তা বন্ধ। বাইরে এসে হাবিবুর দেখেন নেতাজী অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তাঁর থেকে ১০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে। অতি কষ্টে তিনি নেতাজীর বুশ কোটের বেল্ট খোলেন।
কিন্তু সেপ্টেম্বর ১৯৪৫-এ আমেরিকাকে দেওয়া বয়ানে সম্পূর্ণ অন্য কথা বলেন। ভুলে যাওয়ার পরিবর্তে অতি সূক্ষ্ম ঘটনাও তাঁর মনে পড়ে। তিনি নাকি জানেনই না কীভাবে নেতাজী বাইরে এসেছেন। বাইরে এসে তিনি নেতাজীকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে তাঁর পোশাক খুলে দেন। হাবিবুরের বয়ানের ব্যাপক গরমিল রহস্যমোচনের পরিবর্তে রহস্য আরও ঘনীভূত করে তোলে। নোনোগাকি শাহ নওয়াজ কমিটিকে একই কথা বলেন। কিন্তু ১৯৪৬-এ কর্নেল ফিগেসকে দেওয়া বয়ানে তিনি বলেন, প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে নেতাজী খুব আঁটসাঁট জ্যাকেট পরে ছিলেন। নোনোগাকি কীভাবে জানলেন? কারণ হাবিবুর বলেন নেতাজীকে দেওয়া পুলওভার তিনি পরেননি। নোনোগাকি আরও যোগ করেন, হাবিবের সাথে এরোড্রোমের একটি ঘরে গিয়ে নেতাজীর জ্বলন্ত পোশাক খোলায় সাহায্য করেন।
তাকাহাশি এক আশ্চর্য কথা বলেন। তিনিই নেতাজীর পোশাক খুলেছেন আর হাবিব দাঁড়িয়েছিলেন।
তারো কোনো সম্পর্কে নেতাজীর জীবনীকার লিওনার্ড গর্ডন জানান, কোনো নেতাজীকে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় দেখে জ্বলন্ত বুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন।
শাহ নওয়াজ কমিটিকে তারো কোনো জানান অন্য কথা। তিনি বলেন, তাঁর জ্ঞান ফিরলে নেতাজীকে তিনি পুরো উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তিনি নেতাজীর শরীরে কোনো আগুন দেখেননি বরং তাঁর রক্তাক্ত চোখ, যন্ত্রণাহীন মুখ, শরীরে একরকম আলো দেখেছিলেন।
নাকামুরা বলেন তিনি এবং দুই-তিন জন মিলে নেতাজীর পোশাক খোলেন।
কীভাবে সম্ভব তথ্যের এত অসামঞ্জস্যতা? এটা কি কোনও রোজকার ঘটে যাওয়া সামান্য ঘটনা?

১৩. হসপিটালে কে আনলো?
হসপিটালে ডক্টর ইওশিমি বলেন, নেতাজীকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় হাবিবুর হসপিটালে এনেছিলেন।
কেকিচি দাবি করেন তিনিই প্রথম হসপিটালে নেতাজীকে এনেছিলেন।
নোনোগাকি বলেন, তিনি এবং মেজর কোনো নেতাজীকে হসপিটালে আনেন।
কে কখন কোন ঘরে তাঁকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল তাও যথেষ্ট বিতর্কিত।

১৪. হাবিবুর বলেছিল নেতাজীর মাথা অনেকখানি কেটে রক্তপাত হচ্ছিল। আবার সেই হাবিব সিএসডিআইসি-কে বলে নেতাজীর মাথায় দুই তিনটি ফাটা দাগ ছিল। কিন্তু ইওশিমি কোনও কাটা বা ফাটার কথা অস্বীকার করেন। সহকারী ডাক্তার টি. সুরুতাও ইয়শিমির সাথে একমত হন।
এটা কী সত্যিই খুব ছোটখাটো কোনও ভুল?
একটা বিষয়ে সকলে সহমত হন, নেতাজীকে যখন হাসপাতালে আনা হয় তাঁর চোখ, মুখ আর নাক ছাড়া পুরো শরীরটাই ব্যান্ডেজ করা ছিল।

১৫. ইওশিমি বলেন তিনি সুরুতাকে একটা সাদা মলম লাগাতে বলেন এবং ৪টি ইনজেকশন দেন। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করার পর আবার ইনজেকশন দেওয়া হয়।
এই সময় চান পি শা নামের নার্স নেতাজীর শুশ্রূষা করছিলেন যিনি সাংবাদিক হারিন শাহ কে বলেন, তিনি নেতাজীর শরীরে অলিভ অয়েল লাগান। নার্স বলেন যে নেতাজী ওই হসপিটালে মারা যান। তিনি আরও জানান এত বীভৎস ভাবে পুড়ে যাওয়ার জন্য নেতাজীকে কোনও ইঞ্জেকশন দেওয়া যায়নি।
রহস্যজনকভাবে আর কোনওদিন ওই নার্সের খোঁজ মেলেনি।

১৬. ইওশিমি বলেন, রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার কারণে ২০০ সিসি রক্ত নেতাজীর শরীর থেকে বের করে নেন এবং এক জাপানি সৈন্যের ৪০০ সিসি রক্ত তাঁর শরীরে দেন।  হারিন শাহ বলেন,  জাপানি ডাক্তারি ছাত্রের রক্ত দেওয়া হয়। সুরুতা রক্ত দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। হাবিবুর তো মনেই করতে পারেননি রক্ত দেওয়ার কথা।
অন্য একজন ডাক্তার ইশি বলেন তিনি ওয়ার্ডে ঘোরাঘুরি করছিলেন যখন নেতাজীকে রক্ত দেওয়া হয় কিন্তু সেখানে ইওশিমি বা সুরুতা কেউ ছিলেন না।

১৭. হাবিবুর জানান, হসপিটালে নেতাজী আবিদ হাসানের খোঁজ করেন। হাবিবুর জানান যে, তিনি জানেন না। আর তাঁর সাথে সেটাই নেতাজীর শেষ কথা বলা।
কিন্তু, শাহ নওয়াজ কমিটিকে হাবিবুর বলছেন, দুর্ঘটনার পর এয়ারফিল্ডে শুয়েই নেতাজী তাঁকে শেষবারের মতো বলেন যে, দেশ খুব শীঘ্রই স্বাধীন হবে।
এই কথাই তিনি আইয়ারকে বলেন, কিন্তু স্থানটা পাল্টে এয়ারফিল্ডের জায়গায় হসপিটাল হয়।

১৮. মৃত্যুর সময় সম্পর্কেও ধোঁয়াশা।
ইয়শিমি বলেন রাত ৮টার আশেপাশে।
হাবিবুরের মতে, প্রায় রাত ৯টা।
সাংবাদিক নাকামুরা বলেন রাত ৯.৩০ মিনিট।
আবার ইয়শিমি ১৯৪৬-এ ওয়ার ক্রাইম অফিসারকে মৃত্যুর সময়  রাত ১১টা বলে জানান।
কিন্তু সুরুতা ফিগেস কমিশনকে জানান, নেতাজী দিনের আলো থাকতে থাকতেই মারা গেছেন।
হারিন শাহকে নার্স বলেন, নেতাজী বিড়বিড় করে মারা যাওয়ার আগে কিছু বলছিলেন, “quiet death.. I am dying peacefully..” নার্স ইংরেজি বুঝতেন না। কীভাবে বুঝলেন তবে?

১৯. শাহ নওয়াজ কমিটিকে হাবিবুর বলেন, সাংবাদিক যুইশি নাকামুরাকে তিনি বলেন তাইহোকু বিমানবন্দরে গিয়ে নেতাজীকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। আশ্চর্যজনকভাবে, হাবিবুর সিঙ্গাপুর বা সায়গনে তাঁর কমরেডদের সাথে যোগাযোগের কোনও চেষ্টাই করেননি। নেতাজীর সবচেয়ে কাছের মানুষ এবং বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে  হাবিবুরের প্রতিক্রিয়া বিশ্বাস করা শক্ত।

২০. পরের দিন সকালে হাবিবুরের কথামতো নাকামুরা জাপানি আর্মি অফিসারকে সাথে আনেন এবং নেতাজীকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। নেতাজীর দেহ কফিনে ভরা হয়।
হাবিবুর আবার বলেন, নাকামুরাকে পরের দিন সন্ধ্যেবেলায় আবার আর্মি হেডোয়ার্টারে পাঠান একই অনুরোধ জানিয়ে কিন্তু নাকামুরা বলেন এত বড় কফিন বিমানে ঢুকবে না।
নাকামুরা আবার সম্পূর্ণ অন্য কথা বলেন। তিনি পরেরদিন সকালে নয় দুপুরে ১টা/২টোয় হসপিটাল আসেন তখন নেতাজীর দেহ কফিনবন্দী। কিন্তু আর্মি হেডকোয়ার্টারে তিনি যাননি। বরং হসপিটালে এসে শোনেন এই সিদ্ধান্তের কথা।
হাবিবুর বলেন ২০ তারিখ সকালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সুরুতা ফিগেসকে জানান, নেতাজী মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা বাদে মধ্যরাতেই কফিনবন্দী করা হয় এবং পরের দিন সকালে নিয়ে যাওয়া হয়।
আবার শাহ নওয়াজকে তিনি বলেন, ১৮ এবং ১৯ তারিখ সারারাত হসপিটালে নেতাজীর দেহ ছিল। ১৯ তারিখে কফিন এলেও আরও দুই-তিন দিন তাঁর দেহ ওখানেই ছিল।
১৯৫৫-এ জাপান সরকারকে দেওয়া বয়ানে ওই সময় তিনি তাঁর অনুপস্থিতির কথা জানান। তার কয়েকদিন পরে একটা ঘরে তিনি নেতাজীর কফিন দেখেন।
হংকংয়ে জেরায় ইওশিমি জানান, ওই কফিনের দায়িত্বে থাকা অফিসার তাঁকে জানান, কফিনবন্দী নেতাজীকে জাপানে নিয়ে যেতে গিয়েও কোনও কারণে এয়ারপোর্ট থেকে হসপিটালে ফিরিয়ে আনা হয় কফিন।

২১. ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু:

১৯৪৬-এ একটি জেরায় ইওশিমি বলেন, ২০শে আগস্ট তিনি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেন তাতে দেহ পুড়ে যাওয়া এবং মস্তিষ্কে আঘাত লাগার কারণ দেখান।
১৯৫৬-তে শাহ নওয়াজ কমিটিকে তিনি বলেন ১৮ই আগস্ট ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেন এবং আর্মি অফিসারকে দেন। তিনি বলেন, আর্মি অফিসার তাঁকে ধমকান তিনি যেন সার্টিফিকেটে নেতাজীর নাম না লেখেন। তাই যদি হয় ১৮ তারিখের সার্টিফিকেটে তিনি নেতাজীর নাম লিখেছেন সেটা তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
শাহ নওয়াজকে সুরুতা বলেন তিনি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেননি।
কিন্তু ১৯৫৫-এ জাপান সরকারকে বলেন, তিনিই ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেছিলেন।
ডেথ সার্টিফিকেট কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তাইহোকুর স্থানীয় নিয়মানুসারে, ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া শেষকৃত্য সম্পন্ন করা যায় না। কেউ তাঁর দেহ বা শেষকৃত্য দেখতে পায়নি। একমাত্র মুখার্জি কমিটি বিষয়টি ধরতে পেরেছিল।

এরকম বহু প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর আমরা আজও পাইনি।

ক্রমশঃ 

শেয়ার করুন

0Shares
0
তখন সাম্প্রতিক