নেতাজির অন্তর্ধান : শতাধিক বছরের রহস্য — ২

নেতাজির অন্তর্ধান : শতাধিক বছরের রহস্য — ২

নেতাজি সুভাষচন্দ্র  বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে যুগান্তরের বিশেষ প্রতিবেদন লিখলেন  অনন্যা মাইতি। 

 

দ্বিতীয় পর্ব

ষাটের দশকে নেতাজিকে ঘিরে গুজব এবং উত্তেজনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। নেতাজি যেন উপকথায় পরিণত হয়েছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা কারোর অবিদিত ছিল না। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে বহু লোক বহু জায়গায় সন্ন্যাসীবেশী নেতাজিকে দেখেছেন বলে দাবি করেন।

১৯৪৭ সালে পাটনায় কেউ কেউ তাঁকে সাধুবেশে দেখার দাবি করেন।

১৯৬৫ সালে নদীয়ার কল্যানিতে গুজব ছড়ায় নেতাজি সেখানে আবির্ভূত হবেন। দেশবিদেশে থেকে বিপুল জনসমাগম ঘটেছিল।

১৯৭৫ সালে কানপুরে জয় গুরুদেব নামের একজন সাধু নেতাজিকে সামনে আনবেন বলে কয়েক লাখ লোক জড়ো করেন। সেটি যখন সম্ভব হল না, তিনি দাবি করলেন তিনিই নেতাজি।

এরকম প্রচুর বিক্ষিপ্ত গুজব শোনা যায়। যেহেতু সরকারি ভাবে কোনও তথ্যই জনসাধারণের সামনে আসেনি তাই মানুষের কৌতূহল নিবৃত্তি করার কোনও উপায় ছিল না।

শৌলমারীর সাধু সারদানন্দ

কোচবিহারের শৌলমারিতে সাধু সারদানান্দ মুজনাই নদীর ধারে প্রায় ১৫০ একর জায়গা জুড়ে ১৯৫৯ সালে একটি আশ্রম তৈরি করেন। তিনি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিকল্পে প্রভূত পদক্ষেপ নেন এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। হঠাৎ করেই ভারত সরকার সেই আশ্রমের সামনে সর্বক্ষণের পাহারা বসান। সরকারিভাবে মৃত ঘোষণার পরও নেতাজির সাথে সাধুর নাম জড়িয়ে পড়ায় সরকারের অস্বস্তি বাড়ে। ১৯৬১ সালে অনুগামী মেজর সত্য গুপ্ত দেখা করেন এবং স্বামী সারদানন্দকে নেতাজি বলে দাবি করেন। তারপর একে একে ভাইপো দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু, ব্যারিস্টার নীহরেন্দু দত্ত মজুমদার, ভবিষ্যত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় এসে দেখা করেন। সরকারি পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্টে জানা যায় ফলকাটাতে এই সাধু ১৯৫৯ সালে প্রথম আসেন। আশ্রমের পাবলিক রিলেশন অফিসার ডাক্তার গোপ গুরুবক্শ, নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার অবশ্য একেবারেই স্বীকার করেন না সারদানান্দই নেতাজি। পরে অবশ্য সত্য গুপ্ত নিজের ভুল স্বীকার করেন। শাহ নওয়াজ খান, আই.এন.এ কর্মী পি. কে. সায়গল, প্রাক্তণ কংগ্রেস সেক্রেটারি আশরাফউদ্দিন আহমেদ, নেতাজির ঘনিষ্ঠ সহকর্মী গোপাল মুখোপাধ্যায়, সুনীল দাস, সমর গুহ, নেতাজির শিক্ষক বেণীমাধব দাসের ছেলে নির্মল চন্দ্র দাস, নেতাজির ভাইঝি ললিতা দাস এবং বালক ব্রহ্মচারী তাঁর সাথে দেখা করতে গেলেও সাধু কারোর সাথেই দেখা করেননি। কিন্তু পুলিশ রিপোর্টে পাওয়া গেছে মেজর এন. জি. স্বামী গোপনে সারদানন্দের সাথে দেখা করলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ১৯৬২ সালে সারদানন্দের একটি ছবি পাওয়া যায় তাতে নেতাজির সাথে মিল পাওয়া গেলেও আশ্রম থেকে বিষয়টির তীব্র বিরোধিতা করা হয়। সারদানন্দ এবার অনেকের সাথেই দেখা করতে শুরু করেন। ১৯৪১ সালে নেতাজি ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার সময় কাবুলে যাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই উত্তমচাঁদ মালহোত্রা, এক সময়ের সহকর্মী পবিত্র মোহন রায়, ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা তাঁর সাথে দেখা করেন এবং অস্বীকার করেন যে সারদানন্দই নেতাজি। জহরলাল নেতাজির প্রাক্তণ সহকর্মী গোপনে সুরেন্দ্র মোহন ঘোষকে পাঠান এবং তিনি ফিরে এসে একই কথা বলেন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের তরফ থেকেও তদন্ত করে দেখা যায় সাধুর সাথে নেতাজির কোনও সম্পর্ক নেই।

হস্তাক্ষরবিদ কার্ল ব্যাগেট ও বি. লাল  নেতাজির সাথে ভগবানজির হাতের লেখার মিল পাননি।

১৯৬৩ সালে মত পাল্টে গোপ গুরুবক্শ, উত্তমচাঁদ বলেন সাধুই নেতাজি। তারপর আশ্রম চরম আর্থিক সংকট, ট্যাক্সের ঝামেলা,মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ার ফলে আশ্রমের প্রভাব কমতে থাকে। সারদানন্দ তাঁর কয়েকজন শিষ্য নিয়ে চলে যান উত্তরাখন্ডের উখিমঠ। সেখানেও তাঁর গতিবিধির ওপর নজরদারি চলছিল। ১৯৬৭-তে আবার তিনি এসেছিলেন শৌলমারী। তারপর  ১৯৬৮ থেকে তাঁকে বিলাসপুরে, অমরকন্টক, মহারাষ্ট্রে  পাওয়া গেছিল। ১৯৭৭ পর্যন্ত এভাবেই চলতে চলতে দেহরাদুনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

১৯৬২-তেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সাধুর পরিচয় পাওয়া সত্ত্বেও জনসাধারনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ  কতগুলি সম্ভাবনার কথা বলে। যেমন, বেনারস থেকে জনৈক কৃষ্ণকান্ত পান্ডে মাঝেমাঝে তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন যাঁর সাথে প্রায় ২০ বছর তাঁর যোগাযোগ।
যেমন, তিনি হতে পারেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনকান্ডে জড়িত ননী চক্রবর্তী। তাঁর শারীরিক বর্ণনার সাথে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলজের প্রিন্সিপাল ও স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীন চক্রবর্তীর (যিনি কুমিল্লা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করে পালিয়ে যান) সাথে মেলে। সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স ফোর্সের কাছে এর প্রমাণ আছে। আবার তাঁর চেহারা অনুশীলন সমিতির অবিনাশ ভট্টাচার্যের সাথে মেলে। কিন্তু পুলিশ রিপোর্টে যতীন চক্রবর্তী হিসেবেই তিনি প্রমাণিত হন।
এ ছাড়াও কলকাতা থেকে ডাক্তার কমলাকান্ত ঘোষ তাঁর চিকিৎসা করতে এসে তাঁর ভাইপো বর্ণিত নেতাজির শারীরিক চিহ্নগুলো খুঁজে পাননি।
আবার কেউ কেউ বলেন আসল নেতাজি আশ্রমের ভেতরে থাকেন, জনসমক্ষে আসেন না।

ফৈজাবাদের ভগবানজি বা গুমনামী বাবা

১৯৫৫ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ভগবানজি নামে পরিচিত এক উচ্চমার্গের সাধু উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করেন। শেষের এক বছর তিনি ফৈজাবাদের রাম সিং এর বাড়িতে  কাটিয়েছিলেন। যেহেতু তিনি পর্দার আড়ালে বসে কথা বলতেন, সংবাদমাধ্যম তাঁর নাম দিয়েছিলেন গুমনামী বাবা। এই সাধুর সাথে নেতাজির প্রভূত মিল পাওয়া গেলেও সরকারিভাবে আজও তা স্বীকার করা হয়নি। ১৯৮৬ সালে  সাধুর ২৬টি বাক্স ফৈজাবাদের জেলা কোষাগারে রাখা হয়। সেগুলিতে এমন কিছু প্রমান পাওয়া যায় যাতে বিশ্বাস জন্মায় যে তিনিই নেতাজি।

বৈদ্য কমলাকান্ত ঘোষ (যিনি শৌলমারীর সাধুর চিকিৎসা করেন) নেতাজির ভাইপো বর্ণিত চিহ্নগুলো ভগবানজির শরীরে পান।
দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, যাঁকে জওহরলাল পাঠিয়েছিলেন তিনি তাঁকে নেতাজি বলেই চিনতে পেরেছিলেন।
খবর পাওয়া গেছে, তিনি বাংলা বলতেন, বাংলা খবরের কাগজ পড়তেন, বাঙালি খাদ্য পছন্দ করতেন।
আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কিত প্রচুর নথিপত্রের সাথে আজাদ হিন্দের গোয়েন্দা প্রধান পবিত্র মোহন সরকারের চিঠি পাওয়া যায়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তণ মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন, প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল অজিত দত্তের লেখা চিঠিপত্র মেলে।
প্রচুর বাংলা ও ইংরেজি বই যার সাদা অংশে টিকা টিপ্পনী লেখা— নেতাজিরও সেই একই অভ্যাস ছিল।
আন্তর্জাতিক হস্তাক্ষর বিশারদ বি. লাল, কার্ল ব্যাগেট  নেতাজি এবং ভগবানজির হাতের লেখা একই বলে জানান।
তাঁর কাছে নেতাজির বাবা মা সহ নেতাজির আরও পরিচিত ব্যক্তির ছবি ছিল।
কলকাতা থেকে বছরে দুইবার (২৩শে জানুয়ারি ও দুর্গোৎসবে) কয়েকজন তাঁর কাছে যেতেন।
১৯৪৫ সালে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে একটি সম্মেলনে তাঁকে দেখা গেছে বলে শোনা যায়। ভগবানজির কাগজপত্রে তার উল্লেখ পাওয়া যায়।

মুখার্জি কমিশনও স্বীকার করেছিল ভগবানজির সাথে নেতাজির মিল।
নেত্রী লীলা রায়, পবিত্র মোহন রায়, বিপ্লবী সুনীল দাস, সমর গুহ, অতুল সেন, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, অনিল রায় সহ আরও অনেকেই স্বীকার করেন তিনিই নেতাজি।
ভগবানজির মৃত্যুতেও গুজব থেমে থাকেনি। আবার শোনা গেল,
তিনি নাকি বেঁচে আছেন।

তবে নেতাজির সাথে ভগবানজির ডিএনএ পরীক্ষায় কোনও মিল পাওয়া যায়নি। অবশ্য তা নিয়েও  বিস্তর বিতর্ক আছে।

তবে কোথাও না কোথাও বোঝা যায়, শৌলমারীর সাধুর সাথে ফৈজাবাদের সাধুর যোগাযোগ ছিল।
ভগবানজি কি শৌলমারীর ঘটনাটা সাজিয়েছিলেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য?
বিপ্লবী সুনীল দাস একবার ভগবানজিকে বলেন যে, তিনি জনসমক্ষে এলে তাঁর প্রতি যে অবিচার হয়েছে তার জবাব মানুষ সরকারের কাছে চাইবে, বিপ্লব ঘটবে। উত্তরে তিনি বলেন, বিপ্লব ঘটার হলে শৌলমারীর ঘটনাতেই ঘটতো। বিপ্লব করার মানুষ আর নেই।
তিনি জানতেন সরকার নেতাজিকে খুঁজছে।
হতে পারে নিজের ওপর থেকে গণমাধ্যমের মনোযোগ সরানোর জন্য “parallel bluff” তৈরি করেছিলেন।
সেই জন্যই তাঁকে চিঠি লেখার কারণে অতুল সেনের সাথে আর কখনও দেখা করেননি।

আর যা-ই হোক, একটি কথা পরিষ্কার হল যে, কমিশন যা-ই রিপোর্ট দিক, সরকার কখনই ১৯৪৫ এর ১৮ই আগস্ট নেতাজির মৃত্যুকে স্বীকার করেননি। যদি করতেন, যে কোনও রটনা সরকারের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারত কি? নেতাজি সম্পর্কে যেখানে যত গুজব রটতো সব জায়গায় এত ব্যয়বহুল পুলিশি পাহারা, গোপন তদন্ত অন্তত ভারতবর্ষের মত আর্থিক সঙ্কটাপন্ন দেশে চালানোর প্রয়োজন কি ছিল?

সমাপ্ত 

 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
তখন সাম্প্রতিক