প্রত্যেক সমস্যাই রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত: ছাত্র এবং রাজনীতি প্রসঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

প্রত্যেক সমস্যাই রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত: ছাত্র এবং রাজনীতি প্রসঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

টিম যুগান্তর: “আপনারা আমাকে সুদূর কলকাতা থেকে এখানে ডেকে এনেছেন আপনাদের সাথে কথা বলার জন্য। সবার মধ্যে আমাকেই বা কেন ডাকলেন? এই জন্যই কি, যে পূর্ব এবং পশ্চিম মিলেমিশে তাদের সাধারণ ও সর্বজনীন সমস্যাগুলোর সমাধান করা উচিত? আমাদের একে অন্যের সাহচর্য প্রয়োজন এই জন্যই কি যে, বাংলা প্রথম ইংরেজ শাসনের কব্জায় এসেছিল এবং পাঞ্জাব শেষ ? নাকি এর কারণ, আপনাদের এবং আমাদের সমস্যাগুলি একই রকম এবং আমরা দু’পক্ষই একই মানসিকতা ও একই আকাঙ্খা লালন করে আসছি ?

আমার আজকের বক্তৃতায় যদি কোনও রাজনৈতিক প্রশ্নোত্তর থেকে থাকে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী নই। আমাদের দেশে বহু মানুষ আছেন যাঁরা মনে করেন, রাজনীতি যেহেতু ছাত্রছাত্রীদের আলোচ্য বিষয় নয় তাই রাজনৈতিক মঞ্চে ছাত্রছাত্রীদের কিছু করণীয় নেই।

কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মতামত, ছাত্রসমাজ রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, একটা স্বাধীন দেশে প্রত্যেকটা সমস্যাই রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনীতিকে কোনোভাবেই শিক্ষা থেকে আলাদা করে যাবে না। মানবজীবন কোনো খন্ড খন্ড অংশবিশেষ নয়। জাতীয় জনজীবন একে অন্যের সাথে সংযুক্ত। খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, রাজনৈতিক কারণেই সমস্ত প্রকার অন্যায়- অবিচার, ত্রুটি -বিচ্যুতি। অতএব, রাজনৈতিক মুক্তিলাভের মতো সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাত্রসমাজের উদাসীনতা কখনোই কাম্য নয়।

রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ওপর এই বিশেষ নিষেধজ্ঞার কারণ আমি বুঝতে পারি না। যদি কোনও স্বাধীন দেশে প্রত্যেক মৌলিক সমস্যাই রাজনৈতিক হয়ে থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি জাতীয় কার্যকলাপও চরিত্রগতভাবে রাজনৈতিক।

কোনো স্বাধীন দেশে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ নয়; বরং ছাত্রসমাজকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। ইচ্ছাপূর্বক এই উৎসাহ দান করা হয় কারণ, মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকেই রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ জন্ম নেয়।

ভারতবর্ষে যদি ছাত্রসমাজ রাজনীতি থেকে বিরত থাকে, তাহলে কোথা থেকে রাজনৈতিক কর্মীবৃন্দ নিযুক্ত হবে আর কোথা থেকেই বা প্রশিক্ষিত হবে?

আজকালকার যুব আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হল অস্থিরতা, ধৈর্যহীনতা এবং নতুন ও উন্নততর যুগের সূচনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। এই মুহুর্তে চারিদিকে দায়িত্বশীলতা এবং স্বনির্ভরতার উদ্দীপনা পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে।

বয়োজ্যেষ্ঠদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আর বর্তমান যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায় না। বরং তারা উপলব্ধি করে, দেশ এবং দেশের ভবিষ্যতের ওপর প্রবীণ প্রজন্মের চেয়ে তাদের অধিকার জোরালো। দেশের ভবিষ্যতের ওপর তাদের পূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্য পালনীয় এবং তা পালন করার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়াও প্রয়োজন।

বর্তমান ছাত্র আন্দোলন মানে কয়েকজন দায়িত্বহীন ছেলেমেয়ের বিক্ষিপ্ত আন্দোলন নয়। এটি একটি দায়িত্বশীল, অনমনীয় পুরুষ এবং মহিলার আন্দোলন যারা এক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের চরিত্র এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশসাধনের মাধ্যমে দেশের উন্নতিসাধনের প্রয়াসে নিজেদের  উৎসর্গ করে। ”

(১৯২৯ সালের ১৯ শে অক্টোবর লাহোরে অনুষ্ঠিত  ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ হিসেবে নেতাজির বক্তৃতার অংশবিশেষ।)

 

শেয়ার করুন

0Shares
0
তখন সাম্প্রতিক