আধুনিক কাব্যসাহিত্যের সারথি মধুসূদন

আধুনিক কাব্যসাহিত্যের সারথি মধুসূদন

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে যুগান্তরের বিশেষ প্রতিবেদন লিখলেন অনন্যা মাইতি। 

বৈপরীত্য তাঁর ছন্দের অলঙ্কার হয়ে উঠেছিল।
বৈচিত্র্য তাঁর গতিতে সদা সতত প্রবহমান ছিল।
বিত্তশালী বাবার আত্মগর্বিত, অমিতব্যয়ী, খামখেয়ালী, বদমেজাজী পুত্র থেকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম বসন্তের প্রথম কোকিল হয়ে ওঠার সুদীর্ঘ পথ ছিল বন্ধুহীন ও বন্ধুর।
বাংলা এবং বাঙালির চিরায়ত একঘেয়ে জীবন ও সাহিত্যবৈরাগ্য থেকে পাশ্চাত্যের রঙিন ও রোমান্টিকতার প্রতি দুর্বার আকর্ষনের মাশুল মধুসূদনকে চোকাতে হয়েছে আজীবনকাল।

সমসাময়িক সাহিত্যজোয়ারের প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী একজন মানুষ যাঁর নবগঠিত সাহিত্যধরার অভিনবত্বের সুবাসে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যজগৎ আমোদিত হয়ে উঠেছিল।

সমসাময়িক পটভূমিতে পৌরাণিক ও ধ্রুপদী কাহিনী, চরিত্র, দেবদেবীর পুনর্মূল্যায়ন ও মানবায়ন তাঁর সৃষ্টির উপজীব্য বিষয়বস্তু। মহাকালের সাথে বর্তমানকাল, আর মানুষ ও অসুরের পার্থিব মেলবন্ধন তাঁর সাহিত্যের আনকোরা ও অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য যার রসসিঞ্চনে সাহিত্যবুভুক্ষু বাঙালি প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়মপুষ্ট দেবতাকীর্তন যুক্তিবাদী মধুসূদনের স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। একবার বন্ধুবর রাজনারায়ণ বসুকে তিনি লিখেছিলেন, হিন্দুধর্ম তাঁর কাছে সারবত্তাহীন হলেও হিন্দু পৌরাণিক আখ্যান তাঁকে মুগ্ধ করে। পরবর্তীতে তাঁর রচনাগুলো তার প্রমাণস্বরূপ।

তিনি অচিরাচরিত। ‘রেনেসাঁ’ তাঁর রক্তে। ‘রেনেসাঁ’ তাঁর ভাবনায়। অজানার উদ্দেশ্যে নবপরিকল্পিত পথ এবং গন্তব্যের প্রদর্শক হয়ে ওঠেন বাংলা ও বাঙালির সাহিত্যচেতনার অহঙ্কার। প্রথম সনেট, প্রথম সার্থক নাটক, প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ, প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি, প্রথম প্রহসন, প্রথম পত্রকাব্য, প্রথম চোখের জল রঘুবংশীয় কোনও বীরের জন্য।
প্রথম শৈশবকালের অলৌকিক দেবত্বের উত্তরন ঘটে মনুষ্যত্বে। প্রথম ভাবতে পারি, সীতার অগ্নিপরীক্ষা ভগবান  রামচন্দ্রের প্রজাসন্তুষ্টি প্রকল্প ― ভগবানের চিত্তদৌর্বল্য !

হ্যাঁ, আরো একটা বিষয়ে তিনি প্রথম। চার সন্তানসহ স্ত্রী রেবেকার সাথে আইনি বিচ্ছেদ না নিয়ে সহকর্মীকন্যা হেনরিয়েটার সাথে একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া। তিনিই বোধহয় প্রথম বাঙালির ‘live in’-এর পথনির্দেশক।

তিনি যা চাননি, ঘটে যাচ্ছিল সেগুলোই।
তিনি মামলা মোকদ্দমায় জড়াতে চাননি।
ঋণমুক্তির আশায় পারিবারিক সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আইনি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।
তিনি অর্থসমস্যার কথা ভাবতে চাননি।
৪৯ বছর বয়সে তাঁকে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে বরণ করতে হয়েছে।
তিনি নির্বিঘ্নে ইংরেজি সাহিত্যচর্চা করতে চেয়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে চাননি।
একের পর এক প্রতারণার শিকার হয়ে আশাহত হতে হয়েছে।

কিন্তু তিনি যে, ‘The Madhusudan Datta’। ছাপোষা, নিস্তরঙ্গ, নৈমিত্তিক, সমান্তরাল জীবন তো তাঁকে মানায় না।

হিন্দু কলেজের গর্ব যেমন মধুসূদন তেমনই মধুসূদনের গর্ব  তাঁর ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, তাঁর ইংরেজি সাহিত্যপ্রীতির অনুঘটক স্যার রিচার্ডসন। ক্লাসে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, মিল্টন, বায়রন পড়তে পড়তে আকাঙ্খার বীজ ব্যপ্ত হচ্ছিল কিশোর মধুর মনে, তাঁকে হতেই হবে কবি সেজন্য যেতেই হবে ইউরোপ। ইংরেজি কবিতা না লিখতে পারলে আবার কবি কীসের..!!
ছোটবেলা থেকেই ইউরোপীয় সংস্কৃতি, জীবনশৈলী, রোম্যান্টিক কবি ও কবিতা তাঁকে প্রভাবিত করলেও তাঁর কাব্য, নাটকের চরিত্ররা কিন্তু ভীষণভাবে স্বদেশীয়।

সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থসন্তান মধুসূদন দত্ত ১৮৪৩ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ওল্ড মিশন চার্চে পাদ্রী ডিল্ট্রির কাছে ধর্মান্তরিত হয়ে ‘মাইকেল’ মধুসূদন দত্ত হয়ে গেলেন।

‘ধর্মীয়’ হয়ে ওঠার জন্য তিনি ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন―একেবারেই কিন্তু তা নয়। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর ধর্মান্তরণ হবে ইংরেজি সাহিত্যজগতে প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠালাভের জাদুকাঠি।

কিন্তু, তাঁর অবহেলিত ‘native language’-এ লিখিত মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তাঁকে বাংলাসাহিত্যে মহাকবি হিসেবে অমরত্ব দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রেনেসাঁর পীঠস্থান ইতালির কোনও কবিও পৌরাণিক আখ্যানের এমন মনোগ্রাহী রূপান্তর ঘটাতে পারেননি।

১৮৫৮ সালে রামনারায়ণ তর্করত্ন রচিত, ‘রত্নাবলী’র ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা ভাষায় সময়োপযোগী নাটকের অভাব বোধ করলেন এবং দেখলেন স্থূল সাহিত্য ও রসরচনা উপভোগে মশগুল বাঙালির নাট্য ও কাব্যভান্ডার শূন্য।
তাঁর হাত ধরেই ১৮৫৯ সালে বাংলা সাহিত্য পেল তার প্রথম সার্থক নাটক, ‘শর্মিষ্ঠা’, তারপর একে একে ‘পদ্মাবতী’, ‘কৃষ্ণকুমারী’, ‘মায়াকানন’ লিখলেন।
কাব্যিক মধুসূদন উপহার দিলেন, ‘ব্রজঙ্গনা’, ‘বীরাঙ্গনা’, বাংলা সাহিত্যের প্রথম সনেটসম্ভার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’। কত অনায়াসে, কত সাবলীলভাবে যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরকে তিনি বলতে পারেন, “I began the poem in a joke”  আর তারই ফসল ‘ তিলোত্তমাসম্ভব’ কাব্য।
হাস্যরস মানে তা অশালীন, আদিরসাত্মক হতেই হবে, এই ধারণা ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল বাংলাসাহিত্যে তাঁর দুটি প্রহসন ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ আর ‘একেই কি বলে সভ্যতা’। প্রথমটির বিষয়বস্তু হল, তথাকথিত উচ্চ সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন  বাবুদের নীতি ও চরিত্রস্খলন এবং দ্বিতীয়টি, আধুনিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের উশৃঙ্খল জীবনযাপন। নাটকদুটি তৎকালীন  সমাজজীবনকে গভীরভাবে আঘাত হেনেছিল।

ইউরোপীয় রচনাশৈলী আর ভারতীয় বিষয়বস্তুর ‘fusion’ ই হলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
মননে ইংরেজি আর কলমে বাংলা এই সমাপতনের নামই মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
তাই, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পড়তে পড়তে অজান্তেই জন মিল্টনের ‘Paradise Lost’ মনে পড়ে যায়।

তিনি তখন মাদ্রাজের ‘ব্ল্যাকটাউন’এ ভারতীয়দের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় থেকে প্রতিনিয়ত কর্মস্থল, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, জীবনসঙ্গী নির্বাচনে হয়ে উঠতে চাইছেন ইউরোপীয় ইংরেজ আর বুঝতে পারছেন বর্ণবৈষম্য, শ্রেণীবৈষম্য কাকে বলে।ভাবলেন, ইংরেজি সাহিত্য আরাধনা করতে গেলে ঐটুকু সহ্য করাই যায়।
কিন্তু, কলকাতা থেকে আনাচ্ছেন, রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত।
তখনই কি তিনি বুঝেছিলেন, “নির্গুণ স্বজন শ্রেয় পর পর সদা..”?

১৮৬৫ সাল। কবি তখন ফ্রান্সের ভার্সেইতে। সে বছর সারা ইউরোপ জুড়ে ইটালীয় কিংবদন্তি কবি দান্তের ৬০০তম জন্মবার্ষিকী উৎযাপিত হচ্ছে। ইটালীয় রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল দি সেকেন্ডের কাছে পৌঁছোল তাঁর লেখা একটি বাংলা কবিতা, যা তিনি নিজেই ইটালীয় ও ফ্রেঞ্চে অনুবাদ করে  দান্তের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন,–  ‘A Bengali Sonnet’।
রাজার তরফ থেকে স্বীকৃতিও এসেছিল, ” it will be a ring which will connect the orient with the occident .”

‘Bohemian poet’ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরলেন।
তিনি তখন ‘মাইকেল মধুসূদন’ থেকে ‘শ্রী মধুসূদন’ হয়ে উঠেছেন। স্বদেশপ্রেম ছড়িয়ে পড়লো তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে। রামকর্তৃক অবরুদ্ধ স্বর্ণালঙ্কা যেন তাঁর লেখায় ইংরেজশাসিত ভারতবর্ষ। দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের জন্য যেমন নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রয়োজন ছিল তেমনি স্বদেশ, স্বজাতি, স্বধর্মবিদ্বেষী বিশ্বাসঘাতকদেরও কবির কিছু বলার ছিল। মেঘনাদ ও বিভীষণের মাধ্যমে কবির সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। স্বদেশী মীরজাফরদের প্রতি কবির অনিঃশেষ অভিযোগ, “it cost me many a tears to kill him.”

১৯৪৮ সালের জানুয়ারী মাস।
খিদিরপুর থেকে মাদ্রাজগামী জাহাজের ডেকে, কবি আকুলকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, “My native land, good night.” যেন তাঁর উদ্দেশ্যেই তাঁর স্বপ্নের কবি ও গুরু লর্ড বায়রনের লেখা পংক্তিটির উপযুক্ত প্রেক্ষাপট।
কবির মিনতি তাঁর ‘বঙ্গভূমির প্রতি’,
“রেখো মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে।
সাধিতে মনের সাধ,
ঘটে যদি পরমাদ,
মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে।”
এবারে তিনি যা চেয়েছিলেন, তাই মিলেছে।
সব পেয়ে হারানোয় স্বভাবসিদ্ধ মধুকবিকে তাঁর ভাষা ও দেশ যোগ্য সম্মান দিয়ে একমাত্র বঙ্গভূমি তাঁর সকরুণ মিনতি শুনেছেন।
বরং মধুহীন বঙ্গভূমিকে মধূপূর্ণ করেছে তাঁর অসাধারণ সাহিত্যকর্ম। তাঁর স্বাতন্ত্র্য, তাঁর স্বকীয়তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘প্রি-মধুসূদন’ ও ‘পোস্ট-মধুসূদন’ সুস্পষ্ট একটা সীমারেখা তৈরি করে দিয়েছে।

 

শেয়ার করুন

0Shares
0
তখন সাম্প্রতিক