লিখছেন রূপম ইসলাম – ২

লিখছেন রূপম ইসলাম – ২

প্রচুর ভুল আমার। অল্প ঠিক।

আমি সবাইকে প্রণাম জানাচ্ছি যাঁরা এমন একটা খারাপ সময়েও এই তুচ্ছ আমার কথা মনে রেখেছেন। আমার কিছু নগণ্য কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন। না, আমি কিছু করতে পেরেছি বলে আমার মনে হয় না। দিনরাত অভ্যেস করে চলেছি যদি ভবিষ্যতে কিছু পারি। যদি পারি কতজন শুনবেন? কতজন বুঝবেন আমি উন্নতি করছি? হাতে গোনা যাবে হয়তো সংখ্যাটা। তবুও নিজের তাগিদেই আমায় অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে। ফলাফলের ভূমিকা সেখানে গৌণ।

এখনও যা পারি না তার তালিকা আমি তৈরি রেখেছি। যা যা ভুল করেছি— দেখলে আজ বুঝি বয়সজনিত ভুল সে সব। অনেক কম বয়সে আমার কাজ জনসমক্ষে এসেছিল। ফলে প্রাকৃতিক-ঠিক যেমন কম ছিল না, ভুলও ছিল অনেক। দুঃখের বিষয় অনেকেই সেই ভুলগুলোকে ঠিক বলে ধরে নিয়েছেন। আর এখনকার ঠিকগুলোকে ভুল ভাবছেন। ভবিষ্যতের আরও ঠিকগুলোকে তাঁরা আরও ভুল ভাববেন। এতে তাঁদের দোষ নেই। দোষ আমার।

তবে স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন রাস্তা তৈরি করতে গেলে কিছু ভুল কিছু ঠিক হওয়া স্বাভাবিক। নতুন রাস্তার কিছু ঝুঁকি থাকেই। পরে যাঁরা হাঁটেন তাঁরা দেখে নেবার সুযোগ পান। অন্য অনেকে সেই সুযোগ নিয়েছেন। আমিও নিচ্ছি। নেব। নিজেকে অনুসরণ করলেও অনেকটা শিখতে পারি আমি। অন্য শিক্ষকদের ঠিক কথাগুলি থেকেও শিক্ষা নিই। ভুলগুলো বাদ দিই। নিজের ক্ষেত্রেও তাই করি।

এমন একটাও লোক আমি দেখিনি যে সম্পূর্ণ ঠিক। ভুল সবার হয়েছে। আমিও অন্য সকলের মতোই। কিন্তু ভুলগুলোকে চিহ্নিত করতে পারাটা জরুরি। আত্মগর্বে অনেকেই সেটা করতে পারেননি। ফলে আরও ভুল করেছেন। কাজের মান পড়ে গেছে। এটা আমি জনরুচির বিচারে বলছি না। আমার শিক্ষিত বিচারে বলছি। আমার আত্মগর্ব ছিল না। নিরপেক্ষ সত্যদর্শন ছিল। ফলে নিরপেক্ষ শিল্পবিচারে আমি এগিয়েছি। বেঁচে থাকলে আরও এগোব। না, নিজের ক্ষেত্রেও আমি জনরুচির কথা বলছি না। সেন্সিবল শ্রোতা বাড়ছেন আমার। অন্য একটা গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। যাঁদের কাছে অনেক পুরনো কাজও নতুন করে পৌঁছচ্ছে। একই পাত্রে নতুন কাজও পৌঁছচ্ছে। তাঁরা তফাৎ করতে পারছেন না, ফলে পুরনো প্রকাশের প্রতি অহেতুক স্নেহান্ধতা থেকে তাঁরা মুক্ত। পরিবেশনের মুনশিয়ানা দিয়ে আমি পুরনো ভুল সংশোধন করে নিচ্ছি। নতুন যে জিনিসটা দিতে পারছি তা প্রাচীন কুসংস্কারমুক্ত।


আমি যা করেছি, ভুল হোক বা ঠিক— তা তৈরি করেছিল আমার অভিশপ্ত পরিবেশ। ফলে আমার জামার কালো রঙে একটা স্বাভাবিকতা ছিল। আমার অস্বাভাবিকতা স্বাভাবিক ছিল। কয়েকজন বিজ্ঞ মাতব্বর বোঝেননি, কিন্তু তলানিতে থাকা সর্বহারা জনগণ বুঝেছেন। তাঁদের একজন হিসেবে তাঁদের সঙ্গে আমি কানেক্ট করেছি। অন্য প্রচুর শিল্পী সে পথে হাঁটতে চেয়েছেন— এবং তাঁদের দেখামাত্র শোনামাত্র জনতার অধিকাংশের স্মৃতিতে আমি ফিরে ফিরে এসেছি। এর ফলে আমার সৃষ্ট ধারাগুলিতে অন্য যত কাজ হয়েছে, ততই আমার পুরনো শ্রোতৃবর্গ আমায় আঁকড়ে ধরেছেন।

সংস্কারমোচন অনেক সময় এতটা তেজ এতটা গতি এতটা ঝাঁকুনি তৈরি করে যে তা অজান্তেই নতুন স্টিরিয়োটাইপের জন্ম দেয়। এই ফাঁদে পড়ে যেতে হয় অভিজ্ঞতার অভাবে। চল্লিশের পর থেকে আমি সচেতন হতে পেরেছি। লেখা, সুর, গাওয়া, যন্ত্রানুষঙ্গ, বানান, উচ্চারণ— সবেতেই অহেতুক অপ্রয়োজনীয় বৈপ্লবিক স্টিরিয়োটাইপ থেকে আমি নিজেকে সরিয়ে এনেছি। অনেক স্বাভাবিক হয়েছি। এই মোড়-বদল জরুরি ছিল। অনেক গভীরতায় এর ফলে যেতে পারছি, যা আমার মধ্যেই আসলে নিহিত ছিল। নিজেই তখন ধরতে পারিনি।

মজার ব্যাপার হল— পুরনো শ্রোতা গোষ্ঠী এখনও পুরনো-আমায় ত্যাগ করেননি। বরং পুরনো-আমার উপর তাঁদের অধিকারবোধ আরও বেড়েছে। এমন অনেক কিছুই আছে, যা শুধুমাত্র আমাকেই মানিয়েছে। অন্য কেউ কেউ যখন সে সব করতে গেছেন তা নকলনবিশী মনে হয়েছে। অন্য সে সব শিল্পীদের ভুল হয়নি কোথাও। কিন্তু ঐ যে— মানানোর প্রশ্নটা। মানায়নি কোথাও গিয়ে। তার একটা বড় কারণ— প্রেক্ষিত। আমি যা করেছি, ভুল হোক বা ঠিক— তা তৈরি করেছিল আমার অভিশপ্ত পরিবেশ। ফলে আমার জামার কালো রঙে একটা স্বাভাবিকতা ছিল। আমার অস্বাভাবিকতা স্বাভাবিক ছিল। কয়েকজন বিজ্ঞ মাতব্বর বোঝেননি, কিন্তু তলানিতে থাকা সর্বহারা জনগণ বুঝেছেন। তাঁদের একজন হিসেবে তাঁদের সঙ্গে আমি কানেক্ট করেছি। অন্য প্রচুর শিল্পী সে পথে হাঁটতে চেয়েছেন— এবং তাঁদের দেখামাত্র শোনামাত্র জনতার অধিকাংশের স্মৃতিতে আমি ফিরে ফিরে এসেছি। এর ফলে আমার সৃষ্ট ধারাগুলিতে অন্য যত কাজ হয়েছে, ততই আমার পুরনো শ্রোতৃবর্গ আমায় আঁকড়ে ধরেছেন। আমি বারবার পালাতে চেয়েছি। তাঁরা আমায় পালাতে দেননি। ফলে আমাকে নিজের তাড়নায় ‘নতুন-আমি’তে যেমন থাকতে হয়েছে, মানুষের ভালবাসার টানে পুরনো ‘আমি’রও গুরুত্ব বুঝেছি। আমার সমস্ত ধরনের শ্রোতাদের আমি সম্মান করি। এমনকী আমার প্লেব্যাক গানের শ্রোতাদেরও।

ফেসবুক গত বছরটায় শিল্পপ্রকাশে সহায়ক হয়েছে। অন্য মঞ্চমাধ্যম গড়তে উপযোগী হয়েছে। কিন্তু যা করছি তার ফ্রেম টু ফ্রেম রেকর্ড হচ্ছে, অসদুদ্দেশ্যে অনেকে ব্যবহার করতে পারেন এ কথা জেনে সেই মাধ্যমটাকে লাগাম পরিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছে। একক সেখানে হয়েছে সেন্সরড একক। তা হবার কিন্তু কথা ছিল না। একক পরিবার মন খুলে কথা বলবার জায়গা ছিল। তা হল না। ফলে অনলাইন একক-পরবর্তী পুনর্বিবেচনায় নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়েছে। আত্মদংশন হয়েছে। আমি যেন সাবধানী-আমি। সাবধানী-আমি তো আমি নই। কেন এমন হবে?

কিন্তু সত্যি বলছি— ফেসবুক-প্রতিবাদে আমার বিশ্বাস নেই। কেন নেই? তার কারণ এখানে প্রতিবাদীর বড় ভিড়। সবাই প্রতিবাদী। অনেকে ঠিক, অনেকে ঠিক না। প্রচুর মন্তব্য। বেশির ভাগ মন্তব্য আজেবাজে। অশিক্ষিত। অপরিণামদর্শী। খেলো। যা ইচ্ছে তাই। এমন একটা পরিসর আমার প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের যোগ্য নয়। শুধু বিজ্ঞাপনের যোগ্য। খবর পৌঁছনোর পোস্টার মাত্র। অযোগ্য পাত্রে কখনও কিছু দান করতে নেই।

আমার প্রতিবাদের মঞ্চ একটিই। আমার দু’টি মঞ্চ মূলত। কিন্তু একটিতে কথা বলবার সুযোগ নেই। তাই সেটি বিমূর্ত মাধ্যম। বিমূর্ত মাধ্যম শিল্পিত, শিল্প ব্যঞ্জনায় সুপিরিয়র। কিন্তু আমিই তো লিখেছি—
ওহে পিয়ানো বাজবে কবে
বিমূর্ত থেকে মূর্ত হবে
ওহে লেখনী লিখছ কই
উগ্রবাদের গুপ্ত বই।


আমি কোনও নেতা নই, কারও নেতা নই। কিন্তু তাও, মানুষের উদারতা এবং মাহাত্ম্যগুণে আজ অনেক ছেলেমেয়ে আমার জন্মদিন পালন করছে রক্ত দিয়ে, রক্তদান শিবির করে। একাধিক শিবিরের খবর আমি পেয়েছি। এদেরই আমি র‍্যাডিকাল বলব। এরা গানবাজনার বিমূর্ততা ছাপিয়ে বাস্তবতায় মূর্ত হয়েছে।

তাই অন্য মাধ্যমটি বড্ড বাস্তব। বড় জীবন্ত। আমি বলি, আমি মনে করি— এক ধরনের উজ্জীবিত মানুষের সমাগম এই ‘রূপম ইসলাম একক’ মাধ্যমটিকে তাঁদের মুখপাত্র বানিয়ে নিয়েছে। তাঁদের মনমর্জি মতো কথা আমায় দিয়ে বলিয়ে নিতে না, অনেক সময় আমার নতুন ব্যতিক্রমী ভাবনায় সিঞ্চিত হতে। এটা তাঁদের দরকার, আমারও। এই যেমন নেতাজীর জন্মদিবসে আমি অধ্যাপক সুগত বসুর একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। অনবদ্য কিছু কথা। একজনের কথা বললেন, যিনি জীবনের তিন পর্বে তিন নেতার সঙ্গে কাজ করেছেন। নেতাজী, গান্ধিজী এবং পণ্ডিত নেহেরু। তিনি সুগতবাবুকে বলেছেন— আপনি নেতাজীর পৌত্র বলে বলছি না— ওঁরা সবাই ভাল, কিন্তু নেতাজী হলেন একমাত্র নেতা, যাঁর জন্য আমি প্রাণ দিতে পারতাম। — এটা দেখে আমার মনে হচ্ছে ঐ জন্মটা সার্থক। ওটা মহাজীবন। আমি নিছক ক্ষুদ্রতায় বন্দি। আমি কোনও নেতা নই, কারও নেতা নই। কিন্তু তাও, মানুষের উদারতা এবং মাহাত্ম্যগুণে আজ অনেক ছেলেমেয়ে আমার জন্মদিন পালন করছে রক্ত দিয়ে, রক্তদান শিবির করে। একাধিক শিবিরের খবর আমি পেয়েছি। এদেরই আমি র‍্যাডিকাল বলব। এরা গানবাজনার বিমূর্ততা ছাপিয়ে বাস্তবতায় মূর্ত হয়েছে। আমার প্রতিবাদ আমি রাখতে পারছি না কোত্থাও। আমি কিছু বিষয়ে রাগে গরগর করছি, কিন্তু না। ফেসবুকে হবে না। আমি মঞ্চ চাই। কোভিড নির্বাসন আমার মঞ্চ ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি তাই নিতান্তই অক্ষম হয়ে পড়েছি। আমার একটা পরিবার চাই— যাঁরা আমার কথা শুনবার মানসিকতা রাখেন। আমার কথা শুনতে চান না যাঁরা, তাঁদের আমি বলতেও চাই না।

শ্রোতাদের এই ভাগ-বিভাগ রচনা তো ফেসবুক করতে পারে না। হয় সে খুলে দেয়। নয় রেকর্ড করে। রেকর্ডিং পৌঁছে যায় ষড়যন্ত্রীদের হাতে। আমি ষড়যন্ত্রীদের সুবিধে করে দিতে চাই না।

ফলে আপাতত আমার গোপন থাকা। লুকিয়ে থাকা। এই রাগী মুখটা আমার সবার জন্য নয়। যাঁদের জন্য— তাঁরা নিশ্চয়ই কোনও না কোনওদিন আমায় খুঁজে নেবেন।

সে দিন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। হয়ে যাবে বললেই তো হবে না। তার জন্য আমায় তৈরি হতে হবে। ফলাফল কেমন চেহারা নেবে, বা ঠিক কতজনের অভিপ্রেত হবে তা আমার বিচার্য নয়। আমি শুধু অনুশীলনের, অনুশীলন আমার। আমি নিজেকে নিয়ে প্রীত নই। কিছুতেই নই। কিন্তু হাল ছেড়ে দিতেও চাই না। অল্প কিছু মানুষ হলেও, আমাকে ভালবেসে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে আছেন যে।

এটুকুই। আর কী।

 

প্রচ্ছদ : অন্তরূপ চক্রবর্তী

আলোকচিত্র : প্রশান্ত কুমার শূর 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive লিখছেন রূপম ইসলাম