বাংলা কমিক্সের জাদুকর নারায়ণ দেবনাথ পেলেন পদ্মশ্রী

বাংলা কমিক্সের জাদুকর নারায়ণ দেবনাথ পেলেন পদ্মশ্রী

অনন্যা মাইতি: আমাদের ছোটবেলা যাঁর সোনার কাঠির জাদুস্পর্শে সম্পূর্ণতা পেয়েছিল, যাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির দুষ্টুমিভরা কাণ্ডকারখানা দেখে নির্ভেজাল হাসিতে লুটোপুটি খেতে খেতে সারল্যমাখা শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলি বর্ণময় ও মজাদার হয়ে উঠেছিল, সেই কমিক্স-জাদুকর, জীবন্ত কিংবদন্তি নারায়ণ দেবনাথ  ৯৬ বছর বয়সে পেলেন তাঁর জীবনের অন্যতম স্বীকৃতি―’পদ্মশ্রী’, ভারতবর্ষের চতুর্থ অসামরিক সম্মাননা।

বাঙালির ঘরে ঘরে টেলিভিশন তখন একটা অলীক শব্দ। ইন্টারনেট কল্পবিজ্ঞানের আওতায় ছিল। তখন থেকে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর সৃষ্ট দুষ্টুমিমাখা চরিত্র ও তাদের নানানরকম মজাদার গল্প আমাদের অনাবিল আনন্দ দিয়ে চলেছে। সেই গল্প, চরিত্রগুলোর মধ্যে আমরা সব বয়সীরাই খুঁজে পাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলা। কখন যেন স্কুলের ব্যাগের মধ্যে নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল আমাদের অজান্তেই জায়গা করে নিয়েছেল।

ছবি দিয়েও গল্প বলা যায় ― বুঝিয়েছিলেন আমাদের সকলের প্রিয় প্রথম সার্থক বাঙালি কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথ। তিনি বুঝেছিলেন, শিশুমন শুনে নয়, দেখে শেখে। দমফাটা হাসির মধ্যে দিয়ে তিনি শিশুদের জীবনের অনেক গভীর নীতিশিক্ষা দিয়েছেন। কে ভাল, আর কে খারাপ, কে লোভী, কে অসৎ, কে অতিধূর্ত, কে অকৃতজ্ঞ, কে নালিশবাজ, কে পক্ষপাতদুষ্ট ―কমিক্সের মাধ্যমে হাসিঠাট্টার ছলে এ সব শিখে নেওয়ার উপায় তিনি শিশুদের শিখিয়েছেন।

১৯২৫ সালে হাওড়ার শিবপুরে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। স্বর্ণকার পরিবারের ছেলে তিনি। গয়নায় নকশা করার মধ্যে দিয়েই তাঁর শিল্পী প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তারপর আর্ট কলেজে ভর্তি হন কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে কলেজ আর শেষ করা হয় না। সেই সময় চিত্রশিল্পীদের সেরকম কাজের সুযোগ ছিল না। তাই আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে কয়েক বছর গয়না, শাড়ি, প্রসাধন দ্রব্য নির্মাতাদের জন্য বিজ্ঞাপনের ছোটোখাটো আঁকার কাজ করে দিন গুজরান করেছেন তিনি। হরফ শিল্পী হিসেবেও গরানহাটা ও ধর্মতলার দুটি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন কাজ করেছেন। তারপর কিছুদিন চলচ্চিত্রের টাইটেল কার্ড বানানোর কাজও করেছেন। জীবনতৃষ্ণা, স্বরলিপি, কমললতা প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ।

কর্মজীবন বিজ্ঞাপনের কাজ দিয়ে শুরু করলেও শিল্পীমন শূন্যতায় ভরে উঠত। ছবি না আঁকতে পেরে তিনি তখন মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন। তিনি যে জাতশিল্পী, তাই নেশাকেই পেশা করার সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন।

হঠাৎই দেব সাহিত্য কুটিরের সাথে যোগাযোগ। শুকতারা, অ্যাডভেঞ্চার বই, অনুবাদ বইয়ের ফ্রন্ট কভারের প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ দিয়ে কাজের শুরু। সম্পূর্ণ নতুন এক ধরণের চিত্রশিল্পের সাথে বাঙালির পরিচয় করালেন তিনি।

সিনেমা হলে সিনেমা শুরুর আগে টম অ্যান্ড জেরি দেখে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে কার্টুন চরিত্রের প্রতি তাঁর বিশেষ ভাল লাগা তৈরি হয়।

ঘটনাচক্রে বিদেশি ঘরানার অনুকরণে ছবি দিয়ে গল্প তৈরির প্রস্তাব পেলেন বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা দেব সাহিত্য কুটির থেকে যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

পঞ্চাশের দশকে ‘হাঁদা ভোঁদা’ নামে একটি কমিক্স শুকতারায় মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হতো যেখানে ‘ছবি ও কথা’র জায়গায় থাকত একটি বোলতার ছবি। ওই ‘বোলতা’ আসলে তৎকালীন খ্যাতনামা শিল্পী প্রতুলচন্দ্র  বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৬২ সালে নারায়ণ দেবনাথ ‘হাঁদা ভোঁদা’কে নতুন রূপে নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা সম্বল করে শুরু হল হাঁদারাম গড়গড়ি আর ভোঁদারাম পাকড়াশী নামের দুই বিচ্ছু ছেলের একসাথে পথচলা। হাঁদা রোগা আর ভোঁদা মোটা। সবসময় দুজন দুজনকে জব্দ করার ফন্দি আঁটে কিন্তু শেষে প্রায়ই হাঁদা জব্দ হয়। তাদের খুনসুটি, দুষ্টুমিতে প্রাঞ্জল হয়ে উঠল কমিক্সের পাতা। শুরু হল, ‘হাঁদা ভোঁদার কাণ্ডকারখানা’।

‘হাঁদা ভোঁদা’ ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ায় আরও একটা কার্টুন চরিত্র তৈরির প্রস্তাব আসে তাঁর কাছে। ১৯৬৫ সালে এল গোলাপী স্যান্ডো গেঞ্জি, কালো হাফ প্যান্ট, খালি পায়ে, সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত  ‘বাঁটুল―দি গ্রেট’। দুই ভাগ্নে ভজা―গজা, পটলা, লম্বকর্ণ, পোষা কুকুর ভেদো আর পোষা উটপাখি উটো তার সঙ্গী। বাঁটুল সৎ ও দেশপ্রেমিক। সে ভারতের জন্য অলিম্পিক মেডেলও এনেছে। ষাটের দশকে ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধের পটভূমিতে মহাশক্তিধর বাঁটুলের কর্মযজ্ঞ তাকে বাঙালির কাছে হিরো বানিয়ে দেয়। কখনও সে শত্রুপক্ষের জাহাজ ধ্বংস করে দিচ্ছে, তো কখনও যুদ্ধবিমানের সাথে লড়াই করছে আবার ট্যাঙ্কারও উড়িয়ে দিচ্ছে। বাঁটুল হয়ে গেল বাঙালির ঘরের সুপারহিরো।

কয়েকবছর পর কিশোর ভারতীতে তাঁর ডাক পড়ল কার্টুন বানানোর জন্য।
১৯৬৯ সালে কিশোর ভারতীতেই এলো ‘নন্টে ফন্টে’। দুই সহপাঠী ও বন্ধু, একসাথে বোর্ডিং স্কুলে থেকে লেখাপড়া করে। এই বোর্ডিং ও স্কুল জীবনের বিভিন্ন মজার ঘটনা দিয়েই গল্প সাজানো। কেল্টু নামের হিংসুটে ধরনের একটু বেশি বয়সের এক ছাত্রও তাদের সাথে থাকে, বোর্ডিংয়ের বাকি ছাত্ররা তাকে ‘কেল্টুদা’ বলে।  নন্টে, ফন্টে আর কেল্টুর রেষারেষি, পেটুক সুপারিনটেনডেন্ট স্যার হাতিরাম পাতির কেল্টুর প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং শেষে কেল্টুর উচিত শাস্তি গল্পের বিষয়বস্তু।

শুধু ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘বাঁটুল’ আর ‘নন্টে ফন্টে’ই নয়, ‘পটলচাঁদ―দ্য ম্যাজিশিয়ান’, ‘শুঁটকি মুটকি’, ‘কৌশিক রায়’, ব্ল্যাক ডায়মন্ড ইন্দ্রজিৎ রায়, বাহাদুর বেড়াল, ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু, পেটুক মাস্টার বটুকলালের মতো অসাধারন মজার সব চরিত্র জনপ্রিয় হয় এবং আবালবৃদ্ধনিতার অত্যন্ত কাছের হয়ে ওঠে। আজও এইসব চরিত্রগুলি আমাদের নস্ট্যালজিক করে তোলে।

১৯৬২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত একটানা ৫৫ বছর তিনি নিয়মিত ‘হাঁদা ভোঁদা’ সৃষ্টি করে গেছেন। একজন একক লেখক এবং শিল্পীর বিশ্বের সবচেয়ে বেশিদিন ধরে চলা কমিক্স হল ‘হাঁদা ভোঁদা’।

বাংলা কমিক্সের জগতে মৌলিকত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন রাখলেও তাঁর পরিচয় শুধু একজন কার্টুনিস্ট নয় তিনি একা হাতে কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপের দায়িত্বও সামলেছেন। প্রবাদপ্রতিম কার্টুনিস্ট হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ কিশোর সাহিত্যিকও বটে। তাই, সাহিত্যিক হিসেবেও  তাঁর অবদান কিছু কম নয়।

এত অবদানের স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন। সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার, বিদ্যাসাগর পুরস্কার আর পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে বড় সম্মান বঙ্গবিভূষণ মিলেছে। তিনিই একমাত্র ভারতীয় কার্টুনিস্ট যিনি ডি.লিট অর্জন করেছেন। দেরিতে হলেও বাংলা কমিক্স জগতের একচ্ছত্র  কিংবদন্তি  তাঁর প্রাপ্য সম্মান পেয়েছেন যা সাহিত্য ও শিল্পপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত গর্ব ও খুশির খবর।

শেয়ার করুন

0Shares
0
এখন সংস্কৃতি সাম্প্রতিক