শিশুর শহরতলি– ২

শিশুর শহরতলি– ২

কবিতা

।।এক।।

কবিতা লেখার জন্যে এরম নিঝুম একটা রাতই একদম বেস্ট স্যার।
― কবিতার কি কোনো সময় অসময় আছে নাকি?
― আলবাৎ স্যার! সবকিছুর একটা সময় অসময় আছে বৈকি! ভরাপেটে বিরিয়ানি ভাল লাগে? বলুন?
― কবিতা লেখার আবার ভরাপেট খালিপেট কি হে? কবিতা কি মোচার ঘন্ট নাকি কচি পাঁঠা?
― হেঁ হেঁ হেঁ! ছাড়ুন না স্যার। তর্কে বহুদূর গিয়ে কি কোনও লাভ আছে?
― সারাজীবন বাংলার শিক্ষক ছিলাম ভায়া, কবিতা অল্প হলেও বুঝি, তাই বল্লাম। তা আবার রাগ-টাগ করলে নাকি?
― রাগের কি আছে? হকারি করে করে শেষজীবনটা কেটে গেল, কবিতা লেখা ডায়েরির পাতায় ঠোঙা বানাতাম। কেউ কেউ সেই ঠোঙায় লেখা আমার কবিতা পড়ত, বেশিরভাগই যদিও পড়ত না। তাও মন্দ কি? প্রকাশকের আশায় তো বহুদিনই গুড়ে বালি। অনেক ভেবে দেখেছি স্যার, রাগ জিনিসটা ঠিক আমার ধাতে সয় না।
― তবে এসো। মুড়ি খাওয়া যাক। ঝাল ঝাল করে, আচার মাখিয়ে। নারকেলটা কিন্তু ঝালমুড়িতে মাস্ট। ঝালমুড়িতে মুড়ি মিস হতে পারে, নারকেল নৈব নৈব চ।
― সাথে টক ঝাল মিষ্টি চানাচুর। একটাই জিনিস, যা আমি কবিতার থেকেও ভালো বানাতে পারি, সেটা একমাত্র ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি, এবং ঝালমুড়ি।
― আহ! তুমি তো পুরো নাল-ঝোল ঝরিয়ে দিচ্ছ হে পরিমল। যাও, যাও, তুরন্ত লেকে আও।
― এক্ষুনি স্যার, এক্ষুনি।

।।দুই।।

অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখেও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না করালী মুর্মূ। গাছতলাটায় মৌজ করে বসে হাঁড়িয়ার হাঁড়িটা খুলে যেই গলায় ঢালতে যাবে অমনি দেখে, আকাশ থেকে টুপটাপ করে চাকনা পড়ছে! তাও কিনা চানাচুর! অনেক ভেবেও কুল কিনারা না পেয়ে শেষমেশ অজ্ঞান হয়ে গেল সে।

।।তিন।।

এই মানুষগুলো আর শুধরোবে না। সেই কবে ট্রেনে কাটা পড়েছেন, তারপর থেকে ভূতের নজরে তো কম মানুষ দেখলেন না সান্যালবাবু। দেখে দেখে পুরো ঘেন্না ধরে গ্যাছে। ছ্যাঃ ছ্যাঃ! মনের জোর যে সব কোথায় গ্যাছে, কে জানে? জং ধরা হাত পা, থলথলে ভুঁড়ি, হার্ট থেকে লিভার সব জায়গায় গাদা-গুচ্ছের কোলেস্টেরল। সাহস থাকবে কোথায়? জানটাই আঁকুপাঁকু করছে বেরিয়ে যাবে বলে, সাহস থাকার জায়গা কই? আগে ভূতের সাথে মানুষ একঘরে বাস করত। নিজেই কতবার দেখেছেন, বাবা ডাকছেন,
“এই হতচ্ছাড়া, চা-টা দিয়ে গেলিনে?”
ব্যাস! অমনি সঙ্গে সঙ্গে ‘যাই হুজুর’ বলে মৃত নিধিরামের প্রেত চা নিয়ে হাজির, এক্কেবারে আতাক্যালানে হাসিটা সমেত।
আর এখন? কটা চানাচুর গায়ে এসে পড়ল আর ভয়ে মুচ্ছো গেলি গা?
এবার কী হবে বল দেখি? কোত্থেকে সব লোকজন জটলা পাকাচ্ছে, গাছটাই নাকি বেমালুম কেটে দেবে, সাথে আবার শান্তি স্বস্ত্যয়ন যজ্ঞ ফ্রি!
“যাই দেখি গে, পরিমল বাঁড়ুজ্জেটা আবার কি করছে”, স্বগতোক্তি করে মাঝের ডালপালাগুলো থেকে মগডালের দিকে বায়ুভূত শরীরটা ভাসিয়ে দিলেন সান্যালবাবু।

।।চার।।

বামুনঠাকুরের পৈতে কয়েক জায়গায় জট পাকানো হলে কী হবে, ঠাঁটবাঁট ষোল আনা। বলে দিয়েছেন করালী আর মোড়লমশায় ছাড়া আর কেউ থাকবে না। ইনি আবার সংস্কৃতে মন্ত্র পড়েন না, পাঁচালীর সুরে ভূত তাড়ান। দশকর্মা ভান্ডার থেকে ঠাকুরমশায়ের ফিরিস্তি অনুযায়ী জিনিস মেলাটাই দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল। তার উপরে আবার দক্ষিণাটাও…
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মোড়ল দেখল, বামুন ঠাকুর গাছের নিচে বেশ থাবড়ে বসেছেন। রিমলেস একখান চশমা পরে একখানি পুরানো ডায়েরি মত কী যেন দেখছেন মন দিয়ে। হবে তো এনার দ্বারা? বয়স তো একেবারেই অল্প, যদিও নামডাক হয়েছে বেশ।
‘মন্তর-তন্তরগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছে বোধহয়, কী বলো করালী?’, মোড়ল প্রশ্ন করে, নাকি নিজেকেই আশ্বাস দেয় বোঝা যায় না। করালী উত্তর দিতে পারে না মোড়লমশায়কে।
সে ততক্ষণে একখানি অদ্ভুত জিনিস দেখে ফেলেছে।

।।পাঁচ।।

― আমি কীসে মরেছিলাম জানেন স্যার?
― জানি। কোলন ক্যানসার। কেন?
― একটু ভুল জানেন স্যার।
― এখন তোমার মরার কথা মনে পড়ছে হে?
― আজ্ঞে, কিছু কথা বলার জন্যে আরও কিছু কথা টানতে হয়। তা যা বলছিলাম, কোলন ক্যানসার ধরা পড়ার পর অপারেশন হল, বুঝলেন স্যার। কিন্তু সেই অপারেশন ফেলল আমায় আরও বিড়ম্বনায়, আগের চাকরিটি গেল।
― কী চাকরি করতে তুমি?
― আজ্ঞে, বামুনের ছেলে, পুজো-আচ্চা করতাম আর কী। পায়খানার থলি নিয়ে ধুতি পরে পুজো করা কি যায় স্যার? বাঁধা যজমান বাড়িগুলি গেল। গাঁয়ের মন্দিরটার পুজোও ছাড়তে হল।
― তারপর?
― তারপর বাড়ি থেকে ছেলের বৌ তাড়িয়ে দিল। অভাবের সংসার, তারও বিশেষ দোষ দেখি না। এমনিতেই বেশ খরচাপাতি হচ্ছিল আমার পেছনে। আমি যখন ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, তখন আমার নাতিটা বেশ ছোট, জানেন…
― ট্রেনে হকারিটা এরপর থেকেই শুরু করলে?
― আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। আর কোনও দিন গ্রামে ফিরিনি। কোনও মতে লুকিয়ে চুরিয়ে হকারি করে পেট চালাতাম। পায়খানার থলিওয়ালা হকারের কাছে ঝালমুড়ি কে খেতে চাইবে বলুন? একদিন ধরা পড়ে বেধড়াক্কা মার খেলুম। ব্যাস, গতাসু।
― খুবই দুঃখের ব্যাপার। কিন্তু এখন এই ভয়ংকর সময়ে এইসব ভেবে কি হবে ভায়া? তল্পিতল্পা গোছাও, কেটে পড়ি। ধুনোর গন্ধে বড্ড দম আটকে আসে আমার আবার।
― আমার লেখা কবিতা কেউ ছাপেনি স্যার। কিন্তু সেগুলি আজও রয়ে গ্যাছে দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে স্যার।
― ভূতাবস্থায় মাথায় ছিট হয়, জানা ছিলনা হে।
― যে পুরোহিত বসে আছে নিচে, সে যে আমার কবিতায় পাঁচালি করে পড়ছে স্যার। কেউ ধরতে পারছে না। ওহো, আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে। যাই স্যার, আমি নীচে গিয়ে এক দু’ পাতা আরেকবার পড়ে আসি। হাজার হোক, নিজের কবিতা…

এই বলেই বাঁই করে পরিমল বাঁড়ুজ্যে ভেসে এলো নীচে। এসেই একটু থম মেরে গেল। এ কাকে দেখছে সে? সেই মুখ, সেই চোখ, সেই নাক― পুরো খোকা বসানো।
এদ্দিন পরে কে এল তাহলে? কাকে দেখছে সে? নিজের নাতি? আহা গো, কত শখ ছিল, নাতি পুতি নিয়ে সংসার করবে। হল কই?
কিন্তু নাতিটা এই ডায়েরি পেলো কোথায়? ঘর ছেড়ে আসার সময় একটা কবিতার ডায়েরি কি ফেলে এসেছিলেন?

আহা, বড় কান্না পাচ্ছে আজ। যে কবিতা কেউ শুনতো না, আজ সে কবিতাই তার নাতির হাত ধরে ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিপাশে। গ্রামে গ্রামে। মাটিতে, ঘাসে, আকাশে।
বড় মায়া হচ্ছে আজ। বড় মায়া। নাতিটার মুখ ধরে একটি চুমো খেতে ইচ্ছে হচ্ছে।
আনন্দে শূন্যে দু’পাক ঘুরেই নিলেন পরিমল।

।।ছয়।।

‘মন্তর-তন্তরগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছে বোধহয়, কী বলো করালী?’, মোড়ল প্রশ্ন করে, নাকি নিজেকেই আশ্বাস দেয় বোঝা যায় না।
করালী নামের ব্যক্তিটি ততক্ষণে একখানি অদ্ভুত জিনিস দেখে ফেলেছে।
দেখে ফেলেছে, আবছায়া কুঁজো একটা শরীর পরম মমতায় আশীর্বাদ করছে ঠাকুরমশায়কে। আদরে সোহাগে ভরিয়ে দিচ্ছে যেন৷
‘করালী, এই করালী, কই গেলে গো?’, মোড়লের এই প্রশ্নটা কানে শোনার ঠিক এক মুহূর্ত পরে করালী দ্বিতীয়বার অজ্ঞানটা হয়ে পড়ে গেল।
মোড়ল সেইদিকে হায় হায় করে ছুটে না এলে দেখতে পেত, দুটো আবছায়া শরীর মনের আনন্দে আকাশে নৃত্য করতে করতে উড়ে যাচ্ছে যেন।

।।সাত।।

― কতটা খারাপ কবিতা লিখলে ভূতবিতাড়ন মন্ত্র হিসেবেও তা পাঠ করা যায়? প্রকাশক যে তোমার লেখা ছাপতো না, বেশ করত, বুঝলে?
― আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে যাই বলেন, অমর তো হয়ে রইল। নাকি? গীতাঞ্জলির মতো? কী বলেন স্যার?
― ছি ছি ছি! ভূতমুখে এ কথা বলতে লজ্জা করলো না? যাগ গে, মুড়ি মাখবে নাকি হে?
― নিশ্চয়ই স্যার। নিশ্চয়ই। নারকেল দিয়ে চানাচুর দিয়ে, মুচমুচে ভাজা দিয়ে। জানেনই তো স্যার একটা জিনিস, যা আমি কবিতার থেকেও ভাল বানাতে পারি, সেটা একমাত্র এই ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি, আর ঝালমুড়ি!

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive শিশুর শহরতলি