অন্য একতারা― ৩

অন্য একতারা― ৩

এমনি ক’রেই আমায় মারো

উড়িষ্যা আমার জীবনে ঘুরে ফিরে এসেছে। প্রথমবারে সে আমাকে উপহার দিয়েছিল সমুদ্র এবং একটি রাজেন্দ্রদর্শন আশ্চর্য তরুণ। না, প্রেম নয়। প্রেম নিয়ে মাথা ঘামানোর বয়স তখনও বেশ দূরে। তরুণটিকে মনে আছে তার স্ফুটনোন্মুখ পদ্মের মতো মুখ ও সারল্যের জন্যে। আমাদের সম্পূর্ণ উড়িষ্যা ভ্রমণের সময়টুকু সে আমাদের বন্ধু হয়েছিল। কতই বা বয়স তার! আঠারো-উনিশ!
আকাশে তখন সদ্য কিশোরীর মত উদ্ভিন্ন আলো। জেলে নৌকাগুলি স্পষ্ট হচ্ছে একে একে। একটি নৌকা পাড়ে এসে ভিড়তেই তরুণটি দিল একছুট। কিছুক্ষণ পরেই এক আঁজলা মাছ নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল। মুখে দিগ্বিজয়ের হাসি। সেই প্রথম জেলে নৌকা কাছ থেকে দেখা। জল থেকে নৌকা নিয়ে ফিরে আসা সুঠাম কৃষ্ণ-সেনা। সমুদ্র-গৌরবে গরবিনী সৈকতের সোনালী বিচ্ছুরণ একটু পরেই রূপান্তরিত হল ঝিকিমিকি রুপোলী বৈভবে। আমাদের সেই পরিচিত তরুণটি ভাঙা ভাঙা বাংলায় মাকে বোঝাতে বসল, কী করে নোনা মাছ রান্না করতে হয়। এমনই উৎসাহ তার, যে নিজেই তাড়া দিয়ে আমাদের গেস্ট হাউসে ফিরিয়ে নিয়ে এসে শীতাতুর উনুনটি কাঠকুটো দিয়ে জ্বালিয়ে রান্নায় বসে গেল। অচেনা দুটি অতিথি পরিবারকে কী অকারণ ভালবাসা তার! দূরের নৌকা থেকে তখনও অস্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছে সারিগান। ছেলেটির অপটু গৌর মুখ তখন আগুন কুসুমে তেতে উঠছে। ঠোঁটে এক আশ্চর্য মায়াময় হাসি।

যতবার ফিরে যাই, তাকে দেখার প্রতীক্ষাটি থাকে। সে আমার কাছে হৃত সারল্যের মুখ। সমুদ্রের মুখোমুখি হবার আগে মনে মনে স্পষ্ট ভাবে তাকে দেখি। রাস্তার বাঁকে একটি কুসুমাভরণ গাছের তলায় সে দাঁড়িয়ে আছে। কবেকার তরুণ বয়স। গাড়ি তাকে ছাড়িয়ে চলে যায়। তবু সে এগিয়ে আসে না, ফিরেও যায় না বিপরীতে। তার হাসির স্মৃতিটুকু লেগে থাকে। যেন বলতে থাকে, যেখানে থাকার কথা― আমি ঠিক সেখানেই তো আছি। তুমিই তো বারবার দূরে চলে যাচ্ছ ফেলে রেখে।

এভাবেই মানুষ তার সারল্য থেকে দূরে চলে যায়, তারপর আজীবন খুঁজে বেড়ায় সেই সারল্যকে।
তাই সে বারবার জটিলের লৌহ আলিঙ্গন খুলে দৌড়ে পালাতে চায়। কিন্তু নিজের ভেতরের জটিলতাকে সে এড়াতে শেখে না। পৃথিবীকে দু’রকম চোখে দেখা যায়। যদি তাকে সরল চোখে দেখি, তবে সে তার সমস্ত সৌন্দর্য সাজিয়ে বসবে আমার হৃদয়ের কাছাকাছি। আর যদি জটিল চোখে দেখি, সে গুটিয়ে নেবে তার ঝাঁপি। কঠোরের আড়ালে নিজেকে গোপন করে রাখবে চিরকাল।

ছোটবেলায় আমি এক মানুষকে চিনতাম, যার সমস্ত জীবন দুঃখময়। শহরে বিশাল ফ্ল্যাট, প্রেমময় স্ত্রী, অনুগত ও সফল সন্তান, তবুও যেন দুঃখ তাকে জড়িয়ে রেখেছে।
বড় হতে হতে বুঝলাম, সেই দুঃখ তার নিজের হাতে গাঁথা দেওয়াল। কারো ভাল-লাগাটুকু যে তার চোখে পড়ে না, মনে থাকে না। সমস্যা হল, আজকের দুনিয়ায় মানুষ সারল্য আর নির্বুদ্ধিতাকে এক করে ফেলেছে। সত্যনিষ্ঠতাকে তো বহুদিন আগেই সে নির্বুদ্ধিতা বলে দেগে দিয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে যেটুকু মূল্যবোধ ছিল, আজ তাকে মরীচিকা বলে মনে হয়। আজকের ন্যায়নীতির একেবারে আলাদা ঘরানা।


এভাবেই মানুষ তার সারল্য থেকে দূরে চলে যায়, তারপর আজীবন খুঁজে বেড়ায় সেই সারল্যকে।
তাই সে বারবার জটিলের লৌহ আলিঙ্গন খুলে দৌড়ে পালাতে চায়। কিন্তু নিজের ভেতরের জটিলতাকে সে এড়াতে শেখে না।

 

ভিতরে ভিতরে মানুষ যত পতনের দিকে যাবে, ততই সুগম হবে বাহ্যিক উত্থানের পথ। অথচ পতনে উত্থান বলতে একসময় অন্য কিছুকে বুঝেছিলাম ।

‘প্যারাডাইস লস্ট’ জন মিলটনের লেখা মহাকাব্য। জন মিলটনের এই আধুনিক এবং ক্ষুরধার উপস্থাপন তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চের চক্ষুশূল হয়েছিল স্বাভাবিক ভাবেই। সে প্রসঙ্গ অন্য। ‘প্যারাডাইস লস্ট’ এর নায়ক ঈশ্বর কিংবা মানুষ নয়, লুসিফার। যাকে আমরা শয়তান বলে জানি। এখন শয়তান কাকে বলব? অবশ্যই যে আমার বিরুদ্ধ স্বরে কথা বলবে, তাকে। অতএব লুসিফার, একদা স্বর্গের উজ্জ্বলতম মুখ, হলেন কলঙ্কিত শয়তান। লুসিফার হলেন ঈশ্বরের বিরুদ্ধ-স্বর, যিনি ঈশ্বরকে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছিলেন।
মিলটনের চোখে লুসিফার এক ট্রাজিক নায়ক। অ্যারিস্টটলের ট্রাজেডির সমস্ত নিয়ম মেনেই এক অসাধারণ ট্র‍্যাজিক চরিত্র। ঈশ্বরের সমকক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি বহিষ্কৃত এবং বিক্ষুব্ধ।
তবে পতনে উত্থান বলছি কেন? উত্থান বলছি, কারণ তিনিই মানুষকে নতুন পথের দিশা দেখিয়েছিলেন। আদম যখন একা, তখন তিনি এক নিঃশর্ত আনুগত্যের মুখ। তাঁর একাকীত্ব দূর করতে ঈশ্বর সৃষ্টি করলেন ইভকে। ইভ কিন্তু আদমের অনুগত হলেন না। তিনি হলেন স্বাধীনচেতা, আদমের চাইতে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং অনুসন্ধিৎসু। লুসিফার ঈশ্বরানুগত আদমকে অনেক চেষ্টা করেও নিজের কথা বুঝিয়ে উঠতে পারেননি এতদিন। কিন্তু ইভ লুসিফারের কথা বুঝলেন। জ্ঞানবৃক্ষের ফল এল মানুষের হাতে।

প্যারাডাইস লস্ট তাই পতনের নয়, বিপরীত এক উত্থানের মহাকাব্য। প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে গেলে পতনের প্রভূত সম্ভাবনা। সকলের সে সাহস থাকে না। যাঁর থাকে, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন আলোর বিপরীতে। একা অথচ অটুট এক কালপুরুষের মতো। যীশু, গ্যালিলিও, খনা, পল রোবসন কিংবা ভারভারা রাওয়ের মতো। যাঁদের পিঠে আগুনের শিখা দিয়ে শয়তান লিখে দেওয়া যায়, ক্রুশবিদ্ধ করা যায়, অন্ধ করে দেওয়া যায়, জিভ কেটে নেওয়া যায়, অন্ধকার কুঠুরিতে বন্ধ করে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করা যায়, কিন্তু মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সময় তাঁকে আরও উজ্জ্বল আরও দীপ্যমান করে তোলে।


প্যারাডাইস লস্ট তাই পতনের নয়, বিপরীত এক উত্থানের মহাকাব্য। প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে গেলে পতনের প্রভূত সম্ভাবনা। সকলের সে সাহস থাকে না। যাঁর থাকে, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন আলোর বিপরীতে। একা অথচ অটুট এক কালপুরুষের মতো। যীশু, গ্যালিলিও, খনা, পল রোবসন কিংবা ভারভারা রাওয়ের মতো। যাঁদের পিঠে আগুনের শিখা দিয়ে শয়তান লিখে দেওয়া যায়, ক্রুশবিদ্ধ করা যায়, অন্ধ করে দেওয়া যায়, জিভ কেটে নেওয়া যায়, অন্ধকার কুঠুরিতে বন্ধ করে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করা যায়, কিন্তু মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।


এ তো গেল একধরণের পতনের কথা। কিন্তু পতন কি শুধুমাত্র এই? যে পতনের সন্ধান কেবল আমি পাই, বাইরের জগত যাকে চাক্ষুষ করে না― সেই পতনই তো নিজেকে চেনায়। প্রতিদিন কত ছোটখাটো ঘটনায় আমরা নিজেকে চিনি। যে আমি লুকিয়ে থাকে অবচেতনের আড়ালে, তাকে প্রত্যক্ষ করি দৈনন্দিনের ঘটনায়। যখন আমাকে চেনা কেউ দেখছে না, তখনকার আমি আর চেনা সমাজের আমি কি এক? ভিড় বাসে কোনও মতে একটা জায়গা পেয়ে তুলনায় বয়স্ক মানুষটিকে ঠেলেঠুলে বসে পড়ি যখন, আহত মানুষ রাস্তায় পড়ে আছে দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে যাই, নোংরা অসুস্থ অসহায় মানুষ সাহায্য চেয়ে হাত বাড়ালে বিরক্ত হই, সেইসব দৈনন্দিন চ্যুতিকে এড়িয়ে যাব কি করে? সেইসব চ্যুতি আমাদের বোঝায়, নিজের বিচারটি আগে করতে শেখো। সেইসব চ্যুতি আসলে এক একটি সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে আমরা উত্থানের দিকে যাব, না পতনের দিকে, তা আমাদেরই নির্ণয় করতে হবে।


লেনার্ড কোহেন একটি কবিতা লিখেছিলেন, “In the eyes of men he falls”। মানুষের পতনের কথা আছে সেই কবিতায়। “The poet of brokenness”- এই নামেই ডাকা হয় কোহেনকে। মানুষের ভেতরকার ভাঙচুর নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, কিন্তু কোহেনের লেখায় প্রতিটি ভাঙচুর বড় স্পষ্ট। বড় নিজের। যে কবিতার কথা বললাম এখানে, সেই কবিতার মানুষটি আমরা প্রত্যেকে। সেই পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের সবার চলাচল । কোহেন সেই পতনেও আলোর সন্ধান পেয়েছেন। ভাষান্তরে হয়তো তার সবটুকু আর্তি ধরা পড়ল না। তবুও প্রয়াসটুকু করে যাওয়া।

কোহেন তাঁর কবিতায় লিখলেন –

“মানুষের পতন হয় মানুষের চোখে। এমনকি তার নিজের চোখেও। তার উচ্চ আসন থেকে পড়ে গিয়ে সে হোঁচট খায় তার এতদিনের কৃতিত্বগুলোতে। তার এই পতনের দায়িত্ব তো তোমার প্রভু! তোমাকে জানার জন্যেই তো তার এই পতন! এই যে লোকেরা বলছে- পতন কত দুঃখজনক! যারা তার যোগ্য নয়, তারাই যে তার কলঙ্ক নিয়ে, মর্যাদাহানি নিয়ে এত কথা বলছে,― কিন্তু আমি দেখি, তার পতনেও কত আলো! সে তো আলোর দিকেই নেমে আসছে! তার এই পতনকালে যে কোন দিব্য পুরুষ তাকে আগলে রাখছেন, সে কথা তো তারা জানে না! তারা জানে না যে কীভাবে মানুষের পতনের প্রকৃতি বদলে যায়। মানুষ নিজেও তো অভিভূত হয়ে থাকে। তাঁর করুণায় মুগ্ধ হয়ে থাকে। যিনি তাকে পতনকালে রক্ষা করেন, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানায় অন্তর থেকে।

মানুষ শুনতে পায়, তার হৃদয় কেঁদে উঠছে। তাকে বুঝিয়ে বলছে, কেন তার এই পতন। পতন নিশ্চিত জেনেও শেষ পর্যন্ত সে পতনের কাছেই সমর্পণ করে নিজেকে। হে পতনকালীন আলিঙ্গন! তুমি ধন্য। মানুষটি তখন পরম শূন্যের হাতে পড়ে, আলোর উদ্যানে পড়ে। এই পতনের কালে কেউ তাকে আঘাত করতে পারে না। হে পতনকালীন বর্ম!হে দিব্য কবচ! তুমি ধন্য। সেই হাতের আলিঙ্গনে, পতনকালের সেই গুপ্ত অবস্থায় সে সন্ধান পায় এক অন্য জগতের, যেখানে প্রকৃতপক্ষে সে এক নির্বাচিত সত্তা। পতনকালের সেই হাওয়ার দাপটে যখন তার চুল বিপরীত দিকে প্রবাহিত হচ্ছে, পোশাক ছিঁড়ে যাচ্ছে , তখনও সে সুরক্ষিত, আশ্বস্ত। সে তার পতনস্থানে প্রবেশ করছে। হে পতনকালের স্বাচ্ছন্দ! হে আলোর উদ্ভাস ও ভিত্তি! হে অঘটনের নিয়ন্তা! তুমি ধন্য”।

এই কবিতা আমাদের অনিবার্য ভাবে মনে করিয়ে দেয় সেই বহুশ্রুত গান-

“আরো আরো প্রভু, আরো আরো।
এমনি ক’রে আমায় মারো।। ”

ভারতীয় দর্শনে, খ্রীস্টের প্রবচনে এবং অন্যান্য ধর্মেও আমরা বারবার দেখেছি- দুঃখ, কষ্টের আগুনে পুড়ে পুড়ে মানুষ নিখাদ সোনা হয়ে ওঠে। সেই আগুনের উদ্‌গাতাও ঈশ্বর, পোড়ার জ্বালা নিরাময় করতে প্রলেপটিও তিনিই দেন নিজের হাতে। এই বিশ্বাসটুকুর জোরেই হয়তো মানুষ সংসারের সব জ্বালার নিরাময় খোঁজে। এই বিশ্বাসটুকু না রাখলে হয়তো তার যুঝে ওঠার শক্তিটুকুও থাকবে না। কোহেনের কবিতায় যেন সেই চিরকালীন দর্শনকেই ছায়া ফেলতে দেখি। ছায়া ফেলতে দেখি সর্বৈব সমর্পণকে। এই সমর্পণ আবারও বৈষ্ণব সাহিত্যকে মনে করায়, চৈতন্যদেবকে মনে করায়।

কোহেনের শিকড় ছিল ধর্মের গভীরে। তাঁর কবিতা পড়লেই তা প্রতিভাত হয়। তবে ধর্ম বলতে রীতি-রেওয়াজ নয়, প্রকৃত ধর্মের সন্ধান করেছিলেন কোহেন। ঈশ্বরকে নিভৃতের দীপশিখা করে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন নিজের গভীরে। একটি দিশা দেখিয়েছিলেন অন্ধকারে। যে আলোর দিশা আগেও পেয়েছি রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, পরবর্তীকালে অলোকরঞ্জনে।

(ক্রমশ)

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
অন্য একতারা যুগান্তর Exclusive