চলতি বছরে দু’টি ব্যাংক বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নিল সরকার

চলতি বছরে দু’টি ব্যাংক বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নিল সরকার

টিম যুগান্তর: ভারতবর্ষের আর্থিক স্বচ্ছলতা সুনিশ্চিত করতে বিগত বছরের বিলগ্নিকরণ কর্মসূচি গ্রহণের পর চলতি বছরে সরকার দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা ২০২১-এর ১লা ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা  সীতারমনের  পেশ করা বাজেটে ব্যাঙ্কিং সেক্টরের এই মুহুর্তের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ খবর।

২০২১-এর বাজেটে সরকার পরিষ্কারভাবে বেসরকারিকরণের উদ্যোগ কার্যকরী করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছে। সহজভাবে বললে, পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংস কোম্পানিগুলিকে বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হবে। একটি পিএসইউ সরকারি কোম্পানি তখনই হয় যখন ঐ কোম্পানির পঞ্চাশ শতাংশের বেশি অংশ সরকারের হয়। তেমনই বেসরকারি কোম্পানির অংশ যদি পঞ্চাশ শতাংশের বেশি হয় তাহলে সেটা বেসরকরি কোম্পানিতে পরিণত হয়, সেটি আর সরকার নিয়ন্ত্রত কোম্পানি থাকে না। একে সরকার “ডিসইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক সেল” বলেছে। সরকার শুধুমাত্র ৪টি স্ট্র্যাটেজিক সেক্টর ছাড়া বাকি সব সেক্টর বেসরকারিকণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বেসরকারিকরণ এমন একটি বিতর্কিত বিষয় যাঁর স্বপক্ষে এবং বিপক্ষে বিশেষজ্ঞমহল অনেক রকম যুক্তি দিচ্ছে। যারা বেসরকারিকণের পক্ষে তাঁদের মতে, বেসরকারিকরণ হলে কোম্পানিগুলির দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়াবে, কোম্পানিগুলি বেশি মুনাফা লাভ করবে এবং সরকারি কোম্পানিগুলির তুলনায় বেশি সফল হতে পারবে। আবার যাঁরা  বিপক্ষে তাঁরা মনে করছেন, সরকারি কোম্পানি বেসরকারি আওতায় চলে গেলে সাধারণ মানুষের থেকে পুঁজিপতিরা বেশি লাভবান হবেন। সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হবে।

৭য়ই ফেব্রুয়ারি রবিবার মুম্বাইয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে ব্যবসায়ী, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও ট্যাক্স প্রফেশনালদের উদ্দ্যেশ্যে  কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন যে, সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একসাথে মিলে ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করবে। তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের কোভিড মোকাবিলা পরিষেবার কর সংক্রান্ত যে গুজবের কথা শোনা যাচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ” আমরা জানি না, এই খবরগুলি কিভাবে প্রকাশিত হয় যেখানে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, আমরা করদাতাদের ওপর কোনও রকম বোঝা চাপাতে চাই না।  কোভিড করের তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। “ইউনিয়ন বাজেটের আগে কেন্দ্রীয় সরকারের আলোচনায় করদাতাদের ওপর একটি কোভিড করের গুঞ্জন শোনা গেলেও চূড়ান্ত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আয়কর পরিবর্তনের কোনও কথা প্রকাশ করেননি। অবশ্য তিনি আয়কর সংক্রান্ত  নিয়মকানুনে কিছু পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন। সাথে এটাও জানিয়েছেন, “সৎ করদাতাদের চিন্তার করার কোনও কারণই নেই। যারা এই ব্যবস্থার সাথে খেলতে চেষ্টা করবেন তাদের মোকাবিলা করার জন্য আজ আমাদের কাছে রয়েছে উন্নততর ডেটা এবং প্রযুক্তিবিদ্যা।”

এইদিন তিনি সরকারের পুনঃবিনিয়োগের দিকেও আলোকপাত করেন। বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দিতে কড়া সুরে তিনি  বলেন, “বিরোধীরা বলেছে, আমরা নাকি পরিবারের রূপোর জিনিসপত্র বিক্রি করছি। কিন্তু মোটেও তা নয়। আমরা ভারতবর্ষের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্খা রূপায়ণের জন্য বিষয়টিকে আরও শক্তিশালী করছি।”

ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইয়ের অবস্থান সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, “মুম্বাই হল এমন এক শহর যা বাজেট বোঝে। আসলে, বাজেট সম্পর্কে মুম্বাইতে আলোচনা করা পার্লামেন্টে আলোচনা করার সমতুল্য।”

সাধারণ জনগনের উদ্দেশ্যে সীতারমন বলেন, “আমি এই শহর এবং প্রত্যেক করদাতাদের আশ্বস্ত করতে চাই, তাদের প্রদত্ত প্রতিটি অর্থের মূল্য দেবো এবং সঠিক খাতে তা ব্যবহার করা হবে।”

ইউনিয়ন বাজেট প্রসঙ্গে মন্তব্যে তিনি জানান, এটা আগামীর জন্য পথ তৈরি করছে। সমাজতান্ত্রিক যে বোঝা দেশ এতদিন বহন করে আসছে তা শুধুমাত্র লাইসেন্স-রাজ শিল্পসমৃদ্ধতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯১ সালের প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বাধ্যতামূলক যে উদারকরণ সংঘটিত হয়েছিল তাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ অনুসৃত হওয়ার কথা থাকলেও তা কিন্তু হয়নি।

অর্থনীতির ওপর ব্যাঙ্ক বেসরকারিকণের যে কুপ্রভাব পড়তে পারে, তা বহু মহল থেকেই বহুবার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাই এদিনের সম্মেলনে সেই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই তিনি সাংবাদিকদের জানান, সরকারের ব্যাঙ্ক হোল্ডিংগুলি সুরক্ষিত করতে কোনও ব্যাঙ্ক বিনিয়োগ সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা সরকারের নেই।
কেন্দ্রের বাজেটে পরিকল্পিত পুনঃবিনিয়োগ হিসেবে ২টি ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণ ঘোষিত হলেও ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলো এই পদক্ষেপে খুশি নয়। ইতিমধ্যেই ইউনিয়নগুলি ধর্মঘটের পথে যেতে পারে বলেও জানিয়েছে।
“বিশদে কাজ হচ্ছে। ঘোষণা করা হলেও, আমরা আরবিআই-এর সাথে একসাথে কাজ করছি”, গতকালের মুম্বাইয়ের সাংবাদিক সম্মেলনে একথা জানান তিনি।
তবে, কোন দুটি ব্যাঙ্ক বেসরকারি হবে সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য তিনি করতে চাননি। এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন,
“সরকার যখন  প্রস্তুত হবে তখন আপনাদের জানানো হবে।”

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং সরকার বিষয়টি তৎপরতার সাথেই পরিকল্পনা করছে সেটা অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কোন কোন ব্যাঙ্ক এবং কবে তা এখনই না ঘোষিত হলেও তা কার্যকরী হতে খুব বেশি দেরি যে নেই, সীতারমনের সাংবাদিক সম্মেলন সেটাই বুঝিয়ে দিল।

কোভিড পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষ এখন দারুন আর্থিক ঘাটতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দেশের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। ২০২১-এ সীতারমনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ভারতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা  করতে পারবে কি না, তার প্রমাণ অবশ্য কেবলমাত্র সময়ই দিতে পারবে।

শেয়ার করুন

0Shares
0
অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক