লিখছেন রূপম ইসলাম ― ৩

লিখছেন রূপম ইসলাম ― ৩

আবার অরণ্যে

কয়েকদিন যাবতীয় কাজ থেকে ছুটি নিয়েছি। বলা যায় একরকমের বাধ্য হয়েই এই কর্মবিরতি। আমি বর্তমানে বাড়িছাড়া। বড় ধরনের রদবদল ঘটছে সেখানে। ‘আজকের কষ্ট কালকের কেষ্ট’— এই আপ্তবাক্য এখন আমার সহায়। নিজের কর্মক্ষেত্রে আরও বড় পরিসরে ফিরতে পারব— এমন স্বপ্নসন্ধানেই ইদানিং দিন গুজরান।

তবে ‘আজকের কষ্ট’ বলতে যা বোঝায়, তেমন কোনও কষ্টে আমি নেই। হয়তো আমার গান যাঁরা শোনেন, তাঁরা আমার এই সমাধিস্থ অবস্থায় অবাক হচ্ছেন। যাঁরা আমার পডকাস্ট শোনেন, তাঁরা ভাবছেন নতুন পর্ব আসছে না কেন। সব মিলিয়ে তাঁদের হয়তো একটু বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আমি দিব্যি আছি। বইপত্রের মধ্যে ডুবিয়ে নিয়েছি নিজেকে। অনেক কিছুর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছি। রহস্যসন্ধান করছি।

এই যেমন সেদিন করে একটা ওয়েব সিরিজ দেখলাম। এটির নেপথ্য সংগীতে আমার কণ্ঠ আছে। ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’। পরিচালক— আমার বন্ধুপ্রতিম সৃজিত মুখোপাধ্যায়। দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল একটা প্রিয় চলচ্চিত্রের কথা। নাম— ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করেছেন। লিটল ম্যাগাজিনের তো কোনও বৃহৎ পৃষ্ঠপোষক থাকে না, নিজস্ব উদ্যোগে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো করেই ব্যাপারটা চলে। তো প্রেসের সঙ্গে দীর্ঘকালীন ধার-দেনার সম্পর্ক থাকে। থাকবারই কথা। এই প্রেসের ধার মেটাতেই তাঁকে লিখতে হয়েছিল এই উপন্যাস। ১৯৬৭ সালে শারদীয় জলসায় প্রথম প্রকাশ। ‘৬৮-র জানুয়ারিতে বই হিসেবে বেরোয়। দেশ পত্রিকায় এই বইয়ের বিজ্ঞাপন দেখেন সত্যজিৎ রায়। তিনি ফোন করেন সুনীলকে। জানান— ছবি করতে চান। সুনীল রাজি। পনেরো দিনের মধ্যে সত্যজিতের চিত্রনাট্য তৈরি হয়ে যায়।

উপন্যাস এবং চিত্রনাট্য দুই-ই আমার আগে পড়া ছিল। আবার পড়লাম। মূল ভাবনা অভিন্ন রেখে, কাহিনীর কিছু ব্যাপার এক রেখেও সত্যজিৎ অনেক বাস্তবানুগ করেছেন গল্পটাকে। আসলে উপন্যাসে বা কাহিনীতে অতিনাটকীয়তা মানায়, কারণ তা কল্পনার চোখে পাঠক দেখেন, সরাসরি দেখেন না। সরাসরি দেখাতে গেলেই কিন্তু নাটকের মাত্রা কমিয়ে আনা দরকার, নইলে অবাস্তব লাগবে। এটা সত্যজিৎ মোক্ষম বুঝতেন। এটার একটা বড় প্রয়োগ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর প্লটের বড়সড় পরিবর্তন। এমনকী ‘গুপী বাঘা’-র মূল গল্পের মহা-নাটকেও কাটছাট করেছিলেন সত্যজিৎ, কষ্টকল্পনাকে কল্পবাস্তব বানিয়েছিলেন— এ ধরনের আরও অনেক উদাহরণ নিঃসন্দেহে পাওয়া যাবে। আমি ইচ্ছে করেই এমন দুটোর কথা বললাম— যেগুলো হয়তো আমরা সবাই দেখেছি, পড়েছি।

গল্পের নাটকীয়তায় কাটছাঁট হয়। সুনীল যেমন ক্লাইম্যাক্স তৈরি করেছেন গল্পে, চরিত্রগুলির আন্তঃসাম্পর্কিক জটিলতা তৈরি করে তা বাড়িয়েছেন, সিনেমার চরিত্রগুলো মোটামুটি একরৈখিক। আলাদা করে চট করে চিনে নেওয়া যায়। উপন্যাসে কেন্দ্রীয় পুরুষ অসীম না রবি— এ দ্বন্দ্ব জাগে। সিনেমায় কিন্তু সৌমিত্র অভিনীত অসীম, সব সময়েই কর্তৃত্ব বজায় রাখে।

 


‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ চিত্রনাট্যেও আছে, ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ গল্পেও আছে— শহরে সার্কাস এসেছে। চিত্রনাট্যের পিকনিকে মেমরি গেম ছিন্নমস্তায় বদলে হয়েছে ‘জল মাটি আকাশ’— সিনেমায় যা কেন্দ্রীয় চরিত্রদু’টির ইগোর লড়াই উন্মোচিত করছে— ফেলুদার গল্পে তার নেপথ্যেই কিন্তু ঘটে যাচ্ছে কাহিনীর পারিবারিক ইগোসেন্ট্রিক অপরাধ।

 

তবে গল্পের নাটকীয়তা বাস্তবতার খাতিরে কমলেও দৃশ্যের নাটকীয়তা, ছবির দৃশ্যরস বাড়াতে চান সত্যজিৎ। তাই ধলভূমগড় নয়, ডালটনগঞ্জ। ধলভূমগড়ের অরণ্যে লাইন করে শালগাছ— ক্যামেরার চোখে তা আনইন্টারেস্টিং। পালামৌ-তে বৈচিত্র আছে। পাশাপাশি এসে পড়ে বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ক্লাসিক গ্রন্থের রেফারেন্স। গল্পের প্রেমগন্ধী নাটক কমছে, করুণরস কমছে। প্রসঙ্গ-কৌলীন্য কিন্তু বাড়ছে।

চারজন অরণ্য পর্যটক। একটা চিত্তাকর্ষক পরিবারের সঙ্গে আলাপ। গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধ। ব্যক্তিত্বসম্পন্না নারীচরিত্র। এই সবই ফিরে এসেছিল। ১৯৬৮-তে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র চিত্রনাট্য রচনা। ১৯৭৮-এ ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’। চারজনের বদলে পর্যটক এখানে তিনজন। ডালটনগঞ্জের বদলে এবার হাজারিবাগ। ধলভূমগড়, ডালটনগঞ্জ, হাজারিবাগ— সবই ঝাড়খণ্ডে। প্রকৃতি একরকম। একটা পরিবারকে ঘিরে সম্পর্কের চাপানউতোর— আমার গল্পদু’টির প্রকৃতিও একইরকম লাগে। রহস্যের আঁচ ছিল সুনীলের গল্পটিতেও। পরিবারের জেষ্ঠ্যপুত্র আত্মহত্যা করেছিলেন বিলেতে একাকী। কারণ জানা যায়নি। সৌমিত্র ছিলেন ঐ গল্পের ছবিতে। কিন্তু পর্দার নাম ছিল অসীম চ্যাটার্জি। প্রদোষ সি. মিটার নয়। তাই রহস্যের উন্মোচন হয়নি।

‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ চিত্রনাট্যেও আছে, ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ গল্পেও আছে— শহরে সার্কাস এসেছে। চিত্রনাট্যের পিকনিকে মেমরি গেম ছিন্নমস্তায় বদলে হয়েছে ‘জল মাটি আকাশ’— সিনেমায় যা কেন্দ্রীয় চরিত্রদু’টির ইগোর লড়াই উন্মোচিত করছে— ফেলুদার গল্পে তার নেপথ্যেই কিন্তু ঘটে যাচ্ছে কাহিনীর পারিবারিক ইগোসেন্ট্রিক অপরাধ।

বিখ্যাত লেখক, পরিচালক, গায়ক, গীতিকারদের নিয়ে যখন পড়াশুনো করি, এরকম অনেক বিচিত্র প্রসঙ্গ সামনে আসে। যেমন এই অরণ্যচারণ, বোহেমিয়ান জীবনের উদযাপন— যে কথা সুনীল লিখেছেন এই উপন্যাসে, তার শিকড় খুঁড়লে যাঁর নাম বেরিয়ে আসবে তিনি সমীর রায়চৌধুরী। সমীর এবং তাঁর ভাই মলয়, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫-র হাংরি জেনারেশন আন্দোলন কৃত্তিবাস কবিদের একদম প্রতিস্পর্ধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। মজার ব্যাপার হল— কৃত্তিবাস এবং হাংরি— এই দুই বৃত্ত বারবার নিজেদের স্পর্শ করছিল। একটার মধ্যে অন্যটা কখনও ঢুকে পড়ে কমন এরিয়া তৈরি করছিল— তাও দর্শনসঞ্জাত বৈরিতা ছিলই। সমীরের উদ্যোগেই বেরিয়েছিল সুনীলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’। তখনও অবশ্য হাংরিদের প্রথম ইস্তেহার প্রকাশ পায়নি।

সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও বুদ্ধদেব গুহ

সমীর রায়চৌধুরী চাইবাসা জেলায় চাকরিসূত্রে পোস্টেড ছিলেন। সেখানেই নিমডিতে তাঁর বাসায় গিয়ে থাকতেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সেখানেই যাতায়াত সুনীল-সন্দীপনদের। চাইবাসার জঙ্গলজীবন, মহুয়াপান, শহুরে সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কছেদ — এসব ওঁদের সবার লেখাতেই উঠে এসেছিল। সুনীল লিখেছিলেন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। সন্দীপন— ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’। এটা অবশ্য আমি মলয়ের স্মৃতিকথা পড়ে বলছি। ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’ আমি এখনও পড়িনি।

 


সমীর এবং তাঁর ভাই মলয়, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫-র হাংরি জেনারেশন আন্দোলন কৃত্তিবাস কবিদের একদম প্রতিস্পর্ধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। মজার ব্যাপার হল— কৃত্তিবাস এবং হাংরি— এই দুই বৃত্ত বারবার নিজেদের স্পর্শ করছিল। একটার মধ্যে অন্যটা কখনও ঢুকে পড়ে কমন এরিয়া তৈরি করছিল— তাও দর্শনসঞ্জাত বৈরিতা ছিলই।

 

জঙ্গলের কথা চলে এল— আমিও এই সূত্র ধরে বুদ্ধদেব গুহ-র শরণাপন্ন হলাম। ঐ ঝাড়খণ্ডেরই ম্যাকলাস্কিগঞ্জে বুদ্ধদেবের আস্তানা ছিল— দ্য টপিং হাউজ। বনজঙ্গলের প্রসঙ্গ এলে জঙ্গলপ্রেমিক ঋজুদার কথা তো আসবেই। আমি আবার নতুন করে ‘ঋজুদা সমগ্র’ হাতে তুলে নিলাম।

‘ঋজুদা সমগ্র’-এর প্রথম কাহিনী ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’ কিন্তু মোটেই ঋজুদার প্রথম গল্প নয়। সমগ্রগুলি কালানুক্রমিক ভাবে সাজাননি বুদ্ধদেব। তবে ‘গুগুনোগুম্বার’ আমার পড়া প্রথম ঋজুদা। পড়েছিলাম ১৯৮০-র পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায়। তখন আমার ছ’বছর বয়স।

পরে আরেকটি উপন্যাসে আমি এই কাহিনীর ছায়া পাই। সেটি কাকাবাবুর কাহিনী। নাম— ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’। সেটিও খুব প্রিয়। ইন ফ্যাক্ট, সৃজিত ‘মিশর রহস্য’ ফিল্মে তুলবার পর ওকে আমি যে দুটো কাকাবাবুর ছবি তৈরি করবার অনুরোধ করেছিলাম— সে দুটো হল ‘পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক’ এবং ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’। আমার বইয়ের তাক থেকে সৃজিত ‘কাকাবাবু সমগ্র’ তুলে নিয়ে গেছিল। ফেরতও দিয়েছিল যথাসময়ে। পড়ে-টড়ে তার মনে হল— আমার দাবি মন্দ নয়। দুটো ছবিই হতে পারে।

‘গুগুনোগুম্বার’-এর শেষে গুলি লেগে ঋজুদার একটা পায়ের বিশ্রী অবস্থা হয়। গ্যাংগ্রিন হয়ে কাটা যাবার মতোই। কী হল শেষমেশ— গল্পের শেষে কিন্তু স্পষ্ট উত্তর নেই। চার বছর পরের ঋজুদা কাহিনী ‘রুআহা’-তে ঋজুদার জবানীতে— “আমার খোঁড়া পায়ের বদলা নেবার সময় এসেছে”— পড়লে মনটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে বৈকি! গুগুনোগুম্বারের দেশ সত্যিই কাছাকাছি এনে ফেলেছিল ঋজুদা আর কাকাবাবুকে— সে সম্ভাবনা তো আলবাত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাঝের উপন্যাস ‘অ্যালবিনো’ যাঁরা পড়বেন— তাঁদের এতটা দুর্ভাবনায় পড়তে হবে না। তাঁরা জেনে যাবেন, কোনও আরণ্যক আদিম শুশ্রুষায় বেঁচে গেছে ঋজুদার পা। সামান্য খোঁড়াতে হচ্ছে যদিও। মজার ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। ‘অ্যালবিনো’ উপন্যাসের হাত ধরে মনে মনে আমি চলে এসেছি মুলিমালোয়াঁ বলে একটা জায়গায়। সেটা কোথায়? হাজারিবাগ জেলায়। অর্থাৎ আবার ঝাড়খণ্ড। আবার পালামৌ।

‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’ আর কিছুদিন পরেই ‘কাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ এই নামে বড়পর্দায় আসবে। সুন্দর সমাপতন— নেপথ্যগানে এখানেও ব্যবহৃত হয়েছে আমার কণ্ঠ। আর পরিচালককে আপনারা চাইলে ‘ঋজুদা’ বলে ডাকতেই পারেন। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ডাকনাম সত্যিই যে ঋজু।

শেষ আপডেট:
সব ছুটিরই শেষ থাকে। আমি বাড়ি ফিরছি। আবার গানবাজনা আমায় ডাকছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ভাষা দিবসে, রাত ৮:৩০-এ আবার ফিরবে অনলাইন রূপম ইসলাম একক। ফের গান গাইব। কী গাইব— জানি না। কেন গাইব— জানি।

অডিটোরিয়াম খুলে গেছে। তবে এখনও সেভাবে না। দু’টি আসনের মাঝখানে থাকছে ফাঁকা আসন। আমি ঠিক এইভাবে একক করতে চাইছি না। আমি চাই আমার একক-শ্রোতারা পরস্পরের কাছাকাছি থাকুন।

তাই এ যাত্রায় অনলাইনেই দ্যাখা হোক।

 

প্রচ্ছদ ও ছবি: অন্তরূপ চক্রবর্তী

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive লিখছেন রূপম ইসলাম