সৌভিক কথা, পর্ব ৩

সৌভিক কথা, পর্ব ৩

আমার ধারণা, বাঙালিদের মতো ফেসবুককে এরকম আড্ডা এবং খিল্লি করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আর কোনও কমিউনিটি ব্যবহার করে উঠতে পারেনি; এ যেন পুরনো পাড়ার রক, যেখানে ছেলে-বুড়ো সবাই রাতদিন বসে গুলতানি মারছে, খেলা-রাজনীতি-কবিতা-সাহিত্য-সিনেমা নিয়ে তুলকালাম করছে, পথচলতি হালকা তরুনীকে ‘লাইক’ মেরে আলতো শিস দিয়ে উঠছে, তরুনীটিও কপট রাগে পেছন ফিরে নিজের নতুন সালোয়ার ভাসিয়ে দিচ্ছে ফটোশপচিত টাইমলাইনে, এ ওকে খিস্তি করছে, ও ওখানে দল পাকাচ্ছে , সে ওদিকে পিনকি মারছে , আরও সব কারা ইনবক্সে ছেনালিময় মেসেজ দিয়েই চলেছে তবু পাখি সেদিকে ভেড়ে না; দুর্গাপুজো থেকে রবীন্দ্রনাথ, পাইকপাড়া থেকে ভুবনডাঙ্গা , উত্তমকুমার থেকে স্বপনকুমার, কচুশাক থেকে চিকেন টেট্রাজিনি, মেসি থেকে মালদিনি― বাঙালি ফেসবুকে যে অদ্ভুত ব্যাপ্তিময়তা ছুঁতে পেরেছে, আমার সত্যিই ধারণা তা আর কেউ পারেনি, কারণ ল্যাদখোর ও আড্ডাপ্রিয় এবং আর্ট-কালচার-আক্রান্ত ফ্রেঞ্চ ও স্প্যানিশদের মাথায় রেখেও বলা যায়, যে অন্য কোনও জাতি-প্রজাতির জীবন-চলন-যাপন-ইতিহাসে এত মশলা, রস বা রসদ নেই, অন্যদের এত সময়ও নেই, তাই ট্রামলাইন আর টাইমলাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র বাঙালিই পেরেছে ফেসবুককে একটি জীবন্ত বিশ্ব-পাড়া করে তুলতে।


এক মোহময়ী মহিলা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন আর আমিও ন্যাচারালি, সেই বন্ধু-অনুরোধে সাড়া না দেবার মত ধৃষ্টতা দেখাতে পারিনি; তারপরই দেখি উনি আমার কবিতা ও পোস্টে ঘনঘন ‘লাইক’ দেন , কিন্তু কোনও কমেন্ট করেন না― অনেকটা “চোখে চোখে কথা বলো, মুখে কিছু….” গানটার মতো আর কী। ‘লাইক’-এর প্রশ্রয় পেয়ে আমিও ওনার এলবামে ঢুকে পড়ি একদিন। তাঁর চাঁদপানা মুখের কয়েকটি ছবিতে ‘লাইক’ দিয়ে পালিয়ে আসি, তারপরেই উনি, ইনবক্সে― “আপনি আমার ছবিতে লাইক দিলেন কেন?”
আমি― “না মানে…”
―…”না মানে , মানেটা কী…আপনার সাহস তো কম নয়, আপনি আমার ছবিতে লাইক দেন !” আমি একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম― “কেন আপনার ছবিতে লাইক দেওয়া বারণ ? আপনি তাহলে কেন আমার কবিতা-টবিতায় সমানে লাইক দিয়ে চলেছেন ? আর তা ছাড়া , এরকম কথা ফেসবুকে কোনওদিন শুনিনি যে ওপেন প্রোফাইলের ছবিতে লাইক দেওয়া যাবে না ! অনেকেই তো দেখলাম আপনার অনেক ছবিতে লাইক দিয়েছে, আমার বেলায় এ রকম অদ্ভুত প্রশ্ন কেন?”
উনি লালমুখো ইমোটিকন সহযোগে লিখলেন― “আমার ছবিতে অন্যরা লাইক দিলে আপনার কী? অন্যরা যা করছে আপনিও তাই করবেন? আর আমি কি করব না করব আমি বুঝে নেব; আমার কবিতা ভাল লাগে, তাই আপনার ওইসবে লাইক দিই, বেশ করি। কিন্তু আপনি অচেনা মহিলার ছবিতে এইভাবে লাইক দিয়ে দিলেন?! আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে , নইলে আমি অ্যাকশন নেব ….ক্ষমা চান, শিগগিরই ক্ষমা চান, নইলে বিপদে পড়ে যাবেন….”
আমি― “ক্ষমা ?! কেন ? কী আনন্দে ? যা করার করে নিন। ছবিতে সামান্য লাইক দেবার জন্যে যদি ক্ষমা চাইতে হয় জীবনে, তাহলে প্রতি মুহূর্তে শ্বাস নেবার জন্যেও চাইতে হবে।”
মহিলা লিখলেন – “তিন গুনবো তার মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে ….”
আমি― “আরে মহা মুশকিল! কেন ক্ষমা চাইব রে বাবা ?”
উনি লিখলেন – “কারণ আপনি ‘লাইক’ দিয়েছেন। ‘লাভ’ দেননি। পরেরবার ঠিক বোতামটা টিপবেন … ”

অনেক মহিলা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান, আমিও তাঁদের প্রোফাইল একটু এদিক ওদিক ঘেঁটে , তাঁদের মানচিত্র দেখে নিয়ে, আর একজন কবিতার পাঠক পাওয়া গেল ভেবে, মোটামুটি অ্যাকসেপ্ট করে নিই। কিছুদিন পরেই একটি পুরুষ রিকোয়েস্ট পাঠান, তাঁর থোবড়া দেখে মনে হয় – কোথায় যেন দেখেছি ! সেই পুঙ্গবের প্রোফাইলে গিয়ে দেখি তিনি ওই মহিলার বয়ফ্রেন্ড বা পতিদেব; এবং দুজনের জলকেলির দৃশ্য আমি ওই মহিলার এলবামে দেখেছি তাই চেনা-চেনা। তাঁর আশঙ্কাকে সম্মান জানিয়ে তাঁকেও বন্ধু-তালিকায় প্রবেশাধিকার দিই। তারপরে দুজনে কেউই আর কথা বলেন না, কে জানে কেন ! গোটা ব্যাপারটাই কেমন দুর্বোধ্য কবিতার মত হয়ে যায় ….
কফিশপে বসে থাকতে থাকতে এখন হঠাৎ কাউকে দেখে মনে হয়― আরে কোথায় যেন, কোথায় যেন একে দেখেছি, কোথায় , কবে, কেন….তারপরেই বুঝতে পারি, ওহো, এ আমার ফেসবুকীয় বন্ধু-অনুভূতি ! এ আমার ফ্রেন্ড-লিস্টে আছে, মাঝে মধ্যে একটা-দুটো টুকরো কথাও হয়েছে বোধহয় , এদিক-ওদিক লাইকগলিতে আনাগোনাও ঘটেছে হয়ত কখনও। সে তাকায়, আমিও তাকাই , কোনাকুনি টেবিল থেকে শব্দ আর উড়ে গিয়ে পড়ে না সেই টেবিলে; রিয়েলিটি আর ভার্চুয়ালিটির নিঃশব্দ লড়াইয়ে হেরে গিয়ে শেষমেষ আলাপ-পরিচয় হেঁটে যায় মূক-করিডরে। কথা হয় তারপর, ফেসবুকে― “আপনিই আজ না…ওই কোনের টেবিলে ? কথা বললেন না কেন..” ইত্যাদি, ইত্যাদি, স্মাইলি, স্মাইলি, অনর্থক চ্যাট-জানলা কিছুক্ষণ। ভার্চুয়াল আর রিয়েলের মধ্যে এই যে দেওয়াল, তার গায়ে নিঃসঙ্গতার পোস্টার মেরে লুকিয়ে পড়ে শহর।
অনেকে আছে, ফেসবুকে কবিতা পোস্ট করলে, বা কোনও পোস্ট লিখলে, সেখানে লাইক, লাভ , অট্টহাস্য বা কমেন্ট করে; ইনবক্সে অবলীলায় সেঁদিয়ে পরপর মিসাইলের মত মেসেজ পাঠায় , কিন্তু কোনও কবিতাসভা বা অন্য কোথাও দেখা হয়ে গেলে, সামনে আর কিছু বলে না , সামনা-সামনি তারা নিশ্চুপ নীল তারা , হিমালয়ের গুহায় বসে থাকা রহস্যময় মৌনী বাবা কিংবা মুচকি হাসির আনসলভড মোনালিসা। তারপর আবার ফেসবুকে, কথা, টুকি, উঁকি। এটা কেন ? ভার্চুয়ালিটি আর রিয়েলিটির মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব , নাকি অন্য কোনো মায়াবী রডোডেনড্রন ? কিংবা , একটু সেমি-একাডেমিক-“সোশ্যাল মিডিয়া কি আদতে আমাদের লেস কনফিডেন্ট করে দিচ্ছে ?” এই আড়ালে কথকতা আর সামনে নো-কথা আমার ইয়ে একটু জ্বালিয়ে দেয় , বলতে দ্বিধা নেই। যদি কেউ প্রশ্ন করে, তুমিই নিজে থেকে কথা বলো না কেন, তাহলে বলব, চিনতি পারলে, বলি, কত্তা , বলি। তবে চোখে চোখ পড়লে কেউ যদি লজ্জাবতী লতার মত ওদিক পানে তাকায় , তাহলে আর কই না , যদিও জানি এই লতাই একটু পরে ইনবক্সে -“কী খবর ?” লিখে চারটে স্মাইলি দেবে। বয়স হচ্ছে, আর এসব আজব নিমকি ছেনালি পোষায় না …
ফেসবুকে কেউ আপনার পোস্ট, বা ছবিতে ‘লাইক’ দিল মানে সে আপনাকে লাইক করে তা নয় , সে আপনার পোস্ট , বক্তব্য , কবিতা, বা ছবিটিকে ‘লাইক’ করল মাত্র ; এখন আবার আরেকটা নতুন অপশন এসেছে – ‘লাভ’ সাইন, কেউ আপনার পোস্টে ওই লাল হৃদয় মেরে দিল মানেও কিন্তু সে আপনাকে হৃদয় দিয়ে দিল বা অন্য কিছু দিল, তা নয় ভাইসকল, তার মানে শুধু সে আপনার পোস্টটিকে ‘লাভ’ করল , আর কিছু নয় ; ছবি মানে আপনি নন, আপনি মানে ছবি নন, ছবি মানে ছবি, আপনি মানে আপনি, যদিও সেটা কে তা অনন্ত ছায়ালোকে লেখা থাকে , রিয়ালিটি মানে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি নয়, যদিও রিয়ালিটি মানেও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার হাসি কিনা, তাও কেউ জানে না; সুতরাং এই ধুলো-বালি-ছাই অস্তিত্ব বা না-অস্তিত্ব নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে টুক করে ওই প্রজাপতির সিকিম-ভ্রমণের ছবির নীচে কিংবা বন-বাংলোর বারান্দায় মেলে দেওয়া চুলে দিয়ে দিন একটি খাপখোলা ‘লাইক’ বা ‘লাভ’ !
কিছু কিছু লোক আছে, ফেসবুকে ফ্রেন্ড লিস্টে নেই, অথবা আছে কিন্তু কোনওদিন কথা হয়নি, হয় না; কোনওদিন কোনও পোস্টে, কবিতায় বা ছবিতে কোনও কমেন্ট করেনি, লাইক দেয়নি, হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাও দেয়নি , অট্টহাস্য ছুঁড়ে দেয়নি, দুঃখ দেখায়নি বা ক্রোধে ফেটে পড়েনি ; কিছুই যে করেনি বা বলেনি, তাতে আফসোস নেই, মেঘের আড়ালে মেঘনাদ হলেই যে সে মগনলাল মেঘরাজ― এই সরলীকরণেও আমি বিশ্বাস করি না , কিন্তু এদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে, যারা আমার কোনও পোস্টে অন্য কেউ কোনও বিরূপ মন্তব্য বা খিস্তিরঙের কমেন্ট করলে, সেই কমেন্টে ছোট্ট করে লাইক বা লাভ গুঁজে আবার কুম্ভের মেলার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে। সবুজ চোখওয়ালা এইসব আজব সিক্রেট এজেন্টদের চিহ্নিত করেছি, তাদের এই মধুর ভালোবাসার কারণ জানতে খুব ইচ্ছে হয় ….

প্রচ্ছদ : ত্রিনাথ মজুমদার

 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive সৌভিক কথা