আমাদের অধিকার ― ১

আমাদের অধিকার ― ১

শুরুর কথা

কোন অধিকারে আমরা নাট্যচর্চা করি? কেন করি? আমাদের এসব করবার কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে কি? আমরা এমন এক মফঃস্বল-উপনগরীতে জন্মেছি যেখানে না চেনে কেউ আমাদের বাপ মা কে, না চেনে কেউ এই গ্রাম বা আজকে হয়ে উঠতে চাওয়া নকল-নগরকে। ইদানিং ভূগর্ভস্থ তেল পাওয়ার পর অবশ্য এই নগরকে তৈলাক্ত করবার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে বটে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে। সেকথা পরে হবে বিশদে।
কিন্তু ভানুর (বন্দ্যোপাধ্যায়) সেই সাহেবের মতো আমরা তো আর কথায় কথায় গ্রামের নাম পাল্টে ফেলতে পারব না। তাই এখন মনে হয়, এই মধ্যবয়সে পৌঁছে মনে হয় আমাদের বড় হয়ে ওঠবার মধ্যে, শুধু শিল্পী  হয়ে বাঁচব এই তাগিদ এবং তুলনায় নানাবিধ কম তাগিদের মধ্যে হয়তো একরকমের অন্যায় অধিকারের বীজ রোপিত হয়ে আছে। কিন্তু শুধু ঝাণ্ডা না ধরে, কলেজ রাজনীতির গ্রীনরুমে ভিড় না করে শিল্প তথা নাট্যচর্চয়ায় যে উন্মাদের মতো অনধিকার প্রবেশ করেছিলাম তা কী করে অধিকার হয়ে উঠল তার ছাপোষা কিছু গল্প শোনাব। যেখানে কোনও বিদেশি বা দেশি লেখকের, শিল্পীর জীবনের বড় বড় রেফারেন্স নেই। নেই কোনও উচ্চবিত্ত নগর-যাপনের সালতামামি। কিন্তু এক নদীহীন উদ্বাস্তু উপনগরীর বেড়ে ওঠা আছে। পাল্টে যাওয়া আছে। প্রেম অপ্রেমের বোমা-গুলি-বারুদের একটা সেন্ট চৈতন্য কলেজ আছে। ছেলেদের কলজে হয়ে ওঠা একটা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ে তার নীল শাড়ি পড়া এক সমুদ্র ছাত্রী আছে। একটা বানীপিঠ বালিকা বিদ্যালয় আছে। এসব পেরিয়ে ডিঙিয়ে আমরা বেড়েছি! শিখেছি। পাড়ার সরস্বতী পুজো, একসঙ্গে চাঁদা কাটতে যাওয়া শিখিয়েছে সময়ানুবর্তিতা, বলে দিয়েছে সংঘ তৈরির প্রাথমিক খসড়া। বিয়ে বাড়ি, পৈতে বাড়ি  শিখিয়েছে পঙক্তি ভোজন থেকে বাজার করা, কার্ড ডিজাইন অথবা একসঙ্গে দূর দূর যাবার মজা এবং বালতি হাতে পরিবেশন। কে কখন খাবে কার কখন খেতে হবে সেই নিকেশ !!! এবং একটা যৌথ পরিবার শিখিয়েছিল একসাথে বাঁচা,খাওয়া এবং ঘুম…সর্বোপরি সুনির্মল বসু তো ছিলেনই― “আকাশ আমায় শিক্ষা দিল, উদার হতে ভাই রে/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে/পাহাড় শেখায় তাহার সমান হই যেন ভাই মৌন মহান”…এই আমার ন্যাশনাল লাইব্রেরী এই আমার ব্রডওয়ে…আমার অ্যাম্ফিথিয়েটার…সেইসব বেড়ে ওঠবার কালে নানা ঘটনা, নানা ইশারা, বিবিধ আনন্দ, রৈখিক যাপন, অন্য জীবনকে অথবা কিছু ক্ষেত্রে নানান মহাজীবনকে দেখবার একধরনের নিজস্ব, স্বোপার্জিত দৃষ্টিভঙ্গি আসলে এই সাদা পাতা ভরে যাবার নিজস্ব দোয়াত, এখানে কালি-কলম সময়। আমার সময়, আমাদের যাপিত সময়…তবে বলে নেওয়া ভাল শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে সরাসরি বা খানিক চোরা স্রোতের মতো কবি জীবন,গায়ক জীবন, চিত্রীর জীবন থেকে গ্রাম সভ্যতা রুচির এবং তার সঙ্গে চলন্ত নানাবিধ দৃশ্যরাজি এসেছে বা আসবে এই অধিকারপর্বে। প্রসঙ্গত, এই ফেলে আসা পথে নজর করলে দেখতে পাই এই উন্মাদনা-প্রিয় জীবনের খোলসে কেটে গেছে আমাদের বহু শীতকাল। নভেন্দু সেন থেকে মোহিত চট্টোপাধ্যায় হয়ে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাত্য বসু এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ অব্দি আমাদের মুকুট আমরা কবিতার চরণে রেখেই তৃপ্ত হয়েছি…বারবার। আসলে নাট্যের উৎস তো কবিতা থেকেই। উইলিয়াম শেক্সপিয়র থেকে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবধি সকল কবিই তো নাট্যকার এবং এমন নাট্যকার যাঁদের নাটক যুগ-কাল ভেদে এক চিরকালীন সত্য অথবা মুক্তি বা সমাজ-রাজনীতির এমন কিছু দিক নির্দেশ করে গেছে যা বহমান মানব সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকবে। সময়ের মোড়ক বদলে যাবে কিন্তু ভিতরের হর্ষ-বিষাদ, ক্লেদ-ভেদ, গ্লানি-উন্নাসিকতা, জাত-রাজনীতি এসব থেকে যাবে নিজস্ব নিয়মে। কোনও এক অপার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব কবিদের নাট্যরচনা তাই আজকেও প্রাসঙ্গিক। এ প্রসঙ্গে নিশ্চয়ই বলতে হয় বার্টোল্ট ব্রেখট থেকে আমাদের বাদল সরকারের কথাও। আজও সারাবছর যত নাট্যদল এই গোলার্ধে এইসব কবিদের নাটক অভিনয় করেন তা যেকোনও নতুন নাট্যকারদের কাছে ঈর্ষনীয়, ফলত কবিতা ও নাটক সেই জন্মলগ্ন থেকেই ভাষার ক্ষেত্রে চলনের সূত্রে হাত ধরে চলেছে; নিজেরাই নিজেদের বেঁধেছে বন্ধুত্বের হাতকড়ায়…

 

প্রচ্ছদ : ত্রিনাথ মজুমদার

শেয়ার করুন

0Shares
0
আমাদের অধিকার যুগান্তর সাপ্তাহিক