আজ বাংলা ও বাঙালির দিন

আজ বাংলা ও বাঙালির দিন

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে যুগান্তরের বিশেষ প্রতিবেদন লিখলেন অনন্যা মাইতি। 

 

আজ বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর দিন।
আজ বাঙালির হার না মানার দিন।
আজ বাঙালির অনমনীয় আত্মমর্যাদার উদযাপনের দিন।
আজ বাঙালির স্বাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার দিন।
আজ বাঙালির একুশের দিন।

১৯৪৭-এর পর পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষি বাঙালির অনুভূতি এরকমই ছিল― বাঙালি এক ক্ষমতালিপ্সু শোষকের শাসন থেকে আর এক আগ্রাসী শোষকের ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে পড়েছে অজান্তেই। তাদের আজন্মলালিত মায়ের ভাষা বাংলার ঐতিহ্য বিস্মৃত হয়ে আপন করে নিতে হবে উর্দুকে। ছোটখাটো বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই। কেবলমাত্র প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ভাষার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য মাতৃভাষার সম্মানরক্ষার্থে নবজন্ম হল জব্বার, বরকত, সালাম, রফিকের।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। সকাল ৯টা থেকে নিরস্ত্র ছাত্রছাত্রীরা ছোট ছোট দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে এবং পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণ জনগনের মতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানায়।

সশস্ত্র পুলিশ সভাস্থলের চারদিকে বেষ্টনী রচনা করে। বেলা সোয়া এগারোটার দিকে ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গেটে জড়ো হয়ে ব্যারিকেড ভেঙে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে চাইলে পুলিশ কাদাঁনে গ্যাস ছুঁড়ে ছাত্রদের দমন করতে চায়।
কিছু ছাত্র এই সময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে দৌড়ে চলে যায়। বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী বাকি
ছাত্রদের  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পুলিশ অবরুদ্ধ করে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ বন্ধ করতে এবং ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগ করতে বলে। তারপর পুলিশ তাদের বন্দী করা শুরু করে। অনেক ছাত্রদের বন্দী করে তেজগাঁও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এই ঘটনায় ছাত্ররা আরও ক্ষুদ্ধ হয়ে তাদের কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু করে। চারিদিকে এক অসহিষ্ণু ও হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বেলা দু’টো নাগাদ আইন পরিষদের সদস্যরা আইনসভায় যোগ দিতে এলে ছাত্ররা তাদের বাধা দেয় এবং আইনসভায় তাদের দাবি উত্থাপনের দাবি জানায়।

কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয় যখন কিছু ছাত্র সিদ্ধান্ত নেয় তারা আইন সভায় উপস্থিত হয়ে তাদের দাবি উত্থাপন করবে। ছাত্রদের সেই উদ্দেশ্যভঙ্গের জন্য বেলা তিনটের দিকে পুলিশ ছাত্রাবাসে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলস্বরূপ, কিছু ছাত্রকে ছাত্রাবাসের বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখা যায় রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল, জব্বার ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আবুল, বরকত সে সময় আহত হন এবং রাত আটটায় মারা যান। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ভাষা শহীদ হন বাংলা মায়ের বাঙালি সন্তান রফিক উদ্দিন আহমেদ। শহীদদের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা দেখে আতঙ্কিত পুলিশ রাতের অন্ধকারে তাঁদের কবরস্থ করে।

ছাত্রহত্যার সংবাদ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থল জনারণ্যে পরিণত হয়। সমস্ত অফিস, দোকানপাট ও পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র-আন্দোলন গণ-আন্দোলনের পরিণতি পায়।

‘ভেতো’ বলে বাঙালির দুর্নাম আছে। তারা অলস, তারা অকর্মণ্য, তারা অপদার্থ, তারা সুবিধাবাদী। তাহলে কী এমন হল যে তারাই আবার স্বৈরাচারী পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়াল? তাও শুধু একটা ভাষার জন্য ! এও হয়? সেদিন ঢাকার রাজপথে যদি ঐ মর্মান্তিক ঘটনা না ঘটতো, ভারতবর্ষের অনেক উপাভাষার মতো বাংলাও একদিন কালের অতলে তলিয়ে যেত।

ভাষা মানুষের ভাবের বাহক। সে যে কাঁটাতারের ওপারেই থাকুক। মাতৃভাষার শক্তি যখন কমে আসে, সংস্কৃতির অবক্ষয় সেদিনই শুরু হয়। বিদেশি ভাষা চর্চা করা অপরাধ নয় তবে, মাতৃভাষার চর্চাহীনতা অপরাধ তো বটেই। বাংলা ভাষাচর্চা  কিছু বাঙালির বিরক্তির কারণ, কারণ বাংলা ভাষা অনাভিজাত্যের প্রতীক― ঠিক যেন ‘এলিট’ নয়। তাই মাতৃভাষাটা যেন ‘ঐচ্ছিক’ বিষয়ভুক্ত।

দামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে না পড়াতে পারা লজ্জিত বাবা মায়েরা যদি জানতো কীসের বিনিময়ে আজ তারা মাতৃভাষাকে অসম্মান করার সুযোগ পাচ্ছে, তাহলে মনে হয় তারা এতটা নিষ্ঠুর হতে পারত না। বিদেশি ভাষা শিখতে হলে মাতৃভাষাকে অবহেলা করতে হবে, ‘জাতে’
উঠতে চাওয়ার  যুক্তিহীন এই আকাঙ্খা বাঙালি সংস্কৃতির শিকড়কে সমূলে উৎপাটিত করার এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি লাঞ্ছিত মাতৃভাষার সম্মান পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে এদেশের আপামর ছাত্রসমাজ বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে যে মূল্য চুকিয়েছে তার গণ্ডি শুধু তো দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাষার সম্মানে বাঙালির রক্তঝরা ইতিহাস সমগ্র পৃথিবীকে আজ নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে মাতৃভাষার মর্যাদা।

বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরার প্রায় একত্রিশ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। বর্তমান বাংলা মাতৃভাষিকের সংখ্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার সমান, পুরো ইউরোপ মহাদেশের জনসংখ্যার প্রায় সমান। চিনা, স্পেনীয়, ইংরেজি, আরবি ও হিন্দির পরেই বাংলা ভাষার স্থান। পৃথিবীব্যাপী তিরিশটি দেশের প্রায় একশোটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা এবং গবেষণা করে। বিশ্বের ছয়টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল আছে। দশটি দেশের রেডিওতে বাংলা ভাষার অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। ব্রিটেনে ছয়টি এবং আমেরিকায় দশটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল আছে। ইতালিতে পাঁচটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা এবং রোম ও ভেনিসে তিনটি বাংলা রেডিও স্টেশন আছে। দেশ, কাল, সীমানার ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা এখন বিশ্বভাষা।

কালের পরিবর্তনে বাংলাভাষার লড়াই দেশ ও জাতির সীমানা অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ আজকের দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’এর সম্মান দিয়েছে। ১৯৫২-এর একুশের শহিদেরা হয়ে উঠেছেন বিশ্বের প্রতিটি দুঃখিনী বর্ণমালার অতন্দ্র প্রহরী। ভাষার জন্য বাংলাভাষীদের আত্মত্যাগ সর্বদেশের সর্বকালের অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। বাঙালির নিজের রক্তের বিনিময়ে অপহৃত অক্ষরমালা সাজিয়ে তোলার দিন আজ ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ ব্যতিরেকে যার বিশ্বজোড়া অস্তিত্ব সমগ্র বাঙালি জাতির গর্বের মূলধন।

“একুশ আমার চেতনা একুশ আমার গর্ব” কেবলমাত্র বাংলা ভাষা নয়, আজ পৃথিবীর সমস্ত ভাষার অস্তিত্ব অক্ষুণ্ন রাখবার শপথ নেওয়ার দিন। মাতৃভাষাপ্রেমিক হিসেবে আজ বাঙালির অঙ্গীকারবদ্ধ হবার দিন, পৃথিবীর সমস্ত মাতৃভাষা সমৃদ্ধ হোক। মাতৃভাষা লজ্জা নয়, অহঙ্কার হোক। মাতৃভাষা সংস্কার নয় সংস্কৃতি হোক। যে ভাষায়ই হোক, গানের অর্থ হোক,
“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে..
সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।”

শেয়ার করুন

0Shares
0
সংস্কৃতি সাম্প্রতিক