ভারতীয় সূচি এবং বয়নশিল্প― অতিমারীর আগে ও পরে

ভারতীয় সূচি এবং বয়নশিল্প― অতিমারীর আগে ও পরে

অনন্যা মাইতি: জমকালো পোশাক এবং কারুকার্যখচিত গয়না ভারতবর্ষের মতো সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। অন্যান্য শিল্পের মতো এই শিল্পগুলিও কোভিড ১৯ এর প্রাদুর্ভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২০-এর শুরুতে ব্যবসায়িক ক্ষেত্র যে আশার আলো দেখিয়েছিল, অতিমারী তার সবকিছু বদলে দিয়েছে।

কয়েক হাজার বছর যাবৎ রাজা মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষতায় ভারতবর্ষে বয়ন এবং সূচিশিল্প অনুশীলিত হয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাস নাড়াচাড়া করলে দেখা যাবে, শুধুমাত্র রাজমর্যাদা রক্ষার জন্য তৈরি করা অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল পোশাক এবং শাড়ি যা বিশ্ব ইতিহাসে সর্বদা তাঁদের ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। রাজা ও মন্দিরগুলির পৃষ্ঠপোষকতায় কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে হস্তনির্মিত শৈল্পিক পোশাক আশাকের ওপর ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। যদিও এগুলি সাধারণ জনগনের ধরাছোঁয়ার বাইরে তবুও শিল্প এবং ঐতিহ্যগত দিক থেকে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

শুধু  রাজা মহারাজা নয় সাধারণের ব্যবহৃত শাড়ী গহনাও আজ বিপত্তির মুখে। বিষ্ণুপুরের তসর, মুর্শিদাবাদের সিল্ক, শান্তিপুরের হ্যান্ডলুম, ধনেখালির তাঁত, শান্তিনিকেতনী কাঁথাস্টিচ, ফুলিয়ার জামদানী, আসামের মুগা রেশম, ওড়িশার সম্বলপুরী, মহারাষ্ট্রের কাস্তা, লখনৌয়ের চিকন, অন্ধ্রপ্রদেশের মঙ্গলগিরি, কর্নাটকের মাইসোর সিল্ক, তামিলনাড়ুর কাঞ্জিভরম, বেনারসের বেনারসি, গুজরাটের পটোলা, রাজস্থানের বাঁধনি, মধ্যপ্রদেশের চান্দেরি আরও কত কী .!!

গয়নার ক্ষেত্রেও ভারতবর্ষ  বৈচিত্র্যের দাবি রাখে। কণ্ঠহার, সীতাহার, চন্দ্রহার, বিছাহার, কানপাশা, কানের দুল, টিকলি, নাকছাবি, নথ, নোলক, চুড়ি, বাউটি, কাঁকন, চূর, মানতাসা, আংটি, কোমরবন্ধনী। আরও কত কী! এছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক অলঙ্কার তো আছেই।

সব মিলিয়ে ভারতবর্ষের ‘নানা ভাষা, নানা মত’ এর মতো ‘নানা পরিধান’ বিশ্ব ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য।

প্রাচ্য পাশ্চাত্যকে অনুকরণ ও অনুসরণ করে― এটাই রীতি। কিন্তু একথা সবাই স্বীকার করে যে, জৌলুসপূর্ণ ভারতীয় পোশাক ও গহনার সম্ভার সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো।
এত আড়ম্বর, এত চাকচিক্য, এত শৌখিনতা আর কোথায়! যুগের সাথে পরিধানের রকমফের ঘটেছে, ঐতিহ্য প্রবাহিত হয়েছে। এই প্রাচ্যের পোশাকই পশ্চিমা বিশ্বে তুমুল আলোড়ন ফেলেছে। গত পাঁচ দশকে বিখ্যাত বহুজাতিক সংস্থাগুলি বহু ইউরোপীয় ফ্যাশন হাউস কিনে নিয়েছে যারা একের পর এক অত্যন্ত ব্যতিক্রমী কাজের মাধ্যমে বিশ্ব ফ্যাশনের শীর্ষে পৌঁছে গেছে। বিপণনের কৌশলগত দিকটিকে মাথায় রেখে উৎপাদিত দ্রব্যগুলি পুরোপুরি  হস্তনির্মাণের বদলে প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
মহামারী-পরবর্তী বিশ্বে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত-নির্মিত বিলাসবহুল সামগ্রীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। ভারতবর্ষে কমপক্ষে ১৬ লক্ষ কারিগর রয়েছেন যাদের কাজের কদর দেওয়া হয় না কারণ তাঁদের কাজ প্রদর্শিত হয় না। ভারতীয় বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রী উৎপাদক শিল্পীরা পুরুষানুক্রমে বেশিরভাগই গ্রাম্য পরিবেশের মানুষ। শিল্পীদের এই পরিশ্রম এবং সৃজনশীলতা ভারতীয় হস্তশিল্পের প্রাণভোমরা। তা সত্বেও অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ভারতবর্ষের হস্তশিল্প এখনো ” অসংগঠিত ক্ষেত্র ” হিসেবেই পরিগণিত।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, ব্যাঙ্ক ঋণ এবং সরকারী আর্থিক আনুকূল্য ব্যতীত এই শিল্পী ও কলাকুশলীরা কোনও দিক থেকে সাহায্য বা সহানুভূতি পায় না।হস্তনির্মিত বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রী আমাদের চিরন্তন ঐতিহ্য এবং এগুলিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করার জন্য আমাদেরই  সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। শুধুমাত্র টেক্সটাইল মন্ত্রণালয়ের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
আমাদের টেক্সটাইল হেরিটেজ বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার অস্তিত্ব আশ্চর্যজনকভাবে টিকিয়ে রেখেছে। প্রথমে যখন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনোলজি থেকে ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনারদের প্রথম ব্যাচ বেরিয়ে এসেছিল তখন অত্যন্ত অল্প খরচ ও ব্যবস্থাপনায় তাঁদের সৃষ্টিগুলি প্রদর্শন করতে উৎসাহিত করা হয়েছিল।

বাণিজ্যিকভাবে পরিমিত হলেও ভারতীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি সারা দেশে ‘ফ্যাশন হাইপ’ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। রূপোলী পর্দাকে প্রভাবিত করা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত তার নিজস্ব আবেদন গড়ে তুলেছিল। বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে ফ্যাশানের জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী অত্যন্ত বিরলতম একটি ঘটনা।

মিডিয়ারা এই খবরটা পাওয়ামাত্রই তরুণ ডিজাইনারদের কাছ থেকে নতুন কালেকশানগুলি দেখার আনন্দে পুকলিত হয়ে উঠেছিল।
মহারাজদের সামন্ত শৈলীর অনুকরণে তৈরি গ্ল্যামারাস ওয়েডিং ড্রেস ভারতবর্ষের ফ্যাশন জগতের অন্যতম আকর্ষণ। বরাবরের মতোই ভারতের ফ্যাশন ডিজাইনাররা তাঁদের সাফল্যের শীর্ষে স্থানাধিকারী। বাঁধনি, কলামকারি, জারদৌসি, কাঁচ এমব্রয়ডারির মতো লোকশিল্প শুধুমাত্র ভারতবর্ষেরই ঐতিহ্য। হস্তনির্মিত পোশাকের অভূতপূর্ব সম্ভারে সুসজ্জিত সেই প্রদর্শনী সারা বিশ্বের ফ্যাশন-মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

এই মহামারীর আগে ভারতবর্ষের পোশাক শিল্প কৃষিকাজের থেকে কিছু কম সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করেছিল। সংখ্যাটা  ৪৫ মিলিয়ন মতো। গত বছর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে হস্তশিল্প রপ্তানি বছরে ২% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি ছিল ৩.৩৯ বিলিয়ন ডলার।

আজ আমাদের ঐতিহ্যমণ্ডিত হস্তশিল্প অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি। রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়েছে। নিত্যনৈমত্তিক চাহিদাও প্রায় শূন্য। এর ফলে বুনন, মুদ্রণ এবং সূচিশিল্পী সম্প্রদায়গুলিতে বেকারত্ব গ্রাস করেছে। এই শিল্পের ঋণগ্রস্ত কলাকুশলীরা হতাশায় ভুগছে। বেনারস এবং আরও অন্য জায়গার তাঁতি সম্প্রদায় ঋণের জন্য মধ্যস্থদের উপর নির্ভর করে। এইভাবে, তারা একটি দুষ্টচক্রের জালে আটকা পড়েছে যা তাদের মহা দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এমতাবস্থায় এই শিল্পে অনুঘটক হতে পারেন আমাদের ফ্যাশন ডিজাইনাররা। এই শিল্পের ওপর বহু মানুষ নির্ভরশীল। কত পরিবার শুধুমাত্র বস্ত্রশিল্পের ওপর ভিত্তি করে সংসার সংগ্রাম করে চলেছেন । প্রচুর ছোট ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে হস্তশিল্প অব্যাহত রাখার কিছুটা আশা এখনও রয়েছে। কিছুটা ব্যয় সঙ্কুচিত করে শিল্পদ্রব্য নির্মাণ করলে বিক্রীত মূল্যের পরিমাণ হ্রাস পাবে। মানুষের রুচিরও পরিবর্তন ঘটবে। ক্রেতার সাধ্যের মধ্যে সাধপূরণ না করতে পারলে শিল্পসামগ্রীর প্রতি তাদের আকৃষ্ট করা যাবে না। মূল্যহ্রাসের ফলে ক্রেতারা আবার  বেছে নেবে  সেই ক্লাসিক ডিজাইন, হাতে বোনা শাড়ি, খাঁটি সূচিকর্ম।

ভারতীয় পোশাকশিল্পে ‘ফ্যাশন রেনেসাঁ’ শুরু  হয়েছে। ডিজাইনাররা প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার শুরু করছেন। ডিজাইনার রোহিত বাল কালো গাজরের নির্যাসিত রঙ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন, যা উত্তর ভারতীয় পানীয় কাঞ্জি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি কাপড়ে একটি সুন্দর জাফরান রঙ এনে দেয়। ডিজাইনার রাকেশ ঠাকুর প্রাকৃতিক নীল রঙের ব্যবহার করছেন । ডিজাইনার ঋতু কুমার মাচিলিপট্টনমের কলমাকারী শিল্পীদের খুঁজছেন যাঁরা সূক্ষ্ম ফুল এঁকে সারা ইউরোপকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এভাবে ভারতে ফ্যাশন আরও প্রাকৃতিক এবং টেকসই হয়ে উঠবে।

আসল সমস্যা হল, ভারতীয় হস্তশিল্পের বিপণনে। টেক্সটাইল মন্ত্রক দেশের হস্তশিল্পের বিপণনকার্যে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্টার্ট-আপগুলি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় উপলব্ধ করতে হবে। এটুকু বিশ্বাস রাখা যায়, ভারতবর্ষের হস্তশিল্পের সমৃদ্ধ সম্ভার ভার্চুয়ালি বিক্রী করার জন্য তৃতীয়ব্যক্তি বা মিডলম্যানের প্রয়োজন পড়বে না। ওয়েবসাইটগুলি বিশ্বের দরবারে বিলাসবহুল ভারতীয় পণ্যগুলির ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। তারা নিমেষেই ক্রেতাদের সাথে বিক্রেতাদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে। এই পদক্ষেপ অবশ্যই হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ পুনর্জাগরিত করবে। আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা আমাদের দায়িত্ব। সমাধান তাই আমাদের বের করতে হবে। যে ভাবেই হোক, আমাদের হস্তশিল্পের গর্বিত অতীত ভুলে না গিয়ে ভবিষ্যতেও সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছনোর অঙ্গীকার করতে হবে।

শেয়ার করুন

0Shares
0
বিবিধ সাম্প্রতিক