আমাদের অধিকার ― ২

আমাদের অধিকার ― ২

এই প্রখর দাবদাহে, গ্রীষ্মের চরম উল্লাসে আমাদের কৈশোর কেটেছে পুকুরের সবজে ঘোলা জলে পিঠ ডুবিয়ে…ছিল বটে সেইসব মধ্যাহ্ন-কাল! ভলিবল পিঠে বেঁধে, টায়ারের মাঝে নিজেদের পুরে ফেলে এই আধা মফস্বলের কিছু প্রান্ত কৈশোর ঝাঁক বেঁধে পুকুর পার করত, একবার, দুবার…বারবার…পাশেপাশে কখনও কখনও চলত দাঁড়াস, কখনও কখনও জলঢোড়া। এরা আমাদের বন্ধুর মতো ছিল! কখনোই কোনও কামড় দেয়নি…বরং আমার কোনও কোনও বন্ধু তাদের ল্যাজ ধরে যতপরনাস্তি নানান অত্যাচার করেছে, হয়তো সেসব অত্যাচার এর নির্ঘাত ফলস্বরূপ আমাদের বালিশের নীচে এখন নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকে হিলহিলে কাল-কেউটে!

অবাক হচ্ছেন? আজকে রাতে বালিশ তুলে দেখুন এই বাংলায় যাঁরা নিজেদের মতো করে স্বাধীন পরিসরে নাচ, গান, নাটক ,কবিতা, লেখালিখি করতে চেয়েছেন, তা-ই নিয়েই কাটিয়ে দিতে চেয়েছেন তাদের বালিশের তলায় বিধাতা পুরুষ সযত্নে রেখে দিয়েছেন কেউটে, গোখরো বা চন্দ্রবোড়া…কখনও কখনও সেসব সাপ চলে গেছে, হয়তো বা পড়ে থেকেছে দংশন-চিহ্ন…প্রবল ক্ষত। যা হোক আমাদের সেই দুপুর-পুকুরে একদিন ভেসে উঠল দেহ…আমি তখন সদ্য জয় গোস্বামী পড়ছি , ‘হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দার জলে’ এত দেহ ভেসে  উঠল…আমার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে…জল লাল হয়ে উঠছে…দুর্গা মায়ের মতো মুখ সেই দিদির, আজও মনে আছে আমার…সেই থেকেই মাথা যন্ত্রণা, বমি…ডার্ট, প্যারাসিটেমল সঙ্গী হয়ে গেল নাকি আমার??

ভিতরে ভিতরে গুনগুন করে উঠত আরও কিছুকাল পরে শোনা চন্দ্রবিন্দুর একটা গান, ‘কন্যা তোর জীবন ভোর সর্বনাশী’…সেইদিন, সেই ভয়াবহ দিনে এক বন্ধু বলল সন্ধে নামুক। তারপর যে এই পুকুরের জলে রুমাল ভিজিয়ে আনবে তাকে সে তাঁর ইলেকট্রনিক ঘড়ি দিয়ে দেবে…নিয়ে এলাম আমি। চোবানো রুমাল। পাশে পাশে যাচ্ছিল মনোরম…বলছে ‘আর কবে ঋ কার লিখতে শিখবি তুই?’ দিনগুলো থাকে সমুদ্রের তলায়…আমি জলে রুমাল ভিজাই…হাতে পেলুম টিকটিক শব্দওয়ালা ঘড়ি। আমি তখন বীরপুরুষ। ভয়ের বিরুদ্ধে যাবার সাহস ছিল আমাদের, সেই প্রখর সময়ের আঁচ, ভলির কোর্ট, ক্রিকেটের পিচ, ফুটবলের তেকাঠি আর ক্যারামের উপর জ্বলতে থাকা আলো সব মিলেমিশে উত্তপ্ত হয়ে ছিল…এসি ছিল না…ঝড় ছিল…বিদ্যুতের আলোয় ঝলসে ওঠা সেসব মাঠ ঘাট পুকুর কাদা কলোনী লোডশেডিং হেরিকেন…আর সাদা জুঁই এর মতো বৃষ্টি শেষের শিল তোলা,আম কুড়ানো আমাদের আজন্ম অধিকার…ফেসবুক হোয়াটসঅ‍্যাপকে ক্যাচকলা দেখিয়ে আমরা সেই অধিকারেই এক হই…গাছ কাটিস না…ওর ফোঁকড়, ওর ক্লোরোফিল, ওর ছায়া, ওর আশ্রয় আমাদের নিজস্ব জগতকে একরকম প্রশ্রয় দিয়ে পরশ দিয়ে বড় করেছে…মাথার তলার সাপ কিন্তু ফুঁসছে! ছোবল দেওয়া ওর অধিকার…আজও ঘরে সাপ ঢুকে পড়ে, ঢুকে পড়ে রিহার্সালের ঘরে। আমরা মারিনা, এরা তো ঢোঁড়া, হেলে। ভয় হলেও হয়তো মেরে ফেলবে না এরা, কিন্তু দুধ কলা দিয়ে পোষা যেসব কালসাপ…যাদেরকে ডেকে ডেকে এনে নাটক করতে শিখিয়েছি।
বুঝিয়েছি কাকে বলে কমিউনিকেশান?
কাকে বলে কথা বলা?
কাকে বলে স্বরক্ষেপ?
কে-ই বা রবীন্দ্রনাথ, কে-ই বা ব্রেশট? কম্পিউটার নামক বস্তুতে চোখ রাখতে দিয়েছি। এলোমেলো।হাতকে স্বস্তি দিয়েছি কিবোর্ডে। বুঝিয়েছি কাকে বলে থিয়েটার তাঁরা কিন্তু দঙ্গল বেঁধেছে। ঘর বেঁধেছে। কিন্তু আমারও তো শনি মঙ্গল আসে। আমাকেও তো উপড়ে ফেলতে হয় বিষদাঁত সব। মাঝে মাঝে আমাকেও তো ফুঁসে উঠতে হয়। সেটাও আমার অধিকার।

 

প্রচ্ছদ : ত্রিনাথ মজুমদার

ছবি : আলোকসজ্জা ও মহড়ায় লেখক
ছবি কৃতজ্ঞতা : লেখকের সহকর্মী বৃন্দ

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
আমাদের অধিকার যুগান্তর সাপ্তাহিক