অন্য একতারা — ৪

অন্য একতারা — ৪

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

রহস্য একটি অনিকেত যাত্রার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায় আমাদের। আদিম গুহাবাসী আগুনের মধ্যে দিয়ে সেই যাত্রার সূচনা করেছিল। তার ভাবনার অনন্ত ভুবন নিজের অগোচরেই তাকে বারবার টেনে নিয়ে গেছে উন্মোচনের সন্ধানে। জীবনে যতই সঞ্চয় থাকুক না কেন, কিছু মানুষ চৌচিরের পথ বেছে নেয়। কেন নেয়, সে এক রহস্য। একেকটি উন্মোচন আসলে এক একটি আলোক বিন্দু, অন্ধকারে জ্বলে থাকা নক্ষত্রের মতো। ভ্যান গঘের কথা মনে করি। চৌচিরের পথে উন্মোচনের এমন উদাহরণ আমাদের আশ্চর্যচকিত করে রাখে।

কদিন আগেই সন্তান স্পর্শচ্যূত এক পিতাকে  দেখলাম। অন্ধ ভিখারী সে। ট্রেনে ট্রেনে তার নিত্যদিনের যাতায়াত। মধ্যযৌবনা যে নারী তার দেহ ও সংসারের যষ্টি, তার নিজেরও একটি পা পোলিও রোগের প্রকোপে অতি দুর্বল, সরু, চিকন বাঁশের কাঠির মতো হয়ে এসেছে। কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসার পথে তার গান শুনতাম। প্রথম দিকে দুটি পাথরে তাল তুলে তুলে গাইত সে। গান জ্বলে উঠত চকমকির মতো। তারপর একদিন হঠাৎ বিরাটাকার শালগ্রাম শিলার মত একটা বাক্স গলায় ঝুলিয়ে সে উপস্থিত হল। মুখে অনাবিল হাসি। প্রশ্ন করলাম, “ওটা কী নিয়ে এসেছ কানাইদা? চলতে অসুবিধা হচ্ছে না?” কানাইদার  মুখে নিটোল সুখের ছায়া পড়ল। বলল, “ছেলে কিনে দেছে”। অন্ধ মানুষের হাসিতে একটা আশ্চর্য সারল্য থাকে। ঊষালগ্নের আলোর মতো নির্মল, পবিত্র। হয়তো সংসারের সব জটিলতা তার দৃষ্টিকে স্পর্শ করে না বলেই। হয়তো স্ব আরোপিত কোন সৌন্দর্যবর্ধক ভঙ্গি আবিষ্কার করার উপায় থাকে না বলে। সন্তানের ভালোবাসা তৃপ্তির ঐশ্বর্য দিয়েছে কানাইদার হাতে, ভেবে বড় ভাল লেগেছিল।


অন্ধ মানুষের হাসিতে একটা আশ্চর্য সারল্য থাকে। ঊষালগ্নের আলোর মতো নির্মল, পবিত্র। হয়তো সংসারের সব জটিলতা তার দৃষ্টিকে স্পর্শ করে না বলেই। হয়তো স্ব আরোপিত কোন সৌন্দর্যবর্ধক ভঙ্গি আবিষ্কার করার উপায় থাকে না বলে।
দুদিন আগে খবর পেলাম ,তার একমাত্র ছেলেটি অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছে। মাত্র তো চোদ্দো বছর বয়স । এত কীসের তাড়া ছিল তার? ভাবতে ভাবতেই চললাম কানাইদার বাড়ি। আমার স্কুলের গ্রামেই তার বাস। আমার সঙ্গে আমার কর্মজীবনের বন্ধু ইন্দ্রাণী। পাকা রাস্তা যেখানে ইটের রাস্তার দিকে হাত বাড়িয়েছে, সেই হাতটি ধরে চলতে চলতে দেখি সেখানকার গাছে-গাছে ঘাসে ঘাসে শোকের বুনন। সদ্যযৌবনা বসন্ত যেন মলিন নত মুখে এসে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির মুখে পাতা ঝরে আছে অজস্র। ইটের পাঁজর বের করা এক কামরার বাড়ির দাওয়ায় হাঁটুতে চিবুক ঠেকিয়ে বসে আছে কানাইদা। তাকে শীতাক্রান্ত বট গাছের মত দেখাচ্ছে। বিবর্ণ, ঝুরিসর্বস্ব, পত্রপুষ্পহীন।
কী কথা বলব তাকে? সান্ত্বনার ভাষা মুখে এল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম দুজনে। দেখলাম, একটু পরেই কানাইদা হাতড়ে হাতড়ে জানালা ধরে উঠে দাঁড়াল, হাত বাড়ালো টালির চালের দিকে। সেখানে তার ছেলের স্কুলের পোশাক গোঁজা আছে। চোখ যেন পুড়ে গেল আমার। কানাইদা ছেলের পোশাকের গায়ে হাত বোলাতে লাগল, মুখ গুঁজে রাখল কিছুক্ষণ। হয়তো ছেলের গন্ধটুকু নিল। একবার জোরে চিৎকার করে উঠল, “মানিক আমার!”
ব্যস। আর কোনও কথা নেই। ইটের দেওয়াল এর মতই নিশ্চুপ রক্তাক্ত মন নিয়ে বসে থাকল একা একা। উঠোনের একধারে গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা ফুল ফুটে আছে। শোকের সমুদগম যেন। কানাইদার বউকে কোথাও দেখলাম না। হয়তো ঘরের ভেতরেই পাথর হয়ে  বসে আছে, না হয় খাবারের সন্ধানে বেরিয়েছে একাই। শোক আর কতদিন ক্ষিদেকে চাপা দিয়ে রাখতে পারে।
কিছু না বলেই ফেরার পথ ধরলাম দুজনে। কানাইদা প্রায়ই একটা গান গাইত।
“জীবন ও মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
 বন্ধু হে আমার, রয়েছো দাঁড়ায়ে”
সেই সুর যেন সমস্ত পথটি জুড়ে বাজতে থাকলো নিঃশব্দে। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে কানাইদার সন্তান? রোদ্দুরের বিন্দু হয়ে,  বাতাসের ঝোঁক  হয়ে অনন্তের কোন স্তরে কোন সীমানায় সে দাঁড়ালো?তার ফেলে যাওয়া পার্থিবটুকুর মধ্যেই অপার্থিবের সন্ধান করছে কানাইদা। যার সন্ধান করছে, সে কি জানতে পেল আদৌ?পদ্মপাতায় জলবিন্দু জীবন আমাদের। এই ব্রহ্মাণ্ডের হিসেবে অতি তুচ্ছ ক্ষণকাল।  কানাইদার সন্তান তবে কতটুকু জীবন নিয়ে এসেছিল? কেনই বা? আমরাই বা কেন?
“শ্বোভাবা মর্তস্য যদন্তকৈতৎ, সর্বেন্দ্রিয়াণাং জরয়ন্তি তেজঃ
অপি সর্বং জীবিতমল্পমেব….” (কঠোপনিষদ)
নচিকেতা মৃত্যুকে বলেছিলেন, “আপনি আমাকে যা যা উপহার দিতে চেয়েছেন, তার সবটুকুই অস্থায়ী, অনিত্য।”  ভারতীয় দর্শন জীবনের অনিত্যতাকে বারবার উপস্থাপন করেছে গল্পের মোড়কে। কিন্তু দর্শনকে উপলব্ধি করা আর তাকে জীবনে প্রয়োগ করার মাঝখানে দিগন্ত রেখার মতো দাঁড়িয়ে থাকে বহুস্তরীয় মায়া। কানাইদাও জানে, তার সন্তান দেহের সীমানা ছাড়িয়ে অনন্তে বিলীন হয়ে গেছে। তবুও তার দেহস্পর্শটুকু ধরে রাখার কী আপ্রাণ চেষ্টা! সমস্ত পথটুকু নিঃশব্দে ফিরলাম আমরা। প্রকৃতিও নিঃশব্দ। অনিবার্যকে সম্মান দিতেই হয়তো। যে প্রশ্ন সেদিন আমার পিছু নিয়েছিল, তার নিঃশ্বাস পড়তে থাকলো আমার পিঠের উপর।
“Many  thunder time away
Birth-hour and death-hour meet”. ( poem “Mohini Chatterjee” by W. B. Yeats)
হয়তো তার অন্য কোথাও জন্ম নেওয়ার  তাড়া ছিল। পুনর্জন্ম কি আছে আদৌ? মানুষ ফুরিয়ে যেতে ভালোবাসে না। সে ভাবতে ভালবাসে, এক মৃত্যু অন্য জন্মের দিকে নিয়ে যায়। হয়তো যায়, হয়তো যায় না। এই রহস্য শেষের সেইদিন পর্যন্ত স্বমহিমায় অক্ষুন্ন থাকুক। সব রহস্যের সমাধান হতে নেই। খোঁজ ফুরিয়ে গেলে বাঁচার অর্থ কী?
উদ্দেশ্যহীন জীবনেরও কি অর্থ আছে কোনও? এইসব প্রশ্ন কোনও দেশ কাল ধর্মের সীমায় বাঁধা থাকে না। ধর্মের নামে হয়তো দেশকে বাঁধা যায়, ভাঙা যায়, কিন্তু দর্শন এসব ভাঙা-গড়ার অনেক ওপরে ভাস্বর হয়ে থাকে তার নিজের মহিমাটুকু নিয়ে। লেনার্ড কোহেন হিন্দু নন, ভারতীয় নন, অথচ তাঁর কবিতায় আমি ভারতীয় দর্শনের ছায়া দেখি। এলিয়টের কবিতা,ইটসের কবিতার সার্থক উত্তরসূরী হয়ে ওঠে কোহেনের কবিতা। যদিও আঙ্গিকে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘Did we come for nothing?’ নামে কোহেনের একটি কবিতা পড়লে মনে হবে, এ তো আমাদের কথা, আমাদের জিজ্ঞাসা, আমাদেরই ভাবনা প্রবাহ।
“এই সামান্যটুকুর জন্যেই কি এসেছি আমরা। অথচ আমরা কি ভেবেছিলাম? আমাদের মনে হয়েছিল- ওই রেস্তোরাঁর বয়স্ক ওয়েটার, পর্দার পিছনে থাকা গায়কের দল, সস্তার পুরোহিত-  আমরা সবাই আমন্ত্রিত, আহুত। নিজেদের এইসব বর্ণনার ভেতরেই  কি লুকিয়ে থাকব আমরা? আসা-যাওয়ার এই মানচিত্রের ভেতরে হারিয়ে যেতে দেব নিজেদের? আমাদের যত প্রার্থনা যেন পরচর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমাদের এই কর্মজীবন যেন জ্বলন্ত ঘাসজমি। প্রভাবশালীর দাপটে বদলে যাচ্ছে শিক্ষকের মতামত, পক্ষীবিদ নিজেই হইচই করে ভেঙে দিচ্ছেন নৈঃশব্দ্য, উন্মাদ প্রশ্ন করছে তার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে। মানুষ এখন সুতোয় ঝুলে আছে। আলো এসে সেই সুতোটি ধরুক।
আমাদের সেই জ্ঞানের দেবী, যিনি ইতিহাস রচনা করেন না, যার দয়ালু ওষ্ঠ ও অধর আমাদের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের বিধান, তাঁর জন্যই তো দুঃখ অভ্যাস করে মানুষ। তোমরা যারা মিশরের সন্ধান জানো, আমাদের উৎসের সন্ধান জানো, মানুষের ওই ভাঙা পাঁজরটুকু জড়িয়ে রাখো বাতাসে। হাওয়ার গর্ভে রেখে তাকে তোমরা সুস্থ করে তোলো। কী আশ্চর্য অদ্ভূতভাবে তুমি তার আত্মাকে প্রস্তুত করে তোলো আজকাল! রূপরসিকের পাশে ধর্মান্ধ এসে শুয়ে থাকে,  কামনাপ্রবণ জীব বসে থাকে ক্ষমতার রুপোলি বলয়ে, প্রতারক  ক্ষমা প্রার্থনা করে উচ্চতর প্রতারকের কাছে। অন্ধকারের মসিহা এসে ব্যাখ্যা করে যায় প্রাসাদ আর গুহার পার্থক্য। হে রেশমসদৃশ সেতু! হে চকচকে থুতুর রেখা! সম্ভাবনার ক্ষীণ তন্তু! শুধু তুমি, তুমি ছাড়া আর কোন কিছুই এই বিশ্বে সফল হতে পারে না।” (লেনার্ড কোহেন)
এই সুতীব্র কোহেনীয় ব্যাঙ্গের চাবুক আমাদের ফালাফালা করে দেয়। ভ্রান্ত সুসুপ্তির কোকুন ছিঁড়ে  একটানে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় আয়নার মুখোমুখি, আমাদের অস্তিত্বের দিকে আঙুল তুলে ঠাঠা করে হাসতে থাকে। সেই হাসি বুলেটের মতো ছিন্নভিন্ন করে দেয় আমাদের যাবতীয় ভ্রান্ত আবেশ। একটি “চকচকে থুতুর রেখা” একটি বিরুদ্ধ স্বর। বারবার কবিতার পর কবিতায় কোহেন আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত জরদগব বিরুদ্ধ স্বরটিকে ঠেলা দেন, চেষ্টা করেন জাগিয়ে তুলতে।
কোহেনের কবিতা ঠিক উচ্চকিত পাঠের জন্য নয়। কোহেন আমাদের অন্তঃস্থ আলোটি জ্বালিয়ে দেন। আমরা সেই আলো হাতে আত্মসন্ধানের পথে হাঁটি। এই অনুসন্ধানটির বড় প্রয়োজন আমাদের। “Did we come for nothing? ”  কেন এসেছি আমি?  আমার এই অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী? শুধুই সংসার, চাকরি, কর্তব্য পালন আর মেনে নেওয়া? ব্যস, আর কিছু নয়? “I allowed myself to be crushed by ignorance” ।  কিন্তু জন্ম মানেই তো আলো, আর আলো অর্থাৎ আগুন। আমাদের ভেতরের সেই বিশুদ্ধ আগুনটুকু খুঁজে নেওয়ার দায় আমাদের নিজেদের। অন্ধকারের নিচে পিষে যেতে যেতে একদিন দপ করে জ্বলে ওঠার জন্যই যেন লুকিয়ে থাকে সেই নিভৃত বারুদ। বিস্ফোরণে ছারখার হয়ে যায় আমাদের নিজস্ব তিমির। সেই বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করা হয়ে ওঠে না সবার। হৃদয় অজস্র পথের দিশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা পথ হেঁটে যাই কিছু দূর। অন্ধ গলির সামনে দাঁড়াই কিছুক্ষণ, আবার হাঁটতে থাকি নতুন পথের সন্ধানে। এই খোঁজ ফুরায় না বলেই আমরা পরজন্মে বিশ্বাস করি, ফিরে আসায় বিশ্বাস করি।
(ক্রমশ)

শেয়ার করুন

0Shares
0
অন্য একতারা যুগান্তর Exclusive সাম্প্রতিক