খেলনা বন্দুক দেখিয়ে চলছে চুরি-ছিনতাই!!

খেলনা বন্দুক দেখিয়ে চলছে চুরি-ছিনতাই!!

টিম যুগান্তর: খেলনা বন্দুক কাজে লাগিয়ে ভয় দেখিয়ে চুরি-ডাকাতির ঘটনা বেড়েই চলেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। দেশের রাজধানী শহর দিল্লিতে এই ধরণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে এবং বিগত দু’বছরে এই ধরণের ১৪টি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লি শহরে চুরি, ছিনতাই, ব্যাঙ্ক ডাকাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই নকল খেলনা বন্দুক কাজে লাগিয়ে অপরাধী নিজের কাজে সক্ষম হচ্ছে তাই এই ধরনের অপরাধের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
রাজধানীতে শেষ চারটি ব্যাংক ডাকাতির মধ্যে দু’টিতে খেলনা বন্দুকের ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এক্ষেত্রে একটি অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল (ভয় দেখানোর ক্ষেত্রে) এবং অন্যটিতে ব্যাক-আপ অস্ত্র হিসাবে অর্থাৎ একটি আসল বন্দুকের সাথে খেলনা বন্দুক ভয় দেখানোর জন্য।

চলতি বছর জানুয়ারিতে তিন দিনের ব্যবধানে দিল্লি পুলিশ তিনটি পৃথক খেলনা বন্দুক আটক করে যার মধ্যে একটি মামলায় দেখা গেছে কোনও এক ক্লাবের গায়ক ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তকারী অফিসার সেজে দাঁড়িয়ে আছে এবং গোবিন্দপুরি নামক স্থানে মাস্ক পরে না থাকা লোকদের থেকে টাকা নিচ্ছে জাল বন্দুক ব্যবহার করে। অন্যটিতে দেখা গেছে ব্যস্ত মেট্রো স্টেশন জামিয়া নগরের কাছে একটি ক্যাব চালকের থেকে মোবাইল ফোন ছিনতাই করার উদ্দেশ্যে এক ছিনতাইকারী একটি ডামি বন্দুক ব্যবহার করেছিলো। এই ১৪টি ঘটনার কোনওটিতেই বোঝা যায়নি যে অপরাধী খেলনা বন্দুক ব্যবহার করেছিল।
জুয়া খেলায় হেরে যাওয়ার পর এক মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী যখন ২০১৯ সালের মার্চ মাসে দিল্লির প্রশান্ত বিহারে একটি ব্যাঙ্ককে লুট করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি তাঁর সাথে একটি এয়ার পিস্তল নিয়ে যান যা সাধারণত বেলুন ফাটানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তিনি আধ ঘণ্টার মধ্যে বারো জন কর্মচারীকে আটক রাখতে পেরেছিলেন এবং নগদ হিসাবে 40 লক্ষ টাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হন, যতক্ষণ না ব্যাঙ্ক ম্যানেজার বিষয়টি সামলানোর সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশ এসে অস্ত্রটি নিরীক্ষণ করার আগে পর্যন্ত কেউই জানতে পারেননি যে সেটি একটি খেলনা বন্দুক।
সেই বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব দিল্লীর ফর্শ বাজারের একটি ব্যাঙ্কে দুজন ব্যক্তি খেলনা বন্দুক নিয়ে ডাকাতি চালায় এবং প্রায় ৯ লক্ষ টাকা নিয়ে চম্পট দেয়। পরে পুলিশ জানায় সেটি নকল বন্দুক যা দেখতে পুরোপুরি আসল বন্দুকের মতো।
এই ১৪টি ঘটনার কোনোটিতেই কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেনি যে খেলনা বন্দুক দ্বারা তাদের ভয় দেখানো হয়েছে কিন্তু নিউ ফ্রেন্ডস কলোনীতে ছিনতাই এর সময় এমন একটি ঘটনাও ঘটে যেখানে এক মহিলাকে বন্দুক দিয়ে ভয় দেখানোর সময় সেই মহিলা “খেলনা বন্দুক” ভেবে সন্দেহ প্রকাশ করে বিদ্রুপ করলে সত্যতা প্রমাণের জন্য সেই মহিলার পায়ে দুষ্কৃতীরা গুলি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের খেলনা বন্দুক ব্যবহার করার বেশ কিছু কারণ আছে, যেমন – এই বন্দুকগুলি দেখতে আসল বন্দুকের মতোই যা সহজেই মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চয় করাতে সক্ষম হয় এবং এগুলির মূল্য আসল বন্দুকের মূল্যের তুলনায় নিতান্তই কম তাই এর ব্যবহার বেশি।
“যে কোনও অপরাধী জানে যে খেলনা বন্দুকের সাহায্যে অপরাধের সময় পরিস্থিতি খারাপ হয়ে উঠলেও কাউকে হত্যা করা সম্ভব হবে না, তাছাড়া অস্ত্র আইনের আওতায় তার বিরুদ্ধে মামলা করাও সম্ভব হবেনা”, উত্তর প্রদেশের পুলিশ বিভাগের প্রাক্তন মুখ্য আধিকারিক প্রকাশ সিং বলেন।
গত বছর দিল্লীতে কমপক্ষে ৬৭২টি ঘটনা ঘটে যেখানে আসল আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। পুলিশ গত বছরের মধ্যে ২,৭৩৫ টি অবৈধ বন্দুক উদ্ধার করে।
দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লীর ডেপুটি পুলিশ কমিশনার আর.পি মিনা বলেন যে এই ধরণের ঘটনায় খেলনা বন্দুক ব্যবহৃত হলেও অপরাধের গুরুত্ব কিন্তু খর্ব করা যায়না। তিনি আরও বলেন, আগ্নেয়াস্ত্র আইনের আওতায় না এলেও ডাকাতির ঘটনার ক্ষেত্রে কোর্ট সমান গুরুত্বের সাথে ঘটনার বিচার করে। তিনি এবং তাঁর টিম তিনটে খেলনা বন্দুকের দুটি উদ্ধার করেন।
তবে প্রকাশ সিং এর মতে, “এটি সত্যিকারের বন্দুক ব্যবহারের চেয়ে কম গুরুতর হলেও অস্ত্র ব্যবহার না করে ছিনতাই করার চেয়ে অধিক গুরুতর।”
এই ধরণের খেলনা বন্দুকগুলি মৃত্যুর কারণ না হলেও পুরোপুরি নিরাপদও নয়। চার বছর আগে, শাহদারাতে একটি ছেলে তার প্রতিবেশীর চালানো খেলনা বন্দুকের গুলি লেগে নিজের বাম চোখটি হারিয়ে ফেলে।
মীনা জানায় যে এই ডামি বন্দুকগুলি সাধারণ খেলনার দোকানগুলিতে এবং অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলিতে পাওয়া যায় দিওয়ালি ক্র্যাকার হিসাবে এমনকি সিগারেট লাইটার হিসেবেও। এগুলি দেখতে সম্পূর্ণ আসলের মতো এবং এগুলি কেনার উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। খেলনা বন্দুক ব্যবহার করে ডাকাতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড হতে পারে।
দিল্লি পুলিশের মুখপাত্র চিন্ময় বিসওয়াল মনে করেন, কিছু অপরাধীর খেলনা বন্দুক ব্যবহারের কারণে আসল বন্দুক সংগ্রহের ক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে।
দিল্লির অপরাধীদের পক্ষে আসল বন্দুক পেয়ে যাওয়া খুব একটা সহজ নয়। ছোটোখাটো অপরাধীরা তাই সত্যিকারের বন্দুক না পেয়ে খেলনা বন্দুক ব্যবহার করে বলে বিসওয়াল বলেন। তিনি আরও বলেন যে, নকল বন্দুক ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের গুরুত্ব যাতে কোনও অংশেই কম না হয় আদালতে সেই বিষয়েও নজর রাখা হয়।
এই ধরণের খেলনা বন্দুক কখনও কখনও পুলিশেদেরও অবাক করে। শাহদারাতে একজন গাড়িচোরকে যখন পুলিশ ঘিরে ফেলে তখন সে বন্দুক থাকা সত্ত্বেও লোহার রড দিয়ে পুলিশকে আঘাত করার চেষ্টা করে। পরে জানা যায় তার কাছে থাকা বন্দুকটি খেলনার।

এই ধরণের অপরাধ প্রবণতা বাড়তে থাকলে সমস্যার সৃষ্টি হবে এবং আসল ও নকল বন্দুকের পার্থক্য বোঝার জন্য পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে আরোও সজাগ থাকতে হবে যা সম্ভবপর না। এইভাবে খেলনা বন্দুকের দ্বারা অপরাধ বাড়তে থাকলে এটি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা অথবা সহজলভ্যতা কমানোর দিকে নজর দিতে হবে এবং এই ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে আরোও মজবুত হতে হবে তাহলে কিছুটা হলেও অপরাধে রাশ টানা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন

0Shares
0
এখন সাম্প্রতিক