১৯৩৩ সালে কলকাতায় ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড যা সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল

১৯৩৩ সালে কলকাতায় ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড যা সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল

সায়নী বন্দ্যোপাধ্যায়: সাল ১৯৩৩, ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকার। বিশ্বের তৎকালীন সমাজ-রাজনীতি বেশ উত্তেজনাপূর্ণ কারণ একদিকে জার্মানি নাৎসিদের দখলে যাচ্ছিল, অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ক্রিকেটের ‘বডিলাইন’ সিরিজ ঘিরে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরী হয়েছিল এবং ভারতবর্ষেও তখন মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান নামক এক নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভাবন করার ঘোষণা করা হয়। এহেন সরগরম পরিস্থিতিতে যখন আন্তর্জাতিক শিরোনাম তৈরীর জন্য খবরের অভাব ছিল না, ঠিক সেই সময় কলকাতা উপনিবেশের বুকে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা সমগ্র বিশ্বের খবরের শিরোনামে জায়গা করে নেয়।
পাকুর, বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের একটি জেলা, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশে একটি সমৃদ্ধ সামন্ত রাজ্য। এটি স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের নিজস্ব ‘রাজকুমার’ এবং ‘নবাব’ নিয়ে গঠিত সামন্তবাদী রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম একটি রাজ্য ছিল। এই পাকুরের জমিদার বাড়ির তরুণ সদস্যদের মধ্যে অসংযত জীবন যাপন ও মৃত্যু খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। সেই জমিদার পরিবারে ঘটে যাওয়া একটি রহস্যময় মৃত্যুর মোড়কে ঢাকা খুনের ঘটনাটি এবং খুনের ধরণ এক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

তখন পাকুরে স্থানীয় লোক বলতে মূলত সাঁওতাল এবং পাহাড়ি উপজাতির এবং কয়েকটি বাঙালি পরিবারের বসবাস ছিল। এই জমিদার পরিবারটি মূলত উত্তর ভারতের রাজপুত যোদ্ধার বংশোদ্ভূত ছিল এবং সম্ভবত মুঘল সেনাবাহিনীকে এরাই পূর্ব দিকে নিয়ে এসেছিল।
জমিদার পরিবারটি স্থানীয় বসবাসকারীদের সাথে বেশ শান্তিপূর্ণ ভাবেই বসবাস করছিল কিন্তু হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই রহস্যময় খুনের ঘটনাটি রাতারাতি পরিবারটিকে খবরের শীর্ষে এনে দেয় এবং জৈবিক অস্ত্র দ্বারা খুনের ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানকেও অপরাধ জগতের সাথে পরিচয় ঘটায়।
ঘটনাটির সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৩৩ সালের ২৬শে নভেম্বর, যখন অমরেন্দ্র চন্দ্র পান্ডে ব্যস্ত হাওড়া স্টেশনের একটি প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়ে পাকুরের ট্রেনে উঠার জন্য যাত্রা শুরু করেছিলেন নিজের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে। এই সময় একজন ধূসর রঙের শাল ঢাকা দেওয়া লোক অমরেন্দ্রর পাশ দিয়ে চলে যায় এবং তিনি চিৎকার করে উঠলে তার পরিজনেরা লক্ষ্য করেন তার হাতে একটা ছোট্ট ছিদ্র এবং তার মধ্যে দিয়ে কয়েক ফোঁটা হলুদ একধরনের তরল পদার্থ নির্গত হচ্ছে। লোকটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি কারণ সে ভিড়ে মিশে যায়।
ঘটনার পর তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলে কুড়ি বছরের যুবক অমরেন্দ্র যেতে অনীহা প্রকাশ করেন কারন তিনি নিজেকে কাপুরুষ হিসেবে প্রমাণ করতে চাননি। তাঁর সৎ ভাই বিনয়েন্দ্র ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং দেওঘর জমিদারির একমাত্র উত্তরসূরী অমরেন্দ্রকে তিনি মোটেও ভাল ভাবে দেখতেন না। অমরেন্দ্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভাবলেও বিনয়েন্দ্র তাঁকে বিভিন্ন ভাবে আটকানোর চেষ্টা করেন।

বাড়ি ফিরে তিনি জ্বরে পড়েন এবং বিভিন্ন ঘরোয়া উপায়েও যখন তিনি সুস্থ হচ্ছিলেন না তখন তিনদিন পর তাঁর পরিবার তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসে এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তিনি কলকাতার রাসবিহারীতে অবস্থিত পাকুর রাজবাড়ির অতিথিশালায় ওঠেন এবং তাঁর চিকিৎসার জন্য তৎকালীন বাংলার একজন গন্যমান্য চিকিৎসক ডাক্তার নলিনী রঞ্জন সেনগুপ্তকে ডাকা হয় এবং তিনি চিকিৎসার দায়ভার গ্রহণ করেন। তিনি অমরেন্দ্রর ডানহাতে সুচের দাগ খুঁজে পান এবং রক্ত পরীক্ষার নির্দেশ দেন। তাঁর হাত ততদিনে ফুলে যায় এবং রক্তচাপ নিম্নগামী হয়ে পড়ে সাথে তীব্র জ্বর এবং রক্তপাত। রোগ নির্ণয় বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে আবার তাঁর সৎ-ভাই বিনয়েন্দ্র ঘটনাস্থলে হাজির। তিনি তাঁর পছন্দের একজন ডাক্তার নিয়ে আসেন যিনি পরিবারকে আশ্বাস দেন যে অমরেন্দ্র শীঘ্রই আরও ভাল হয়ে উঠবেন। কিন্তু ৩রা ডিসেম্বর অমরেন্দ্র কোমায় চলে যান এবং পরদিন অর্থাৎ ৪ঠা ডিসেম্বর তিনি মারা যান। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে পরিবার কিছু জানার আগেই বিনয়েন্দ্র একটি ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করে মরদেহ দাহ করিয়ে দেন। এইভাবে তিনি মৃত্যুর কারণ সম্পর্কিত সমস্ত সূত্র মুছে দিয়েছিলেন।
বিনয়েন্দ্র একটিও সূত্র না রাখলেও রক্তের নমুনা যা তখনও পরীক্ষাগারে ছিল রক্ত ​​পরীক্ষার অপেক্ষায়, শীঘ্রই কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিকাল মেডিসিনের প্রধান বিশেষজ্ঞ তাঁর রায়টি প্রত্যাহার করে নেন এবং জানান অমরেন্দ্রর রক্তে ​​ইয়েরসিনিয়া পেস্টিসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা বুবোনিক প্লেগ নামক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়া। প্লেগ রোগটি কলকাতার একটি লক্ষণীয় রোগ এবং তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল।
১৮৯৬ সালে ভারত সত্যই শক্তিশালী বুবোনিক প্লেগ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। যদিও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের তুলনায় সংখ্যাটি খুব কম হলেও কলকাতাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তবে মহামারীটি দশ বছর বা তার পরে তার মারণক্ষমতা হারিয়ে ছিল। তবুও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিক্ষিপ্তভাবে এই রোগগুলি প্রকাশিত হতে থাকে।
১৯৩০-এর দশকের মধ্যে বুবোনিক প্লেগের ঘটনা কলকাতায় বিরল ছিল। স্বাভাবিকভাবেই, শহরের একটি বিশিষ্ট পরিবারের বংশধরের আকস্মিক মৃত্যু চিকিৎসক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোড়ন তোলে। তবে কয়েক সপ্তাহ পরে গুজবটি ধামাচাপা পড়ে যায়। এরপরও এমন কিছু লোক ছিলেন যারা এই হত্যাকাণ্ডের সন্দেহটি উড়িয়ে দিতে পারেননি। সর্বোপরি, প্লেগ ব্যাসিলাস কলকাতায় প্রবেশযোগ্য ছিল না; বোম্বাইয়ের হাফকাইন ইনস্টিটিউটের বিশেষভাবে রক্ষিত পরীক্ষাগারটিতেই এটি পাওয়া যেত। কিন্তু সেখান থেকে ব্যাকটিরিয়া পাচার করা অসম্ভব ছিল।
অমরেন্দ্রের এক নিকটাত্মীয় কমলা প্রসাদ ১৯৩৪ সালের জানুয়ারির এই ঘটনার বিষয়ে কলকাতা পুলিশের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়ে সমস্ত জল্পনা কল্পনা স্তব্ধ করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং শহরে অলিগলিতে কথা শুরু হয়।
ইতিহাসের পাতায় পাতায় বিষক্রিয়ার ফলে খুনের ঘটনা বহু আছে। তবে কি এটা একপ্রকার ষড়যন্ত্র যা মহামারীর পরিস্থিতির সুযোগে নিছকই খুন?
ইন্সপেক্টর শরৎচন্দ্র মিত্রের (বেঙ্গল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস) নেতৃত্বে কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। অমরেন্দ্রর জীবনের শেষ দিনগুলিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মতো বিরক্তিকর অভ্যাস ছিল তাঁর সৎ ভাই বিনয়েন্দ্র পান্ডের। বিনয়েন্দ্র ছদ্মবেশে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন এবং অনেক সন্দেহজনক মানুষজনের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি যখন মামলায় প্রথম তথ্য প্রতিবেদন (এফআইআর) দায়ের করা হচ্ছিল ঠিক তখনই বাংলা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে পুলিশের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলেছিলেন। পুলিশ যদিও আসানসোল স্টেশনে তাকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্ত চলাকালীন একটি বিশেষ চরিত্রের হদিস পাওয়া যায় যার নাম ডঃ তারানাথ ভট্টাচার্য। তিনি পেশায় একজন ‘ডাক্তার’ ছিলেন এবং প্রায়শই বিনয়েন্দ্রর সাথে তাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। ঠিক কী ছিল তার বিশেষত্ব? তারানাথ, যার মেডিকেল ডিগ্রিও অত্যন্ত সন্দেহজনক ছিল, তিনি কলকাতায় একজন ডাঃ উকিলের সাথে পরীক্ষাগার সহায়ক হিসাবে কাজ করতেন এবং তার সুবাদেই তিনি বোম্বে শহরে যান এবং নিজেকে হাফকিন ইনস্টিটিউটে একটি মাইক্রোবায়োলজি গবেষক হিসাবে পরিচয় দেন।
১৮৯৬ সালে যখন প্লেগ রোগটি ছড়িয়ে পড়ে তখন এই ইন্সটিটিউটেই প্রথম টীকা আবিষ্কার করা হয়। এর লাগোয়া আর্থার রোড হাসপাতালে প্রচুর পরিমাণে রোগাক্রান্ত রক্তের নমুনা পড়েছিল, কাজেই তারানাথের পক্ষে নমুনা চুরি করা অসম্ভব ছিল না এবং সে সেটাই করে।
তবে এই পুরো কাজটি যথেষ্ট প্রশাসনিক প্রভাবযুক্ত কোনও এমন ব্যক্তির সমর্থন ছাড়া সফল হত না যিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত। কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিকাল মেডিসিনের ডাঃ শিবপদ ভট্টাচার্য এক্ষেত্রে সাহায্য করে যিনি বিনয়েন্দ্রর ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁর লেখা চিঠিগুলিই তারানাথকে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে একাধিক বাধা পেরোতে সাহায্য করে। পরবর্তীকালে, তদন্ত ও বিচারের সময় আরও প্রকাশিত হয় যে তারানাথই একমাত্র “মেডিকেল” ব্যক্তি ছিলেন যিনি বাংলা থেকে ১৯২৬ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে আর্থার রোড হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তার গ্রেপ্তারির আগে পর্যন্ত তার পরিচয় জানা যায়নি।
তরুণ ও গতিশীল তদন্তকারী অফিসার শরৎচন্দ্র মিত্র ও অফিসার লে ব্রোক সহ কলকাতা পুলিশ কর্তৃক বিভিন্ন ছোটো সূত্র ধরে তদন্ত চলে। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলি এই মামলাটির ব্যাপারে বিশদে লেখা প্রকাশ করে এবং টাইম ম্যাগাজিন ২৫ ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৫-এর সংস্করণে ‘মার্ডার উইথ জার্মস(জীবাণুর দ্বারা খুন)’ নামক একটি দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করে। অপরাধীদের রেখে যাওয়া কাগজের টুকরো প্রমাণ এবং অন্যান্য পদচিহ্নগুলি এতই স্পষ্ট ছিল যে পুলিশ এক বছরের মধ্যে বিনয়েন্দ্র পান্ডে এবং তারানাথ ভট্টাচার্যকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল। উভয়কেই ১৯৩৬ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং আন্দামানের সেলুলার কারাগারে পাঠানো হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের জন্য। চূড়ান্ত রায়টি বিচারপতি জে. লর্ট উইলিয়ামস ১০ই জানুয়ারী ১৯৩৬ সালে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
তবে ইতিহাস ছিল অপরাধীদের পক্ষে এবং তাদের আটক করার ১১ বছর পরে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল এবং অনেক বন্দীকে আন্দামান জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিনয়েন্দ্র রাজনৈতিক বন্দী না হলেও মুক্তি পেয়েছিল এবং পাকুরে ফিরে এসেছিল যদিও ততদিনে মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ছিল। পরিবারের সদস্যদের সাথে ঘন ঘন সংঘাত চলত যা পরিণতিতে এসে দাঁড়ায়। একদিন বন্দুক হাতে বিনয়েন্দ্র নিজেকে প্রাসাদের একটি ঘরে আটকে রেখে সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় এবং পুলিশের সাথে গোলাগুলিতে তার মৃত্যু হয়।
এভাবেই সমস্ত অনৈতিকতা ও অপরাধের বিচার হয়। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে কোনও অপরাধীই নিস্তার পায়নি ভাগ্যের পরিহাস থেকে। এভাবেই একেকটা অধ্যায়ের শেষ হয়, নির্মমতার বিচার হয় নির্মমতা দিয়েই।

শেয়ার করুন

0Shares
0
তখন বিবিধ সাম্প্রতিক