লিখছেন রূপম ইসলাম— ৪

লিখছেন রূপম ইসলাম— ৪

এবারের পর্ব আমি লিখব না, লিখব পরের কিস্তিতে

প্রিয় অরিজিৎ
প্রযত্নে যুগান্তর,

আমি ঠিক করেছি এই ধারাবাহিকের বর্তমান কিস্তি আমি লিখব না। আমি আবার লিখব পরবর্তী কিস্তি থেকে। এই পর্বে আমায় অব্যাহতি দেওয়া হোক।

এবারে না লিখবার বেশ কিছু কারণ আছে। একে একে আসা যাক।

প্রথমত এই সময়টায় ভোট তরজায় চারিদিক সরগরম। আমিও এই স্রোতে দোদুল্যমান বাকি সব্বার মতোই। রোজ এমন এমন ঘটনা ঘটছে যে রীতিমতন চমকে চমকে উঠছি। খবরের চ্যানেল ছাড়া অন্য কিছু দেখতে ইচ্ছে করছে না। একটা নেশার মতো পেয়ে বসেছে। মিথ্যে সাক্ষাৎকারগুলো দেখছি। পশ্চিমবঙ্গের নাকি ফেসলিফ্ট হবে— অন্তঃসারশূন্য ফাঁপানো বেলুন। গ্যাস পেয়ে বেশ পতপত করে উড়ছে। ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচানোগুলোও বেড়ে লাগছে। গোটা বাঙালি জাতির এবং আমারও। এক কালে এই বাঙালি জাতির প্রতিনিধিরা সদর্পে আমায় বলেছিল চিৎকার করা চলবে না। সব সুশীল প্রজাতির জাতক ছিল রে। আমি বলেছিলাম বেশ করব চিৎকার করব। চিৎকার না করলে অনেক সময় জরুরি কথা চাপা পড়ে যায়। আমার প্রজন্মের আর্ত চিৎকার আমি শুনতে পাই। আমি না চিৎকার করলে কে করবে? কাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট পাড়ার গুণ্ডাতন্ত্রের মোকাবিলা করতে হয়েছে? কাকে বিধায়কের অফিসে গিয়ে দেখতে হয়েছে সেখানে সাধারণ মানুষকে পাত্তা দেওয়া হয় না? কাকে পুলিশের কাছে শুনতে হয়েছে গুণ্ডার সঙ্গে লড়লে তারা আমায় সাপোর্ট করবে না? তখন অবশ্য যারা শাসক ছিল এখন তারা নেই। লোকমুখে আজকাল তাদের খুব সুখ্যাতি শুনতে পাই। তারা নাকি দারুণ ছিল। ভালই তো। ভাল হলেই তো ভাল।

জনতার মানসপটের সাধারণ নিয়ম— যারা ক্ষমতায় নেই তারাই বেশ মিষ্টি মিষ্টি। ক্ষমতায় এলেই কিন্তু প্রতিবার উলট পুরাণ। ভাবতে অবাক লাগে মানুষের স্মৃতিশক্তি এত খারাপ? অবশ্য চিন্তায় পড়িস না। ভবিষ্যতেও এ ধরনের স্মৃতিশক্তি খারাপই থাকবে। আজ যাঁরা আছেন কালের নিয়মে অতীত হবেন একদিন। তাঁদের দুষ্কর্মগুলোও ক্ষমা করে দেবে স্মৃতিশক্তিহীন মানুষ। এভাবেই তো পার পেয়ে যান সবাই। নিজের সময়কালে সবাই আখের গুছোন। কেউই ব্যতিক্রম নন।

তা যাই হোক। পুরনো কথায় ফিরি। চিৎকার করা যাবে না শুনে আমি বললাম বেশ করব চেল্লাব। বলেই একটা ‘কমলো মেঘেদের ওজন’ গেয়ে দিলাম। একটা ‘স্বপ্ন ভাঙার পৃথিবীতে’ রেকর্ড করে ফেললাম। ইমন কল্যাণে একটা ‘সন্ধ্যা ঘনায়’ বা লোক আঙ্গিকে একটা ‘কিশোরী’ কম্পোজ করে ফেললাম। শাসক গোষ্ঠী আমাকে মাপতে পারল না। আমি তো সব ফর্মুলা ভেঙে দিচ্ছি। তারা ঠিক করল আমাকে পাত্তা দেবে না। বহুত আচ্ছা। আমিও পাত্তা দিইনি। আমার সাংস্কৃতিক যুদ্ধ আমি একা একা লড়েছি।

সেই সব শ্রেণীর লোকেদেরই অঙ্গবিভঙ্গ এই সময়ে নতুন রঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছে। আমি আমোদিত হই। ভয়ও হয়। অনেকেই নিশ্চয়ই অনেকের অনেক কথাকে সিরিয়াসলি নেবেন। না নিয়েও তো কোনও উপায় নেই। কেউই তো কোনও অল্টার্নেটিভ পথ দেখাতে পারছে না, আমিও না। অনেক দিন আগে ইয়ুথ ইন্টারন্যাশনাল পার্টির অ্যাবি হফম্যান বলেছিলেন— আমেরিকাকে আমরা কোনও নতুন পলিটিকাল পার্টি দেব না। দেব নতুন রাষ্ট্রের ধারণা। সে সব বলেই বা কী এমন কাজের কাজ হয়েছিল। হফম্যানের পলাতক জীবন, আত্মগোপনের জীবন, কয়েদ জীবন, আদালতের চরকিপাক খাওয়া জীবন। শেষমেষ আত্মহনন।— এই তো! আমিও বাগাড়ম্বর করি। বলি— সাংস্কৃতিক আন্দোলন। কেউ চেপে ধরলে কী বলব? ব্যাখ্যা করতে পারব? সাফল্যের গ্যারান্টি দেব? অসফলতার দিতে পারি। বলতে পারি আইডিয়াল কনডিশন অ্যাচিভ করা যায় না। নৈরাশ্য দেব? নাকি মিথ্যে আশাবাদ? এই দুই-এর বাইরে তো কোনও পক্ষ নেই!

আপোসের আগ্রহ নেই
তাই ভোট দিচ্ছি বিচ্ছেদেই
যুদ্ধজয়ে তুমি থেকো
আমি যাই

অরিজিৎ, তুই তো জানিস আমি ২৭শে মার্চ রূপম ইসলাম এককের নতুন অধিবেশন হবে— এই ঘোষণা করেছিলাম। তারিখটা ছিল দোল উৎসবের আগের রাত। তখনও ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশিত হয়নি। আমার এক শ্রোতাবন্ধু মনে রেখেছিলেন দোল উৎসবে আমি একবার একটা গান রচনা করেছিলাম। নাম ‘তৃতীয় বিশ্ব’। তিনি অনুরোধ করলেন গানটি তালিকায় রাখতে। আমি কথা দিলাম— চেষ্টা করব।

পিয়ানোতে বাজাতে শুরু করলাম। অনুশীলন করছি। বেশ লাগছে। আমি গাইছি—

তোমায় নীল তোমায় লাল
তোমায় সবুজ দেব আমি
ছোঁব কালো বাসব ভাল
হয়ে অবুঝ বিপথগামী

বিশ্বাস করবি না, গানটা গাইছি, আর মনের ভেতরে আরেকটা গানের কথা পাশাপাশি গুনগুনিয়ে উঠছে, ফেনিয়ে উঠছে।

আমরা নই গেরুয়া, লাল, সবুজ কিংবা সাদা-নীল

আসলে ভোটের দিন তখনও ঘোষণা হয়নি ঠিকই, তবুও নির্বাচনী যুদ্ধের দামামা তো বাজছিলই।

যাই হোক, গাইতে গাইতে আমি সাংঘাতিক কয়েকটা লাইনে পৌঁছলাম। তলায় তলায় আমাদের সমাজে এটা ছিলই রে। কারা যেন বলছিল মাফিয়ারাজ ছিল না? জাতপাত ছিল না? তাহলে এই লাইনগুলো এল কোত্থেকে?
এসব অতীতেও ছিল। বর্তমানেও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। কে কতটা ভাল, কে কতটা মন্দ আমায় মাপতে বলিস না রে। আমি পারব না।

লাইনগুলোই বরং বলি—

তোমার সমাজের
মাফিয়ারাজে
অস্পৃশ্য হতে চাই

অরিজিৎ, চড়াং করে কী একটা ঘটে গেল। আমি পিয়ানো থেকে পেছন ঘুরে তৎক্ষণাৎ গিটারটা তুলে নিয়ে গাইতে শুরু করলাম—

দলিত মুদ্দা চোখে প্লাবনের মতো নামে
সে স্রোত কি ধুয়ে দেবে শাসকের ভোট?
ভেমুলা ঘরের ছেলে উড়ে গ্যাছে ডানা মেলে
ফেলে রেখে নিরীহ সুইসাইড নোট
(ভেমুলার চিঠি)

এরপরই ওঁরা ২৭ তারিখ ভোটের দিন ঘোষণা করে দিলেন।

বল অরিজিৎ— কী করে গাইব, কী করে বলব আমার মনের কথা? কী করে লিখব আমি সমীকরণটা কী বুঝছি? আমি পক্ষপাতিত্বহীন থাকতে বললে কে শুনবেন সে কথা আর কেনই বা শুনবেন? আর অন্যকে প্রভাবিত করতে আমি যাবই বা কেন? ক’টা লোককে প্রভাবিত করতে পারব? গানকে শেষ বিচারে লোকে বিনোদন হিসেবেই নেয়— জেনে রাখিস। গায়ক রাজনৈতিক মতের প্রবক্তা হলে সমাজের পক্ষে তাকে হজম করা খুব মুশকিল। আর আমার কাজকে তো শেষাবধি মাপা হবে সমাজমানুষের দর্পণেই। তাই না? তাই অরিজিৎ, এই সময়টায় আমার চুপ করে থাকাই ভাল।

আচ্ছা— কোভিডের কেসটা কী হল বল দেখি? আমরা তো দিব্যি ভাবলাম কমছে কমবে। ভাবলাম এবারের পয়লা বৈশাখের পর নর্মাল জীবনে ফিরব। কতদিন সমুদ্রে যাই না। যাব এবার। কনসার্ট হবে আগের মতো অডিটোরিয়ামে। কিন্তু এখন যে শুনি কোভিড আবার বাড়ছে? নির্বাচনের উত্তাপ চড়ছে। কত মিছিল, কত জমায়েত, কত মহাব্রিগেড। একটিও দলের একজনও রাজনৈতিক নেতা কিন্তু জড়ো হওয়া জনতাকে বললেন না— এসেছেন? ভাল কথা। কিন্তু মুখোশ? মুখোশ কোথায়? মুখোশ না পরলে কিন্তু সমাজের বিপদ। দেশের বিপদ।

না রে অরিজিৎ। মানুষ রোগগ্রস্ত হলে তাঁদের কোনও দায় নেই। বড় নেতা সমস্ত। কত দিকে মন। এটাই যদি কোনও বিশেষ ধর্মীয় সমাবেশ হত। বা কৃষকরা বসতেন ধরনায়। বা বৈধ নাগরিকেরা দাদাগিরি আইনের মুলতুবি চেয়ে ঠাণ্ডা এবং ডাণ্ডার তোয়াক্কা না করে জড়ো হতেন রাজপথে। তখন কোভিডের কথা মনে পড়ত কোনও কোনও দলের। আহা—ইস্যু করা যেত যে! সবই তো ইস্যু নির্ভর।

কারও ভোট বাড়ত। কারও কমত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধ বেঁধে যেত। বহুদলে ভাগ হয়ে যেত মানুষ। শাসন করতে ঠিক যেমনটি দরকার। ভুলিয়ে দিতে হবে আমাদের ছোটবেলায় পড়া মূলগত ঐক্যের সুর। ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি। কোনও একটি দলের নয়, সবারই যা অন্তরায়। কেউ কানকাটা। কারও কান আছে। এটুকুই যা পার্থক্য।

অবশ্য এটাও ঠিক, ওই পার্থক্যটুকুও ম্যাটার করে। সবাই এক— এই স্বতঃসিদ্ধ সময়ে-সময়ে ভুলে যেতেও হয়।

অরিজিৎ, বড্ড জটিল ভাবনায় ঢুকে পড়ছি। সময়টা সব গুলিয়ে দিচ্ছে। এবারটি থাক। পরেরবার লেখা যাবে।

 

প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : অন্তরূপ চক্রবর্তী

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive লিখছেন রূপম ইসলাম