সৌভিক কথা, পর্ব ৪

সৌভিক কথা, পর্ব ৪

দোলের আগের দিন খোয়াইয়ের মাথায় চাঁদ উঠবে, আধা-জঙ্গল, রাঙা প্রান্তর ভেসে যাবে অপার্থিব আলোয়, মায়াজ্যোৎস্নায় দেখা যাবে আধো-আলো-আঁধারি অবয়ব- “আরে , তুমি এসেছ?”, দূরে দূরে সোনাঝুরি গাছেদের তলায় বিভিন্ন ছায়াজটলা, গিটারের স্ট্রিংয়ে “পিন্দারে পলাশের বন….”, পার্কিংয়ে রাখা কিছু ইতস্তত গাড়ি থেকে ভেসে আসবে মৃদু গুঞ্জন, শুরু হবে আলো বিতরণ। দোলের দিন সন্ধ্যায় আবারও চাঁদ উঠবে, ফুলমুনে মুছে যাবে দুঃখ, যে রং চলে গেছে সে এসে এসে দাঁড়াবে ধীরে- “কেমন আছো?”; আমাদের ভেঙে যাওয়া যৌথখামার, আমাদের ফেলে আসা বোহেমিয়ানগর প্রত্ন-পৃথিবী থেকে জেগে উঠবে আবার, চাঁদের আলোয় সেলফোনে ভেসে উঠবে ডিলিট করে দেওয়া নম্বর। চেনা মুখ কাছে এসে অচেনা ছায়া আর চেনা-চেনা ছায়ার কাছে এসে কিছুটা চেনা হয়ে যাবার মধ্যে এসে দাঁড়াবে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে সকালের আবিরমাখা আকাঙ্খা, জ্যোৎস্নার খোয়াইপরবে কিছু কি মনে পড়বে, কিছু কি ভুলে যাব, ভুলে কি যেতে চাইব- ফাগুন মানে আগাম ঝড়ের পূর্বাভাস… এই কৃষ্ণচূড়া-বিপ্লবের প্রান্তরে মনে কি পড়বে সেই হারানো রং-প্যাস্টেল, সেইসব বসন্ত-উৎসব….

বনছায়া

পূর্বপল্লীর এ দিকটায় কেউ বড় একটা আসেনা
‘বনছায়া’ নামের এই বাড়িতেই কোনও এক বসন্ত-সন্ধ্যায়
রঞ্জাবতী দাশগুপ্তের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল
এখন এ পোড়ো বাড়ির বারান্দায়
রং দেওয়া-নেওয়া করার কেউ নেই
অন্ধকার, বন্ধ ঘর থেকে ভেসে আসা পুরনো এস্রাজ
বাগানের আগাছায় ছড়িয়ে পড়ে বিষণ্ণ আগুনের মত
যে রিক্সা চেপে আজ এই বাড়িতে এলাম
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সে গেটের সামনে আর নেই
অথচ, দোলের আগের এই ফুলমুন রাতে ওই রিক্সাচালককে
আমি অপেক্ষা করতে বলেছিলাম, পয়সাও দিইনি এখনও
কে যে কখন কোথায় না বলে চলে যায়
কিংবা অপেক্ষা করতে বলে আর ফেরে না –
‘বনছায়া’ নামের এই ভাঙাচোরা বাড়ি
সে সব কিছু জানে কি জানে না , ভাবতে ভাবতে
এই জ্যোৎস্নার প্রান্তরে চোখে ঘোর লেগে যায়
বারান্দায় দুলে ওঠে কবেকার রকিং চেয়ার
পূর্বপল্লীর এ দিকটায় কেউ বড় একটা আসেনা
এবং এ অঞ্চলে ‘বনছায়া’ নামের কোনো বাড়ি কেউ দেখেনি কখনও …

তবে এই করোনা-বিধ্বস্ত দুনিয়ায় হোলির রং অনেকটাই ম্লান। তা ছাড়া, সামনে ভোট, আমাদের পাঁচ বছর পরপর ঘুরে আসা উৎসব। সারাদিন রোদের বুলেট খেয়ে রোড বেয়ে স্কুটার চালিয়ে বাড়ি বাড়ি খাবার ডেলিভারি দেয় যে সুইগি-যুবক , ধরা যাক তার নাম “‘স্ট্রাগল শীল ” – উত্তর কলকাতার ক্ষয়িষ্ণু সোনার বেনে পরিবারের ছেলে, গ্র্যাজুয়েশনে ইংরেজিতে অনার্স থাকা সত্ত্বেও, ইয়োর অনার আর কোনও চাকরি জুটিয়ে দেননি, অগত্যা সুইগি-অভিযান। পাঁচ বছর পরপর হাওয়া আসে, হাওয়া চলে যায়, “স্ট্রাগল শীল”-এর ময়লা স্কুটার চলতে থাকে, চলতেই থাকে , জোকার রিসর্টের ঘরে তখন তৈরি হয়ে নিচ্ছে মাছ-ভেড়ির মালিকের ছেলে আর তার ‘অয়েল অফ ওলে ‘ প্রেমিকার এলোমেলো স্ট্র্যাপ । যে পাড়ায় বাড়িগুলো ছিল “বসুন্ধরা, ১৯৩৬” নামের , আর গাড়িবারান্দাগুলো ছিল ছায়া ছায়া , সেখানে চৈত্র-বৈশাখের দুপুরে দেবদূত হেঁকে যেত – “আইইইইসক্রিইইইম ….” , আর হুড়মুড় করে নেমে-আসতো ছেলেমেয়ের দল ; এখন স্ট্রাগল শীল দ্রুতবেগে স্কুটার চালায়, যাতে হোম ডেলিভারির আইসক্রিম গলে না যায় , ঝিঙে থেকে প্রেম এখন তো সবই “হোম ডেলিভারি “। এখন আর কিছু নেই – আইসক্রিমওয়ালার ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে কমলা স্টিকের দাঁত-শিহরণ নেই, দুপুরের চিলেকোঠায় ঘুড়ি আর লাটাইয়ের গোপন আদান-প্রদান নেই , রাত এগারোটা পনেরোয় কালো, গাবদা টেলিফোনের না বলা “আমি বলছি ..”- র হঠাৎ দু-বার ঝনঝন করে উঠে থেমে যাওয়া নেই , ছাতা উড়ে যাওয়া ঘনিষ্ঠ কালবৈশাখী নেই , এখন আছে ট্রু-কলার সমৃদ্ধ রহস্যহীন স্মার্টফোন, এখন আছে আনচান না করে ওঠা স্মার্ট মন। আর আছে স্ট্রাগল শীল ও তার স্কুটার। সব বদলে গেছে , পাঁচ বছর, আরও পাঁচ বছর, আরও , আরও পাঁচ … হাওয়া আসে , হাওয়া চলে যায়, স্ট্রাগল থেকে যায় , স্ট্রাগল শীল , ইংরেজি অনার্স , সুইগি-যুবক। ‘অয়েল অফ ওলে’ দুর্ঘটনায় ঢেকে যায় শহরের স্কিন…

প্রচ্ছদ : ত্রিনাথ মজুমদার 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive সৌভিক কথা