শিশুর শহরতলি― ৩

শিশুর শহরতলি― ৩

মেঘবিস্কুট

(কঠোর ভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)

আমি যখন ছোট্ট ছিলাম, তখন ভাবতাম ভেসে যাওয়া দুয়েকটা মেঘ জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকলে বেশ হয়, ধরে খাই। ঐ যে পদ্যটা আছে না, ‘আকাশের গায়ে নাকি টক টক গন্ধ’, আমি ভাবতেম ছোট ছোট মেঘগুলোর জন্যেই বুঝি ওই টক গন্ধ আকাশ জুড়ে। মেঘ ধরে খেলে বেশ কুলের আচার বা হজমিগুলির মতন কাজ হবে এ আমার তীব্র বিশ্বাস ছিল। বলতে নেই,  ছোটবেলা থেকেই আমার টকের উপর খুব লোভ। মাছের টক, চালতার টক, তেঁতুলের টক, আমচুর, হজমিগুলি ভাঁড়ার থেকে তুলেছি আর টপাটপ খেয়েছি… এখন সে গুলিও নেই, সে ভাঁড়ারই বা কোথা…

তা একদিন হল কী, মানে সত্যি বলতে সেদিনটাই ভাল ছিল না, মা গিয়েছে কোন এক সইয়ের বাড়ি আমাকে আঁক কষতে বসিয়ে, ঈশান কোনে আকাশ সেদিন কালো, বিজলি চমকাচ্ছে থেকে থেকে, এদিকে আমের কচি মুকুলের গন্ধে ম’ম’ করছে চারিপাশ, মন খুব উদাস আমার― এমন সময় সেজোমামা এলেন।

সেজোমামা এলেন, ক্ষতি নেই, আর্মিতে চাকরি করতেন, বছরে একবার এলেই হরেক রকম খেলনা আনতেন, আর আনতেন প্রচুর প্রচুর দেশের ডাকটিকিট, আমার ডাকটিকিট জমানোর খাতা ছিল কিনা। কিন্তু সেইবার যেন খানিক অদ্ভুত, কিচ্ছু নেই, শুধুমুদু মামা দাঁড়িয়ে, ঘাড়ে খালি ইয়া লম্বা একটা ঝোলা, চেহারা আধখানা হয়ে গিয়েছে, গালে না কাটা দাড়ির জঙ্গল। আমার তো মামাকে ওভাবে দেখে একগাল মাছি, হাঁ মুখ আর বন্ধ হয়না!

বললেন, “হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেকচিস কি, সরে দাঁড়া দরজা থেকে, ঢুকবো তো নাকি!”
আমি কাঁচুমাচু মুখ করে সরে দাঁড়ালেম, মনে মনে ভাবলেম, “এবার কোনও গিফট নেই, কেবল ফাঁকা ঝোলা..!”
মামা বললেন, “বড্ড তাড়া জয়বাবু, আরও অনেক অনেক বাচ্চা ছেলেদের ঘরে যেতে হবে, আগে একগ্লাস জল খাওয়াও দেখি…”
বাইরে তখন বৃষ্টি নেমেছে, বাজ পড়ার হুড়ুম দুড়ুম শব্দে কান ঝালাপালা, জল খেয়ে এমন সময় মামা ঝোলা খুললেন…

বললে তোমরা বিশ্বাস করবে না, ঝোলা থেকে বেড়িয়ে এলো আস্ত একটা মেঘ! পুরুষ্টু, নরম-সরম নীলচে একটা মেঘ ঝোলা থেকে বেড়িয়ে সারা ঘরময় ঘুরতে লাগলো, একবার তো আমার প্রায় নাকের সামনে দিয়ে হুউউউস করে এক্কেবারে মোটর গাড়ির মতো চলে গেল!
নাক বাঁচিয়ে যেইনা থেবড়ে মাটিতে বসেছি, ওমা, দেখি মেঘ হয়ে গেল মানুষ! সেই মানুষ দেখি আমার দিকে লম্বা একটা হাত বাড়াচ্ছে, বোধহয় হ্যান্ডশেক করবে, যেইনা আমি হাত বাড়িয়েছি, বাস্ রে! কোত্থায় কি! সব দেখি ভোঁ-ভাঁ- শুধু পড়ে আছে একটা বিস্কুট!
সেজোমামা হাত নেড়ে বল্ল, “ম্যাজিক! মেঘবিস্কুট! খেয়ে নাও!”


মেঘবিস্কুট খেতেই দেখি সেজোমামাও আর ঘরে নেই, কোন মন্তরে কি জানি, উধাও হয়ে গেছে!
আমার কেন কে জানে ভারী রাগ হল, ছোটছেলে পেয়ে মামা খালি ভয় দেখাচ্ছেন, এতক্ষণ আমি কেন ভিরমি খাইনি সেটাই আশ্চর্য লাগে এখনও; যা’হোক আমি খুব খানিক রাগ দেখাতে ভুরু টুরু কুঁচকে অঁঁঅঁঅঁ শব্দ করে অজ্ঞান হলুম।

জ্ঞান হতে দেখি, পাশে মা দাঁড়িয়ে, মাথায় বাতাস করছে বুড়ি ঝি মোক্ষদা। আমি তড়াক করে বিছানায় লাফিয়ে বসে বল্লেম, “সেজোমামা কই! মেঘ কই!”
মোক্ষদা হাউমাউ করে কেমন একটা সুরে বল্ল, “তেনাদের দেকেচে দা’বাবু! জ্বরের তারসে দা’বাবু ভুল বকচে গো মা-আ-আ..! ওঝাবাবা কে খপর দিতে হবে গো মা-আ-আ..!”
মা পাশে বসেছিলন, খানিক বিরক্ত গলায় মোক্ষদাকে ধমকে বললেন, “আহ্ মোক্ষ, থামবি তুই! খালি আজেবাজে বকছে তখন থেকে!”, দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, “কোথায় তোমার সেজোমামা, জয়?”

আমি ভারী ভয়ে ভয়ে চারিদিকে তাকিয়ে সেজোমামাকে খুঁজতে লাগলাম, দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই, না তো মামা, না তো মেঘ, না সেই ঝোলা- সব হাপিস।
আমি সামান্য খাবি খেয়ে বললাম, “সেজোমামা মেঘ এনেছিল ঝোলায় করে!”

মা বললেন, “আহা বাছা আমার ভয় পেয়েছে… ঘুমাও সোনা…” এই না বলে, সেই রাজপুত্তুর আর শুকসারীর গল্প বলতে আরম্ভ করলেন, যে গল্প আমি বহু-বহুবার শুনেছি, কিন্তু যে গল্প আজ আর আমায় কেউ বলে না…
যা’হোক, সকালে উঠে ডেস্কের তলায় একটা কালো লম্বা ঝোলা দেখতে পেয়েছিলাম আমি, সেটাকে যত্ন করে ইস্কুলের ব্যাগে লুকিয়ে রেখেছিলাম। এখন সেটা আলমারিতে বন্ধ…

দুইদিন বাদে টেলিগ্রাম এল… মামা আর নেই,  মামাদের কনভয়ের উপর নাকি বোমা পড়েছিল।
পাঁচদিন পরে এল একটা চৌকো কাঠের বাক্স, এখন তার নাম জানি, কফিন বলে।
আমার মা ছাড়া মামার তিনকূলে কেউ ছিলোনা। কফিনের উপর মায়ের শতেক কান্নার জলও মামাকে আর ফিরিয়ে দেয়নি কোনওদিন।

আমি কিন্তু জানি মামা ফিরে আসবে। একদিন আসবে ঠিক। আমার কাছে না আসুক, তোমার কাছে আসবে, যেদিন কেউ থাকবে না ঘরে, একলা তুমি হয়তো আঁক কষছো মেঝে জুড়ে, খুব মনখারাপ তোমার, সেদিন হয়তো ঝড় মাথায় নিয়ে কেউ একজন কড়া নাড়বে, খট্-খট্-খট্।
আমি জানি সেদিন তোমার দরজার ওই পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে লম্বা একটা লোক, গালে না-কাটা দাড়ি, কাঁধে লম্বা ঝোলা একটা। সেই ঝোলা থেকে বেড়িয়ে আসবে সুন্দর একটা মেঘ, সেই মেঘ হঠাৎ হয়ে যাবে একটা বিস্কুট।

আমার মামা, তখন দু’হাত নাড়িয়ে বলবে, “মেঘবিস্কুট..!”

দেখবে, তখন তোমার মন খারাপ কেমন করে উধাও হয়ে যাবে… সেদিন জানবে মেঘের স্বাদ ভালোবাসার মিষ্টি দিয়ে তৈরি।

ভালোবাসা আর মেঘ যে বড় একইরকম… গলে গেলেই অনেক বেড়ে যায়…

 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive শিশুর শহরতলি