দোল-বদল: অঙ্ক কী কঠিন!

দোল-বদল: অঙ্ক কী কঠিন!

শ্রী দে. দা. : অঙ্ক কী কঠিন! নিন্দুকরা বলবেন, ‘কীসের অঙ্ক’, ‘কেন অঙ্ক’, ‘কোনও অঙ্ক নেই’ ইত্যাদি প্রভৃতি। ধুর মশাই! ঘাবড়াবেন না। আমিও আপনার দলেই। নইলে এক-আধটা উত্তর শুনেই আপনাকে ‘নিন্দুক’ বলে দাগিয়ে দিলাম কী করে বলুন তো! আসলে সহজ অঙ্ক… একটা গল্প বলি!

কর্মসূত্রে সম্প্রতি গিয়েছিলাম নন্দীগ্রামে। একযুগ ধরে বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করার হাইভোল্টেজ ময়দান এই নন্দীগ্রাম, এমনটাই বলে সিংহভাগ সংবাদমাধ্যম। চারদিকে সবাই যেভাবে খেলায় মেতে উঠেছে, সেখানে এরম ময়দান না থাকলে ঠিক জমেও না, কী বলেন! আমার তো মাঝেমধ্যে নরেনের জন্য মনকেমন করে। একুশের বিধানসভা দেখে যেতে পারেননি স্বামীজি। যেভাবে ফুটবল হাতে আস্ত মঞ্চটাকেই নেতা-নেত্রীরা ময়দান বানিয়ে দিয়েছেন, তাতে বিবেকানন্দ খুশি না হয়ে পারতেন না। যাক গে, বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। মোদ্দা কথা হল ‘সহজ অঙ্ক’… নন্দীগ্রাম ইত্যাদি।

শহর থেকে অনেকটাই অন্দরে। রাস্তাঘাট দেখে যদিও বোঝার উপায় নেই গ্রাম না শহর। তবে ব্যাগড়া দেয় শুধু ধুলো। প্রতিটা ধুলোয় লুকিয়ে রয়েছে দুর্নীতি। চালচুরি থেকে আমফানের টাকা আত্মসাৎ সেসব সেখানে মামুলি হে মামুলি। ঠিকঠাক তল্লাশি হলে নন্দীগ্রামের রাস্তার ধুলোর মধ্যে আস্ত আস্ত পেটমোটা রাঘব বোয়ালের দেখা মিলবে। সেই পেটে সরকারি আবাস যোজনা থেকে শুরু করে আরও কত কী যে ঢুকে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। এমনটাই দাবি করেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।

এর আর নতুন কী? মনে মনে বিড়বিড় আর তারপর স্ক্রল করবেন বলে হয়তো ঠিকও করে ফেলছেন, ঠিক এখান থেকেই আসল গল্প শুরু। পাটিগণিতের মধ্যে দলবদলের নামে ঢুকে গেছে ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি, উপপাদ্য সব। মিলেমিশে একটা খিচুড়ি। আর তাতেই কনফিউজড আট থেকে ৮০। একবাক্যে সবাইকে বলতে শুনবেন, এবারের নির্বাচনে ফলাফল প্রেডিক্ট করা খুবই মুশকিল।

আলবাত মুশকিল। কেন জোর গলায় বলছি? নন্দীগ্রামের বেশ কয়েকটা চকচকে রাস্তার ধুলো একজায়গায় হয়েছে যেখানে, সেখানে একটা ব্রিজ। সেতু আসলে বন্ধনের কাজ করে, ছোটবেলা থেকে এমনটাই শুনেছি। কিন্তু এই সেতু আসলে যে কার হয়ে কাজ করে, বোঝা মুশকিল। এখানেও দলবদল? কী জানি!

রাস্তা লাগোয়া একটা চা দোকান। রোদ তখন মাথা থেকে নেমে পিঠ বেয়ে কোমরের দিকে। পড়ন্ত বিকেল… সরকারের বিরুদ্ধে নেপোটিজমের ঝুল যে কত, সে সব কথা শেষ হতেই পাল্টা জানতে চাইলাম, ক-এর বদলে খ এলেই সব সমস্যা মিটে যাবে বলছেন! ওদিক থেকে উত্তর আসে, ‘হ্যাঁ, আশাতেই তো বাঁচি আমরা!’

মুশকিল হল, আশাতেই সবাই বাঁচে না, কেউ কেউ মরেও। না মরলেও অন্তত দেওয়ালে তো পিঠ ঠেকেই। তা হতে হতে যদিও আরও এক যুগ। কিন্তু এটাই দস্তুর।

গতবছর আজকের দিনের একটা ‘গল্প’ মনে পড়ল। একটা ঢিলেঢালা পুরনো টি-শার্ট গলিয়ে রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। রংটং নিয়ে রাম আমায় ভূত বানাল। আমার সাধের গেঞ্জিটাও তখন সং সেজে বসে আছে। খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমি রেগেমেগে তৎক্ষণাৎ বেরোলাম। আমাকে নিরস ভেবে খেস্তাতে শুরু করল রাম। ভাল কথা। কিন্তু আমি তখন টং। থেমে থাকলে চলবে না। এরপর সটান রহিমের বাড়ি। কিন্তু রহিম বেচারা চিনতেই পারল না! নতুন আমদানি ভেবেও আচ্ছা কষে রং মাখাল। ধরুন, এটা নিউ নির্মাল। দোল বলে কথা! যাইহোক, এবার কিন্তু আমি আর ভূত নেই, ভূতের বাবা। ছিলুম ক, হলুম খ। আমি ব্যাটা উদোম মজা নিচ্ছি। আসলে লুকিয়ে খেলার মজাই আলাদা। দমও লাগে না, আর জেতাও যায় সহজে।

তবে মহামুশকিল হল, রহিম টের পায়নি কিছুই। এদিক সব চলছে নিজের মতো। একযুগ কেটে তার একদিন পর এক হোলির সকালে হোয়াটসঅ্যাপে ‘হ্যাপি হোলি’ লেখা মেসেজের সঙ্গে দু’-একটা গন্ধওয়ালা কথা…। ততদিনে একযুগ আগের রঙের আড়ালের মুচকি হাসির ভিডিও টেপ ভাইরাল হয়ে গেছে। তাই কেন সেদিন আমি পরিচয় দিলাম না, এই নিয়ে চলতে লাগল বোমাবর্ষণ। ঠান্ডা মাথায় আমি বলতে চাইলাম, ভাই, আবার ভূত সেজে তোর বাড়ি যাব, দম থাকলে চিনে নিস! তারপর হোয়াটসঅ্যাপে ব্লক। সিম্পল!

ঠিক আজকের দিনেরই গল্প। গল্পের গরু শুধু গাছেই ওঠে না মশাই; ভূত সাজে, রং বদলায়। মাঝে কেটে যায় এক একটা যুগ। রংবদল, দলবদল ছাড়ুন, হাইভোল্টেজ ময়দান ছাড়ুন, খেলা হবের গল্পও ছাড়ুন… যে অভিসন্ধি মগজে ঘুরছে, তা হয়তো সাময়িকভাবে বাস্তবায়িত হবেও, কিন্তু নরেন মোটেও খুশি হবেন না। ব্রিজ লাগোয়া রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের সামনে যে ধুলো রয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসুন! মানুষে পাশে দাঁড়ান এবেলা। জেতার অঙ্কে না গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। এত দ্বিধা, দ্বন্দ্ব সংশয়ের উপত্যকায় দাঁড়িয়ে অঙ্কের খাতা মেলে ধরলে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো তো বলবেই, ‘অঙ্ক কী কঠিন!’

শেয়ার করুন

0Shares
0
এখন যুগান্তর Exclusive সাম্প্রতিক