“উই আর অল ম্যাড হিয়ার!”― শিশুসাহিত্যে মানসিক রোগ ও কিশোর চরিত্র

“উই আর অল ম্যাড হিয়ার!”― শিশুসাহিত্যে মানসিক রোগ ও কিশোর চরিত্র

কবীর চট্টোপাধ্যায়: ছোটদের বই পড়তে বসলে আমরা ধরে নিই, আর যা’ই ঘটুক, শেষে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। অনেক অত্যাচার করার পরে রাক্ষস মরে যাবে, রাজপুত্র-রাজকন্যাও বিয়ে করে সুখে অর্ধেক রাজত্ব শাসন করবে। আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ফ্যান্টাসি লেখক জে আর আর টলকিন এই ধরণের “হ্যাপি এন্ডিং”-এর নাম রেখেছিলেন ইউক্যাটাসট্রফি, এবং নিজের ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ বইতেও দেখিয়েছিলেন, ভাল মানুষের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত ভাল জিনিস ছাড়া কিছু জোটে না।

স্বাভাবিকভাবেই, সব ভাল যার শেষ ভালো দেখাবে বলেই এই সেদিন পর্যন্ত মানসিক রোগ বা কষ্ট জিনিসটাকে ছোটদের গল্প একটু এড়িয়েই চলতে চেষ্টা করেছে। ভাল চরিত্রদের মানসিকভাবে বিশেষ কোনও সমস্যা থাকে না, এই নিয়মেই গল্প ছিল বাঁধা। ‘পাগল’ চরিত্ররা সেখানে আসলে মানসিক রোগের ভুক্তভোগী নয়, নেহাতই খামখেয়ালি বা একটু বেয়াড়া গোছের মানুষ। যেমন, সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু আসলে স্রেফ মিচকে ছেলে, বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গবা পাগলা ছদ্মবেশী সেয়ানা। আবার কিছু ক্ষেত্রে চরিত্রেরা পাগল হলেও তারা এমনই এক কল্পলোকের বাসিন্দা, যে তাদের পাগলামির সাথে বাস্তবের মানসিক সমস্যার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া ভার। যেমন অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড গল্পের ম্যাড হ্যাটার বা পাগল টুপিওয়ালা, যার পাগলামিতে জনি ডেপের মত “ক্ষ্যাপাটে চরিত্রে অভিনয়”-খ্যাত নায়ক রঙ চড়িয়েছেন সিনেমার পর্দায় (এইভাবে পাগলামিকে গ্লোরিফাই করারও সমস্যা আছে, সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ)।

তবে দিনকাল পাল্টাচ্ছে, আস্তে আস্তে ছোটদের গল্পে ঢুকে পড়ছে মানসিক রোগের বা সমস্যার উপাখ্যান, এবং সাবলীলভাবেই ঢুকছে। যেমন ২০০৩ সালে মার্ক হ্যাডনের লেখা বই ‘দ্য কিউরিয়াস ইন্সিডেন্ট অফ দ্য ডগ ইন দ্য নাইটটাইম।’ এ গল্পের নায়ক একটি ১৪-১৫ বছর বয়সী ছেলে, যার নাম ক্রিস্টোফার। বাবার সাথে থাকে, মা চলে গেছেন তাদের ছেড়ে। তার পাশের বাড়ির কুকুরটাকে এক রাতে কে যেন খুন করে রেখে যায়, এবং পুলিশের প্রতি কোনও আস্থা না থাকায় বাচ্চা ছেলেটি নিজেই সেই খুনের তদন্তে নামে। গোটা গল্প জুড়েই রয়েছে ক্রিস্টোফারের অটিজম এবং অ্যাসপার্গারস সিন্ড্রোমের কথা। আর পাঁচটা বাচ্চার মত তার ব্যবহার নয়, একদিকে যেমন সে গণিতের ছকে বৈজ্ঞানিকের মত ভাবনাচিন্তা করতে পারে, অন্যদিকে তেমনই তার মানসিক গঠন তাকে দৈনন্দিন সামাজিকতায় অতটা সড়গড় হতে শেখায়নি। হ্যাডন বারবার দেখান, এই কারণেই সে নানারকম সমস্যায় পড়ে; পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়, তার মা’কে নিয়ে তাকে অনেক রকম মিথ্যে বলা হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে সে আর বাবাকে স্বাভাবিকভাবে ভালবাসতে পারে না, শহরের ভিড়-কোলাহল তাকে ভয়ানক অস্বস্তিতে ফেলে দেয় ইত্যাদি। কিন্তু তার এই মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে গল্পে কোথাও বাবা-বাছা করা হয়নি, কোনও দেবদূত এসে “সব ঠিক করে” দেয়নি। বরং গল্পের শেষে দেখা যায়, ক্রিস্টোফার নিজের মানসিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করে রহস্যের সমাধান করছে একেবারে নিজের তাগিদে। হ্যাডন দেখাতে চেয়েছিলেন, সমাজ যাকে অস্বাভাবিক বলে, যে ঠিক বাকিদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না, সে’ও নিজের গল্পের নায়ক হয়ে উঠতে পারে, যদি খেলাটা তাকে নিজের নিয়মে খেলার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।

দু’টি আইরিশ বইয়ের কথা বলে শেষ করব। আমরা শিশু বা কিশোর-সাহিত্যে যেরকম মাখো-মাখো “হ্যাপি এন্ডিং” প্রত্যাশা করে থাকি, তা এখানে পাই না। প্রথমটির নাম ‘টিউজডেস আর জাস্ট অ্যাজ় ব্যাড,” লেখক কিথন লিহি। বইয়ের গোড়াতেই দেখা যাচ্ছে, অ্যাডাম বলে একটি ১৬-১৭ বছর বয়সী ছেলে নিজের মাথায় হাতুড়ি মেরে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। জ্ঞান ফেরার পর সে দেখছে, কী আশ্চর্য, তার শরীর থেকে তার আত্মাটা বেরিয়ে এসে আর একটি অ্যাডামের মত সেজে তার পাশে বসে আছে! এই আত্মা-অ্যাডামকে শুধু সে’ই দেখতে পায়, এবং গোটা গল্পটা জুড়ে এডামের দৈনন্দিন জীবন, স্কুলে বন্ধুদের সাথে সমস্যা, ইফা বলে একটি মেয়ের সাথে প্রেম, সমস্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই সেই আত্মা তাকে নানারকম পরামর্শ দেয়। তবে অ্যাডাম আস্তে আস্তে আত্মহত্যার স্মৃতি কাটিয়ে সুস্থ হয়ে উঠতে শুরু করলে আত্মাটি তাকে হিংসে করতে শুরু করে। অ্যাডাম বন্ধুদের সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছে, ইফার সাথে বেড়াতে যাচ্ছে, সেই জীবনে এই অশরীরী আত্মার আর জায়গা কই? অতএব আত্মাটি নানাভাবে অ্যাডামের মাথায় ভয়-আশঙ্কা-সন্দেহের বীজ পুঁতে তাকে আবার আস্তে আস্তে বন্ধুদের থেকে দূরে সরিয়ে আনে, যাতে বাধ্য হয়ে তাকে আবার আত্মার একমাত্র বন্ধু হতে হয়। গল্পের শেষে অ্যাডাম আর একবার আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করে, এবং সে যাত্রা বেঁচে গেলেও আর মোটামুটি সুস্থ জীবনে ফিরে এলেও লিহি পাঠককে একরকম অস্বস্তির মধ্যে রাখেন। আত্মাটি আসলে অবসাদ বা ডিপ্রেশনের রূপক, এবং সে জিনিস কখনওই পুরোপুরি উধাও হয়ে যায় না। সবসময়েই তার ব্যপারে আমাদের সাবধান থাকতে হয়, সে যেন সুযোগ পেয়েই আবার আমাদের মগজে মরণ-কামড় না বসায়!

শেষ গল্পটির নাম ‘ওয়েট অফ আ থাউজ্যান্ড ফেদার্স,’ লেখন ব্রায়ান কোনাহন। ১৭ বছর বয়সী ববি স্কটল্যান্ডে থাকে, তার পরিবার বলতে ১৪ বছর বয়সী একটি ভাই, যে মানসিক অসুখের কারণে ৮-৯ বছর বয়সী শিশুর মত অবুঝ, এবং তার মা যাঁর একটি দুরারোগ্য অসুখ রয়েছে, যার ফলে তিনি সারাদিন যন্ত্রণা পান। লাখ লাখ টাকা খরচা হয়ে যায় মায়ের ওষুধের পিছনে, তবু এ অসুখ যে সারার নয়, তা দুই ভাই-ই বোঝে। গল্পটা জুড়ে ববি কিশোর বয়সের নানারকম অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়― বন্ধুদের সাথে ঝগড়া, প্রেম-যৌনতার প্রথম বোধ, স্কুলে লেখাপড়ার চাপ ইত্যাদি। তবে সমস্ত অভিজ্ঞতার উপর কালো মেঘের মত ছায়া করে থাকে মায়ের অসুখ এবং অসুস্থ ভাইয়ের দেখাশোনা। মা একটা সময়ে তাকে ডেকে বলেন, এভাবে চলবে না, তুই বরং আমাকে খুন করে ফেল। তাতে আমারও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি হবে, তোদের দু’ ভাইকে সরকার এসে অনাথ বলে নিয়ে যাবে, সরকারি টাকায় তোদের লেখাপড়া করিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবে। একদিকে অসহ্য কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ জীবনের হাতছানি, অন্য দিকে নিজের হাতে মা’কে খুন করার দায়, এই দুই জিনিসের টানাপোড়েনে আস্তে আস্তে ধ্বংস হতে থাকা ববির মানসিক শান্তি নিয়েই এই গল্প। এই সমস্যার সমাধান গল্পের শেষে ববি নিজেই করে, কোনও ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী এসে তাকে উদ্ধার করে না। মা’য়ের মুখে বালিশ চাপা দিয়ে সে খুন করে, যাতে সরকারের ডাক্তারেরা স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই ধরে নেন। তারপরে যখন হাত ধরাধরি করে দুই অনাথ প্রশাসনের পাঠানো গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে, তখন ববির মন জুড়ে থাকে মাতৃহত্যার পাপ নয়, এক অপূর্ব শান্তি। বিভূতিভূষণের অপুর যেমন মা সর্বজয়ার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে নিজেকে স্বাধীন মনে হয়েছিল, ঠিক সেইরকম।

মানসিক রোগ বা সমস্যা নিয়ে আমাদের ভাবনাচিন্তা দ্রুত পাল্টাচ্ছে। আগের থেকে অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে পেরেছি আমরা, এবং একই সঙ্গে বুঝতে শিখেছি যে অবসাদ, মনরোগ, এমন অনেকগুলো সমস্যা কোনওদিনই উধাও হবে না, তাদের মেনে নিয়েই আধুনিক জীবন আমাদের কাটাতে হবে। ছোটোদের বইয়ের “সব ভাল যার শেষ ভাল” আশাবাদের আখর ভেঙে এই বিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ এ ধরণের গল্প শিশু বা কিশোর পাঠকদের অন্যভাবে তৈরী হতে শেখায়। করোনা অতিমারীর গোড়ার দিকে একটি সমীক্ষা আমাদের জানিয়েছে, ২০২৩ সালের মধ্যে মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন (এর বাংলা মনখারাপ নয়, এ’টি একটি অসুখ) বিশ্বজুড়ে মহামারীর আকৃতি নেবে। আসন্ন সেই পৃথিবীতে আমাদের প্রয়োজন, মানসিক রোগকে দূর জঙ্গল থেকে ছুটে আসা রাক্ষস নয়, পাশের বাড়িরই প্রতিবেশীর মত দেখতে শেখার সাহস। তাকে নিয়েই ঘর করতে হয়, সে মাঝেমাঝেই সব ওলোট-পালট করে দেয়, আবার তার মধ্যে থেকেই নতুন জীবনের হিসেব কষে নিতে হয়, এ শিক্ষা যে ধীরে ধীরে ছোটোদের গল্পেও ঢুকতে শুরু করেছে, তা ভবিষ্যতের ব্যাপারে ভরসা দেয়।

শেয়ার করুন

0Shares
0
বিবিধ সাম্প্রতিক