ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বৈচিত্রময় শান্তিচুক্তির ইতিহাস

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বৈচিত্রময় শান্তিচুক্তির ইতিহাস

অনন্যা মাইতি: ভারত এবং পাকিস্তান এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সুদীর্ঘ কয়েক দশকের বৈচিত্র্যময় শান্তি-অশান্তি ভঙ্গ ও স্থাপনের ইতিহাস সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।

তবে এই দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা উত্তেজনা নতুন নয়। দেশ ভাগের পর থেকেই চলছে উত্তেজনা, যার বড় কারণ কাশ্মীর।

ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই কাশ্মীর নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল।
ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাস ঘাঁটলে হতাশা, আশা, আস্থা ও অবিশ্বাস মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।
আলোচনার টেবিলের কথোপকথন এবং বাড়ি ফেরার পরের ঘটনাগুলির অসঙ্গতি কয়েক দশক ধরে এই মানসিকতার জন্ম দিয়েছে। যখন এক পক্ষ আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে, তখন অন্য দেশ সিদ্ধান্তভঙ্গকে বেছে নেয়।
যখন উভয় দেশের সেনাবাহিনী ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ সালের ঘোষণা অনুযায়ী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সময় থেকে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই মানুষের সাধারণ প্রতিক্রিয়ায় সন্দেহ ও অবিশ্বাস লক্ষ্য করা গেছিল। এমনকি প্রচণ্ড আশাবাদীদের মধ্যেও ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের সন্ত্রাসী হামলার ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে সেই সন্দেহ দানা বেঁধেছিল।

পাকিস্তান দ্বারা প্রশিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত বন্দুকধারীদের দ্বারা পরিচালিত হামলা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে তলানিতে পাঠাচ্ছে। পাঠানকোট থেকে পুলওয়ামা, সব জায়গায় আন্তঃসীমান্ত আলোচনা ও গৃহীত সিদ্ধান্ত একের পর এক দুর্ঘটনার দ্বারা ব্যর্থ হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ কোনও সিদ্ধান্তের সম্মান দেয়নি।

সংশয় ঠিক প্রমাণিত হয়েছিল যখন ইমরান খানের সরকার ভারত থেকে চিনি ও তুলা আমদানির প্রস্তাব সরিয়ে রাখে। এই পদক্ষেপটি প্রমাণ করেছিল, ভারতের সাথে “কোনও সম্পর্ক নেই” সূচক ইঙ্গিত। ২০১৯ সালের ৫য়ই আগস্ট  জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া পর্যন্ত ইসলামাবাদ তার বিবৃত অবস্থান থেকে নীতি পরিবর্তনের ইচ্ছা এভাবেই প্রকাশ করেছিল।

এই বিষয়টি সম্পর্কে আবার পাকিস্তানের লেখক এবং বাণিজ্যোদ্যোগীদের পরস্পর বিরোধী মতামত পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রখ্যাত সাংবাদিক তথা একসময় পাঞ্জাবের তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী নাজম শেঠি বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেছিলেন যে অর্থমন্ত্রী হাম্মাদ আজহারের নেতৃত্বে ফেডারেল মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক সমন্বয় কমিটি (ইসিসি) প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়াই সরানো হতে পারে। তাঁর মতে, খান নিজেই “নিজের ব্যাট” চালিয়েছেন বা “উচ্চতর” কর্তৃপক্ষের (সেনাবাহিনী) দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। শেঠী এটিকে, ‘ইউ-টার্নের ইউ-টার্ন’ বলে ব্যাখ্যা করেন। ভারতের সাথে আলোচনার বিরোধী অবস্থান থেকে জম্মু এবং কাশ্মীরের পরিবর্তিত অবস্থা পুনরুদ্ধার হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি এভাবেই চলতে থাকে।

এখন প্রধানমন্ত্রী ৩৭০ ধারা পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত কিছুই করবেন না বলে মন্তব্য করেছেন। যেহেতু এটি হওয়ার কোনও সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না, তাই তাড়াতাড়ি  অন্য কোনও ইউ-টার্নের জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি ট্যুইট করে জানিয়েছিলেন।

তবে রাওয়ালপিন্ডি এবং বেসামরিক সরকারের মধ্যে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যোগাযোগের ব্যবধান  কীভাবে থাকতে পারে তা নিয়ে তাঁর মতামত অবশ্য অব্যক্ত রয়েছে। প্রশ্নটিও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক কারণ বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া, যিনি প্রথমে পাকিস্তান ও ভারতের পক্ষে “অতীতকে  ভুলে গিয়ে এগিয়ে যাওয়ার” জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের আর্মি জেনারেলের কোনও মন্তব্য এখনও অব্দি পাওয়া যায়নি। তিনি ১৮য়ই মার্চ ইসলামাবাদ সুরক্ষা সংলাপে তাঁর নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ এবং নিশ্চিতভাবে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের মূল চাবিকাঠি। ভারতের সাথে এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে “ম্যাচিওর্ড” আচরণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে এগিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। সূত্রটি একটি নতুনত্বের আশা জাগিয়েছিল সন্দেহ নেই। এটি একটি কাঙ্খিত “রোড ম্যাপ” হলেও কিভাবে এটি কার্যকরী করা সম্ভব সে বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

পাকিস্তানি দৃষ্টিকোণ থেকে, ভারত থেকে আমদানি সীমিত হলেও ব্যবসা এবং অর্থনৈতিকক্ষেত্রে তা যথেষ্ট লাভজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় চিনির ঘাটতি এবং সুতির পোশাক শিল্পে পাকিস্তানে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল। কাশ্মীরে অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য বাজওয়া এবং খানের নয়াদিল্লির সাথে কথোপকথন পুনরায় সেই বীজ বপন করেছিল।

ইসিসির প্রস্তাব মন্ত্রীসভায় গৃহীত হওয়ার আগে শেঠি মন্তব্য করেন, ভারতে ৩৭০ বিলুপ্ত হবার পর তাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন এবং ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দিলেও পরে তাঁরা বিষয়টি মেনে নেন এবং ভারতের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

কাশ্মীরের অনুকূল ও পরিবেশবান্ধব পরিবেশ তৈরির আহ্বানে প্রত্যাখ্যাত ভারতকে প্রত্যাখ্যান না করেই পাকিস্তানের “বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল”-এ ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন এই খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিকভাবে স্পষ্টতই  সিভিল-মিলিটারি প্রতিষ্ঠানের শান্তি পদ্ধতির কোনও স্মৃতি ছিল না যা ২০০৩ সালের সীমান্ত যুদ্ধের আগে এবং ভারতের সাথে পুনরুদ্ধারের জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল।

২০০১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সংসদে সন্ত্রাসবাদ হামলা “অপারেশন পরাক্রম”এর পর বাজপেয়ী ২০০৩ এর এপ্রিলে শ্রীনগরে তাঁর বিখ্যাত “হ্যান্ড অফ ফ্রেন্ডশিপ” বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের মধ্যে অনেকের মধ্যেই গভীর ছাপ ফেলেছিল। তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা  তাঁর “রিলেন্টলেস: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি” গ্রন্থে তা স্বীকার করেছিলেন।

বাজপেয়ীর বক্তব্যের এই প্রস্তাবটি জনসমক্ষে প্রচারের আগে বাজপেয়ী যে পরিকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন উভয় পক্ষের সেনাবাহিনী এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেদের সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করে। কার্গিলে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারীতে নওয়াজ শরীফের আমন্ত্রণে তাঁর লাহোরে যাত্রা এবং ২০০১ সালে জেনারেল পারভেজ মোশারফের সাথে আগ্রার শীর্ষ সম্মেলনে দু’দফা বিশ্বাসঘাতকতার পরে আরেকটি শান্তিচুক্তির পক্ষে জনগণের সমর্থন আদায় করা কষ্টসাপেক্ষ ছিল।

প্রত্যেকবার দুই দেশের শীর্ষনেতৃত্বের শান্তিস্থাপনের উদ্দেশ্যে বৈঠক ও কথোপকথন এবং জনসাধারণের মধ্যে উদ্দীপিত আশা ও আকাঙ্খা দীর্ঘদিনের একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। পাকিস্তানে ভারতীয় সংসদ সদস্যদের সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের তিনদিনের একটি সফর আয়োজিত হয়েছিল যার মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্যরাও ছিলেন। এই সফরে ভারতীয় নেতারা, বিশেষত জাতীয় জনতা দলের লালু প্রাসাদ যাদব পাকিস্তানে কল্পনাতীত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

প্রায় রাতারাতি গভীর বন্ধুত্ব বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সমস্ত মিডিয়া কভারেজ জনমানসে প্রশান্তির আবহাওয়া সৃষ্টি করেছিল। সংবাদপত্রের শিরোনামে, টিভি চ্যানেলগুলিতে, ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদ উপস্থাপক এবং সাংবাদিকদের আলোচনায় উভয় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল। এটি ২০০৩ সালের আগস্টের ঘটনা।

এই বছরেরই নভেম্বরে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছিল। জেনারেল মোশারফ পরিদর্শনকারী সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ব্রজেশ মিশ্র এবং তার পাকিস্তানি সমকক্ষ তারিক আজিজ সদাসর্বদা সক্রিয় ছিলেন।

কয়েক মাস পরে এই সৎ উদ্যোগগুলির ফলাফলও দেখা যায়  যখন বাজপেয়ী এবং মোশারফ ইসলামাবাদে ২০০৪ সালের জানুয়ািতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে  সমঝোতা স্মারক হিসেবে একটি “মেমোরেন্ডাম অফ্ আন্ডারস্ট্যান্ডিং”-এ স্বাক্ষর করেন যা বাজপেয়ীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতি হিসেবে পরিগণিত। চুক্তিটি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও অঞ্চলকে কোনওভাবেই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করার অনুমতি না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

যশবন্ত সিনহা সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বিবৃতিতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, পাকিস্তানে শুধুমাত্র ম্যাচ নয় পাকিস্তানীদের হৃদয়ও জয় করতে হবে আমাদের।

২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচন মার্চ-এপ্রিলের ক্রিকেট সফরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্ধারিত হয়েছিল। পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক  তিক্ততামোচনের সিদ্ধান্তটি বাজপেয়ীর সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত রাষ্ট্রনীতি হিসাবে বহুলচর্চিত। আমাদের ক্রিকেটাররা পাকিস্তানের ক্রিকেট এবং হৃদয় জয় করেই ফিরেছিলেন তবে বিজেপি সাধারণ নির্বাচন জিততে পারেনি।

বাজপেয়ী যে বৈদেশিক নীতি স্থাপন করেছিলেন তা উপমহাদেশীয় পুনর্মিলনের বিস্তৃত লক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছিল। তিনিই সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি যুদ্ধের পরিণতির বিরুদ্ধে শান্তিস্থাপনের ঝুঁকি নিতে পেরেছিলেন।

বাজপেয়ী রাষ্ট্রশাসন নীতি এবং এর ফলাফলের  প্রাসঙ্গিকতা আজও বিদ্যমান। শান্তি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কৌশলগত সন্ধান হিসেবে এটি একমাত্র কৌশল নয়। কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে তিনি বহুবিধ কৌশল অবলম্বন করেছেন।

মনমোহন সিংয়ের আমলের আলোচনায় তিনজন পাকিস্তানি মূল ভূমিকা পালন করেন― মোশারফ, আসিফ জারদারি এবং নওয়াজ শরীফ। মুম্বইয়ের ঘটনার সময় জারদারি ভারতকে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

প্রয়াত প্রণব মুখার্জি যেমন একবার  কোনও এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, কাশ্মীর সমস্যা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা চুক্তির মাধ্যমে সমাধান হওয়া মুশকিল তাই এটিই সর্বোত্তম উপায়।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মার্চ ২০১৯ সংখ্যায় একইরকম বহু যুক্তি দিয়ে পাকিস্তানের সুপরিচিত পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আহমেদ রশিদও অনুভব করেছিলেন যে ২০০৫―২০১৪ সাল পর্যন্ত দু’পক্ষের পক্ষে “এগিয়ে যাওয়ার পথ” আর মসৃণ ছিল না।

যেহেতু “বন্ধুত্ব” শব্দটির মধ্যে যৌথ উদ্যোগের ধারণাটি নিহিত আছে তাই, বন্ধুত্বের পথ মসৃণ করে তোলা একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে কতটা আগ্রহী সেটাই এখন দেখার।

শেয়ার করুন

0Shares
0
অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক