অবসর গ্রহণের পর কীভাবে আর্থিক পরিচালনা ও বিনিয়োগের জন্য স্ত্রীকে প্রস্তুত করবেন?

অবসর গ্রহণের পর কীভাবে আর্থিক পরিচালনা ও বিনিয়োগের জন্য স্ত্রীকে প্রস্তুত করবেন?

টিম যুগান্তর: ইউনাইটেড নেশান পপুলেশন ফান্ড দ্বারা পরিচালিত একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে যে, আর্থিক পরাধীনতা বয়স্ক মহিলাদের মানসিক দুর্বলতার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। সমীক্ষা অনুযায়ী, পাঁচজনের মধ্যে চারজনেরও বেশি মহিলার ব্যক্তিগত আয় নেই বা অতি অল্প আয় যা বয়স্ক মহিলাদের অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তোলে।

আমাদের ঠাকুমা, দিদিমা এবং পরিবারের বয়স্ক মহিলাদের হাতে ছিল সংসার পরিচালনার লাগাম। পরিবারের আর্থিক আয় ও ব্যয় কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। কিন্তু, বড় কোনও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু তাঁদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হত না। বরং, মহিলাদের এই  বিষয়গুলি থেকে সযত্নে দূরে রাখাই যেন নিয়মে পর্যবসিত হয়ে পড়েছিল।

গোঁড়া পিতৃতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা মহিলামহলকে আর্থিক সচেতনতা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে সরিয়ে রেখেছিল। বৃদ্ধা বয়সে যখন তাঁরা কোনওরকম বিপদের মুখোমুখি হন তখন তাঁদের আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য অসহায়তার শিকার হতে হয়। পরিস্থিতি সবথেকে খারাপ হয় যখন তাঁদের জীবনসঙ্গীরা আর্থিক সুরক্ষা দিতে অক্ষম হন কিংবা কোনও মহিলা বিধবা হন। আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই এই অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় ভারতবর্ষের অধিকাংশ মহিলাকে।

অবসরপ্রাপ্ত পুরুষরা কোনও প্রকার গোপনীয়তা অবলম্বন না করে যদি সক্রিয়ভাবে তাঁদের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি পরিবারের সাথে আলাপ আলোচনা করেন তাহলে তাঁদের স্ত্রীরা ভবিষ্যতের আর্থিক অবস্থা বা দুরাবস্থার জন্য অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ পরিকল্পনা করে রাখতে পারেন।

ইউনাইটেড নেশান পপুলেশান ফান্ড পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে মানসিক দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বয়স্ক মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কারণ মহিলারা প্রাথমিকভাবে আর্থিক সহায়তার জন্য স্বামীর উপর নির্ভরশীল। স্বামীর ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল স্ত্রীদের জীবনসঙ্গী হারানো মানে আর্থিক সাহায্য হারানো। আর্থিক অংশীদারত্ব হারিয়ে তাঁদের সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হওয়া বা স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া আর কিছু উপায় থাকে না। শিশুসন্তান থাকলে তো মহিলাদের অসম্ভব কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। পুত্রবধূ, ভাইবোনদের ও অন্যান্য আত্মীয়রাও এই দায় নিতে চায় না।

অ্যাক্সিম ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের সিইও দীপক ছাবরিয়া তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে জানাচ্ছেন, প্রায়শই এমন ঘটনা দেখা যায় যেখানে মহিলারা তাঁদের স্বামীর আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত থাকেন না। দুর্ভাগ্যজনক কোনও ঘটনায় স্বামী মারা যাওয়ার পর এটাও জানতে পারেন না তাঁর স্বামীর কতগুলি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল। এই বিষয়গুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব বহন করা সত্ত্বেও আর্থিক ক্ষেত্রে মহিলারা কতটা বঞ্চিত। বিষয়টি থেকে রেহাই পেতে প্রচুর প্রচেষ্টা এবং সময় দিতে হবে। স্বামীদের অবসর গ্রহণের পর স্ত্রীদের অর্থ সমস্যা সমাধানে সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে স্ত্রীদের অবগত করতে হবে।

স্বামীর উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল মহিলাদের সব সময় পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। সারাজীবন সেটা সম্ভব না হলেও তাঁদের স্বামীদের অবসর নেওয়ার সময় অবশ্যই সেটা শুরু করা দরকার। যেহেতু অবসর গ্রহণের পর নিয়মিত বেতন, স্বামীর অবসরকালীন তহবিল এবং বিনিয়োগের উপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়, তাই পরিস্থিতি যখন দাবী করবে তখন মহিলারা যেন সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

যদি আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও স্ত্রী উৎসাহিত হন, তবে স্বামীকে দায়িত্বসহকারে তাঁর স্ত্রীকে আর্থিক বিষয়গুলি পরিচালনার নিয়মকানুন, নতুন বিনিয়োগ কৌশল, বিনিয়োগে পরিবর্তন প্রভৃতি বিষয়ে সাধারণ ধারণালাভে সাহায্য করা প্রয়োজন।

অনেক মহিলার দৃষ্টিভঙ্গিতে, পুরুষদের মতো নারীদের বিনিয়োগক্ষমতা নেই। স্বামীরা বিনিয়োগ করতে যতটা সিদ্ধহস্ত মহিলারা ততটা নন। তাঁদের এটা বোঝানো হয় না যে, তাঁদের আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। বিনিয়োগ কৌশল কোনও রকেট বিজ্ঞান নয় এবং একবার তাঁরা নিজেরাই শুরু করলে বিষয়টি সহজ হয়ে পড়বে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পুরুষদের উচিত তাঁদের অর্থসংক্রান্ত বিষয়ে সমস্ত আলোচনা এবং সিদ্ধান্তে তাঁদের স্ত্রীকে সাথে নেওয়া। ট্যাক্স ফাইলিং এবং বিনিয়োগের একটি যৌথ অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণ নারীদের আস্থা অর্জনের পথ সুগম করতে পারে।

আর্থিক পরিচালনা ও বিনিয়োগে স্বামী স্ত্রীর অংশগ্রহণ সমানভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যাতে স্বামীর অনুপস্থিতিতে ও আর্থিক সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে স্ত্রীরা সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগগুলি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন। ছাবারিয়ার মতে, আর্থিক সহায়তার জন্য সবসময় পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের উপর নির্ভর করা কখনোই সুবুদ্ধির পরিচায়ক নয়। তাই সময়োপোযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এটাই সঠিক সময়। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত না নিয়ে থাকলে, স্বামীরা স্ত্রীর নামে কোনো বিনিয়োগ করে তা পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্ত্রীকে অর্পণ করা উচিত। যাতে স্ত্রীর ভবিষ্যৎ সহজতর হয়।

বিপদের সময় বয়স্ক মহিলাদের সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। পারিবারিক দুর্যোগ ঘটার আগে, স্বামী এবং পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র, ব্যাঙ্কের রেকর্ড, সম্পদের হিসেবনিকেশ ও তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে পরিবারের বাকি সদস্যদের অবগত রাখা উচিত। জরুরী পরিস্থিতিতে এটা প্রভূত সহায়ক হতে পারে।
স্বামীরা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এফডি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রেও যৌথ মালিকানা নিতে পারেন। স্ত্রীদের সাথে ব্যাঙ্ক কর্মীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে তাঁদের বোঝাপড়ার বিকাশ ঘটিয়ে তাঁরা আর্থিক সংস্থাগুলি থেকে কেমন পরিষেবা গ্রহণ করতে পারেন সে বিষয়ে স্ত্রীদের সাথে আলাপ আলোচনা করা উচিত।

৬০ এর বেশি বয়সী মহিলারা যারা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তাঁদের এ বিষয়ে সামান্য জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে খুব বেশি বিনিয়োগ না করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

স্বামীরা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এফডি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রেও যৌথ মালিকানাকে কাজে লাগাতে পারেন। এইভাবে আর্থিক পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রচেষ্টা স্ত্রীদের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক।

সাধারণভাবে একজন বিশ্বস্ত এবং পেশাদার আর্থিক উপদেষ্টা রাখা যেতে পারলে সবথেকে ভালো হয়।

অনলাইন লেনদেন এবং ব্যাঙ্কিং প্রক্রিয়াগুলির সাথে পরিচিতি অর্জন আর্থিক পরিষেবাগুলির ক্রমবর্ধমান ডিজিটাইজেশানে কারণে গুরুত্বপূর্ণ।  এছাড়াও ডিজিটাইজেশান এই জিনিসগুলি সহজতর করতে পারে । উদাহরণস্বরপ, বয়সের সাথে স্বাক্ষরের অমিল একটি সাধারণ সমস্যা যা ডিজিটাইজেশানের ফলে এড়ানো সম্ভব।

শেয়ার করুন

0Shares
0
বিবিধ সাম্প্রতিক