লিখছেন রূপম ইসলাম— ৫

লিখছেন রূপম ইসলাম— ৫

সেকুলার, লিবারাল এবং ‘প্রতিক্রিয়াশীল’

প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো কতকিছুই তো ঘটছে। আমি প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি না। আমি কি পিছিয়ে পড়ছি? আমি কি সুযোগ হারাচ্ছি? সঠিক সময়ে সঠিক কথাটি বলবার সুযোগ? মোক্ষম টীকা-টিপ্পনি কাটবার অনিবার্য সুযোগ? এরপরেও এ সমাজ আমায় মেনে নেবে? (সমাজচলতি এক্সপ্রেশন ব্যবহার করলাম।)

আসলে আলাদা করে প্রতিক্রিয়া ‘দেওয়ার’ বদভ্যেস আমার ছিল না বললেই চলে। যখনই কোনও খবরের কাগজের সাংবাদিক ফোন করে প্রতিক্রিয়া চেয়েছেন— আচ্ছা অমুক কাণ্ডটি ঘটেছে— অমুক লোকে অমুক কথাটি বলেছেন— অমুক রঙা জামা দারুণ বিক্কিরি হচ্ছে— অমুক খাবার খেলে লোকে তেড়ে আসছে— আপনার প্রতিক্রিয়া কী?— আমি উল্টে তাকেই প্রশ্ন করেছি— আমার প্রতিক্রিয়া? কেন? আমি কে কিছু বলবার? আমি কোন হনু?

সত্যিই কাউকে কাউকে এ কথা বলেছি। কাউকে আবার বলেছি আমার কাজ বিষয়ে প্রশ্ন থাকলে ফোন করবেন। নইলে না। কল রেকর্ডিং-এ এর প্রমাণ পাওয়া যাবে, থাকলে।

না, না— এর মানে এই নয় যে আমি একটি জড় পদার্থ, আমার মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া তৈরিই হয় না। হয়, নিশ্চয়ই হয়। তবে মনে করি না হাটবাজারে তা সব্বাইকে জানাবার মতো কোনও পটভূমিকা আছে বা সেরকম পদমর্যাদা আছে আমার। বস্তুতপক্ষে প্রতিক্রিয়ার পর প্রতিক্রিয়া সাজিয়েই ফেসবুক জিনিসটা তৈরি হয়েছে। মুড়ি মিছরির একদর করে দিয়েছে ফেসবুক। সবাই ভাবছে ফেসবুক একটা স্টেজ। ফোনের টাইপযন্ত্রটি মাইক। সব্বাই একেকজন গণ্যমান্য। সবাই বক্তব্য রাখবে। শুনবার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে শ্রোতাসমূহ। দুঃখিত— কিন্তু আমি এই সহজমঞ্চপ্রাপ্তিতে বিশ্বাসী না।

আমি একেবারে কথাই বলতাম না প্রায়। সাত চড়ে রা কাড়তাম না বলেই কখনও কথা বললে তার একটা প্রাবল্য তৈরি হত। সেই প্রাবল্য ধাক্কা মেরে মেরে আমার গানগুলো তৈরি করিয়ে নিয়েছে। ফলে গানগুলোও হেলাফেলার হয়নি। ওজন আছে। রেডিয়োতে ভেসে আসাটা ওই সমস্ত গানের একেবারে উপরের আস্তরণ ছিল। নুন ছাল ছিল বলি? একটু গভীরে যারা নেমেছে— তারা রক্ত মাংসের অস্তিত্ব বুঝেছে। তাদের একত্র হতে আমি দেখেছি সারা পৃথিবীর অডিটোরিয়ামগুলোতে। আমি শুনেছি তারা আমায় তাদের প্রতিনিধি করে আমার নামজপ করছে। একমাত্র তখনই, হ্যাঁ তখনই নিজেকে শক্তিমান মনে হয়েছে। একমাত্র তখনই মনে হয়েছে—

সুবহ সাদিকে
তোরা জড়ো হ’ ময়দানে
আমারও কিছু কথা বলার আছে

অতএব অনায়াসে পাওয়া, দুটো আঙুলের কারিকুরিতে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলা ফেসবুককে আমি অ্যাকাউন্টেবল একটা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ জায়গা বলে আদৌ মনে করি না।


আমি প্রতিক্রিয়াশীল শব্দটি বলতে সাধারণ বিচারে বুঝি— যা প্রতিক্রিয়া দেয়। প্রতিক্রিয়া সব সময়ে বিপ্লবের বিরুদ্ধেই হতে হবে কেন? বিপ্লব নিজেই তো একটা তীব্র প্রতিক্রিয়া।

প্রতিক্রিয়াশীল শব্দটা শুনে অন্য খাতে বয়ে যাবেন না আবার। একটি রাজনৈতিক মতবাদ এই শব্দটাকে একঘরে করে দিয়েছিল। আমি এর স্বাভাবিক অর্থে এটাকে ব্যবহার করি এবং এক অর্থে এর শাপমুক্তি ঘটাই। আমিই করি— এ কথাটা বাধ্য হয়েই বলছি কারণ আমি ‘প্রতিক্রিয়াশীল কোনও বিপ্লবে’ (ইচ্ছে করেই বিপ্লবের কনটেক্সটে শব্দটাকে বসাই) লিখবার আগে পর্যন্ত শব্দটাকে ইতিবাচক অর্থে কেউ ব্যবহার করেছেন বলে শুনিনি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের যুগান্তর পত্রিকায় একটা ইন্টারেস্টিং লেখা খুঁজে পেয়েছিলাম, মাহবুব কামালের লেখা, যাতে তিনি এ ধরনের কিছু ভাগ্যদুষ্ট শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। সে শব্দতালিকায় ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ছাড়াও ছিল ‘রাজাকার’ (মূল অর্থ— সহযোগী, পরিবর্তিত অর্থ— বিশ্বাসঘাতক/ শত্রুর সহযোগী), সাম্প্রদায়িক (মূল অর্থ— সম্প্রদায়ভুক্ত, ব্যবহারিক অর্থ— অন্য ধর্ম সম্পর্কে উদার নন যিনি)। আমি প্রতিক্রিয়াশীল শব্দটি বলতে সাধারণ বিচারে বুঝি— যা প্রতিক্রিয়া দেয়। প্রতিক্রিয়া সব সময়ে বিপ্লবের বিরুদ্ধেই হতে হবে কেন? বিপ্লব নিজেই তো একটা তীব্র প্রতিক্রিয়া। আমাদের ক্লাস এইটের শ্রেণীকক্ষে যখন শিক্ষক শ্রী চিত্ত রায় আমাদের ফরাসি বিপ্লব পড়াতেন— আমরা জেনেছিলাম বিদ্রোহ কোনওদিন অকারণে ঘটে না। দীর্ঘদিনের নিপীড়ন মানুষকে প্রতিরোধের রাস্তায় যেতে বাধ্য করে। সেটাই হয়ে দাঁড়ায় তার যন্ত্রণালব্ধ প্রতিক্রিয়া। বর্তমান ভারতের কৃষক অভ্যুত্থান দেখে, বা দিল্লীর শাহিনবাগে দরিদ্র মানুষের আর্তি দেখে তাই তাদের পক্ষ নিতে আমার দ্বিধাবোধ হয়নি— কারণ শ্রী চিত্ত রায়ের শিখিয়ে দেওয়া ওই কথাটা— মানুষ ঠেকায় না পড়লে আন্দোলন করে না।

একটু আগেই ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দটি নিয়ে আলোচনায় ‘উদার’ শব্দটি এল। ‘উদারপন্থী’ বা ‘লিবারাল’-দের নিয়ে বলব। তার আগে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দু’চার কথা নিবেদিতং। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবহে আমাদের সংবিধানস্বীকৃত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি আমাদের প্রবল প্রতাপময় পরাক্রান্ত শাসকের চোখে বড্ড অসূয়া ঠেকে। তাঁরা যখন ‘সেকুলার’ শব্দটিকে গালি দেন, আমরা যারা নিজেদের লিবারাল বা মুক্তমনা বলে মনে করি, আমাদের তা স্বাভাবিকভাবেই সংবিধানের ওপর আঘাত বলে মনে হয়। এরপর নিয়ম করে তাঁদের সেকুলার বিরোধী উক্তির পেছন পেছন লেজ নাড়তে নাড়তে আসে কুযুক্তি। না আমরা তো গালি দিইনিকো— আমরা উক্ত শব্দটির ভুল ব্যবহারের প্রতিবাদ করেছিলুম মাত্র।

তাঁদের বলি— আহা বাছা, গালি দেবার আগে বুঝিয়ে বলতে পারতে তো। আলোচনার সুর তৈরি হত। তা না করে একেবারে গালি দিয়ে ফেললে। বার্তাও চলে গেল জায়গায় জায়গায়। উফ গুরু অ্যাকশন শুরু। তারপর কথা ঘুরিয়ে কী লাভ।


‘বুদ্ধিজীবীরা সমাজের বোঝা, রাজনীতি করলে শিল্পীদের রগড়ে দেব’— এসব কথা প্রতিক্রিয়াহীনভাবে, পোকার ফেসে শোনা অলরেডি প্র্যাকটিস করেছি। ভাবিনি মোটেই। শুধু শুনেছি। ভাবলে তো মনে পড়ে যেত সেই সব শিল্পীদের কথা যাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান আলো জ্বালিয়েছে বারবার।

ও বাবা, এখন দেখি আরেক মতবাদ বাজারে করে খাচ্ছে। আমরা, সেকুলাররা তো খারাপ ছিলামই, এবার শুনছি (আরেক দল বলছেন)— লিবারালরা হল সবচেয়ে খারাপ। আমাদের এসব কথা শুনতে হবে। নিয়ম করে শুনতে হবে। ‘বুদ্ধিজীবীরা সমাজের বোঝা, রাজনীতি করলে শিল্পীদের রগড়ে দেব’— এসব কথা প্রতিক্রিয়াহীনভাবে, পোকার ফেসে শোনা অলরেডি প্র্যাকটিস করেছি। ভাবিনি মোটেই। শুধু শুনেছি। ভাবলে তো মনে পড়ে যেত সেই সব শিল্পীদের কথা যাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান আলো জ্বালিয়েছে বারবার। মুকুন্দ দাসের রাজনৈতিক গান আমরা ভুলতে পারতাম? ভুলতে পারতাম রজনীকান্তের ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’? ভুলে যেতাম রবীন্দ্রনাথের রাখীবন্ধন, নাইট উপাধি ত্যাগ? ভুলে যেতাম কি নজরুলকৃত অনুবাদে ‘অন্তর ন্যাশনাল সংগীত’? ভুলতে পারতাম সদ্য নোবেল প্রাইজ পাওয়া বব ডিলানের রাজনীতি? কাজেই একদম ভাবছি না এসব। ভেবে দেখছি না ভোটদানের অধিকারও, দলগুলোর বা নেতানেত্রীর পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলাও কিন্তু আসলে ‘রাজনীতি করা’। শিল্পীদের রাজনীতি করা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে ভোটদানের অধিকারও কেড়ে নিতে হবে। তারপর বলতে হবে— সব সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে একেকজন অপ্রকাশিত শিল্পী। অতএব সাধারণ মানুষ এবার থেকে আর রাজনীতি করবে না। ভোটদানও যে রাজনীতি! তাই শিল্পীরা শুধু নাচবে আর গাইবে। সাধারণ মানুষ যাত্রা শুনতে যাবে। আমরা নেতারা, ভোট নিজেরাই দিয়ে নেব এখন। ভোটে জিতলে আমরা শিল্পীদের পুরস্কারও দেব। একটা পুরস্কার না, দু-দুটো পুরস্কার। নোবেল এবং অস্কার। আমি এসব শুনে কিছুই ভাবব না, আড়চোখে শুধু দেখব রগড়টা। রগড়ানি খাওয়া হজম করে কোন কোন সিল্পী (অন্য বানান ব্যবহার করলাম) ওই পুরস্কার হাতে তোলে। অতএব ওই যে বললাম। আমি এসব নিয়ে ভাবছি না, ভাবব না। শুধু শুনব। এবং দেখব। অ্যাবসোলিউট ভাবলেশহীন মুখে।

এর মাঝখানে একদল আপাত শিক্ষিত এবারে যখন বলতে আরম্ভ করলেন— লিবারালরা হল সবচেয়ে খারাপ— এবারে আমি কিন্তু শুধু শুনছি না। আশ্চর্য হচ্ছি। ভাবছিও। ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ এই কয়েকদিন আগে পর্যন্তও শিক্ষা, সে পুঁথিগত হলেও, কতকিছুর মাপদণ্ড ছিল। এই নতুন মতবাদ শুনে ‘শিক্ষা’ শব্দটা শ্রদ্ধা হারাচ্ছে বৈকি।

এক অমুকপন্থী বন্ধুর সঙ্গে এই বিষয়ে অনেকটা কথা হল। তিনি জানালেন— লিবারাল শব্দটাও নাকি মুক্ত স্বাধীন শব্দ নয়। এরও আবার পার্টি লাইন আছে। পার্টি লাইনে ‘লিবারাল’ মানে আমি যা ভাবছি তা নয়। এসব শোনবার পর মনে হচ্ছে, যে যাই বলুক না কেন— বিবিধ প্রশ্নমালার সব অঙ্কই এবার থেকে পার্টি লাইন দিয়ে গুণভাগ কাটাছেঁড়া করতে হবে। কিন্তু আমরা যারা কোনওদিন কোনও পার্টি লাইনের ধারপাশ মাড়াইনি— সেই সব লোকেদের কী হবে? আমাদের ‘লিবারাল’ সংজ্ঞাটাই কি মুক্ত সংজ্ঞা, প্রকৃত সংজ্ঞা নয়? শব্দটাকে হাইজ্যাক করবার অধিকার, অর্থ বদলে নেওয়ার অধিকার কবে তোমাদের দিয়েছিলাম আমরা, যে এখন শব্দটাকে নির্বিবাদে কালিমালিপ্ত করবে? এত বড় কথা বলে বসবে— ‘লিবারালরা হল সবচেয়ে খারাপ’? এই সাহস তোমরা পাও কোত্থেকে?

তোমরা যথেচ্ছাচার করেছ। বার্তা ঠিক চলে গেছে জায়গায় জায়গায়। এর উত্তর তোমরা পাবে। উত্তর এক্ষুনি চেয়ো না। কিছুদিন প্রতিক্রিয়া দেওয়া থেকে আমি বিরত থাকছি। কারণ ফেসবুক আমার মঞ্চ নয়। ফেসবুক পৃষ্ঠা আমার কাজের প্রচারপত্র মাত্র। এই যে লেখাটা লিখছি, এর বিজ্ঞাপন সাঁটা থাকবে ফেসবুক পৃষ্ঠায়। তার বেশি কিছু থাকবে না। প্রতিক্রিয়াগুলো আপাতত তাই জমুক।

জমানো সব কথা আজ অযথাই
মুখ ঢাকে লজ্জিত পর্দায়
আর বালিশেরা জীবন্ত হয়ে উঠে
সান্ত্বনায় আমাকে জড়ায়

আমি জানি আমার মতো অনেকেই তাদের না বলতে পারা কথাগুলো নীরবে জমিয়ে রাখছে। আমি মুখ খুলব। ওদের জনপ্রতিনিধি হিসেবেই আমি কথা বলব। চিৎকার করব। যা করব ওদের হয়েই করব। আমার সেকুলার এবং লিবারাল শ্রোতাদের হয়েই বলব আমি আমার কথাগুলো।

একবার মঞ্চটা শুধু ফিরে পাই।

 

প্রচ্ছদ : অন্তরূপ চক্রবর্তী
ছবি : প্রশান্ত কুমার শূর

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive লিখছেন রূপম ইসলাম