মাত্র ৮০ টাকা দিয়ে পথ চলা শুরু করে নারী ক্ষমতায়নের যুগান্তকারী নজির গড়ল “লিজ্জত পাঁপড়”

মাত্র ৮০ টাকা দিয়ে পথ চলা শুরু করে নারী ক্ষমতায়নের যুগান্তকারী নজির গড়ল “লিজ্জত পাঁপড়”

অনন্যা মাইতি: বাঙালি― অবাঙালি, আমিষভোজী― নিরামিষভোজী, শুরুতে শেষ পাতে, বাচ্চা বুড়ো মোটামুটি সবাই পছন্দ করেন মুচমুচে পাঁপড়। আর পাঁপড় খেতে পছন্দ করেন অথচ “লিজ্জত” পাঁপড়ের নাম শোনেননি এ প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই খ্যাতির নেপথ্যে যে অসাধারণ ভাবনা ও উদ্যোগ রয়েছে সেটা হয়তো অনেকেই জানেন না।

১৯৫৯ সালের ১৫ই মার্চ দক্ষিণ বম্বের গিরগাঁও এলাকার এক বাড়ির ছাদে সাত জন গুজরাতি গৃহবধূ―যশবন্তিবেন, পার্বতিবেন, উজামবেন, বানুবেন, লাগুবেন, দিওয়ালিবেন, জয়াবেন একত্রিত হলেন। উদ্দেশ্য―স্বনির্ভর হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। সেদিন তাঁদেরও ধারণা ছিল না, ভারতীয় মহিলা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তাঁরা হতে চলেছেন চিরস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। বাড়িতে মজুত উপকরণ দিয়ে চার প্যাকেট পাঁপড় তৈরি করে পুরুষোত্তম দামোদর দত্তানি নামক এক ব্যক্তির সাহায্যে বাজারে বিক্রি করার জন্য অনেক দোকানে ঘোরার পর আনন্দজি প্রেমজি কোম্পানি নামক এক দোকানে সেই পাঁপড় বিক্রি হয় এবং গুণগত মানের জন্য চাহিদা বাড়তে থাকে। তখনকার বম্বে এতটাও উদার ছিল না যে, সাধারণ গৃহবধূকে ব্যবসাতে উৎসাহিত করবে। কিন্তু, সমাজসেবী এবং সার্ভেন্ট অফ্ ইন্ডিয়ার কর্ণধার ছগনলাল পারেখ তাঁদের অদম্য উদ্যমে অভিভূত হয়ে ৮০ টাকা দিয়ে সাহায্য করেন। মাত্র ৮০ টাকা নিয়ে শুরু হল সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত কুটির শিল্পবিপ্লব। প্রথম দিন ১ কেজি পাঁপড় বেচে আট আনা লাভ হয়েছিল। তারপর তো ইতিহাস। সেই ৮০ টাকা আজ ১৭ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। ৭ জন পরিণত হয়েছে ৪৫০০০-এ। ১৭ টি রাজ্যে রয়েছে মোট ৮২ টি শাখা। প্রথম থেকে কোনওদিনই একক মালিকানাধীন ব্যবসা ছিল না। “কো অপারেটিভ মুভমেন্ট” এই ব্যবসার বৈশিষ্ট্য। লাভ হলে সবার, ক্ষতি হলেও সবার। কয়েক বছর পর অর্থাৎ ১৯৬২ সালে এক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নামহীন সেই পাঁপড়ের জন্য “লিজ্জত” নামটি বেছে নেওয়া হয়।  গুজরাতিতে যার অর্থ হলো সুস্বাদু। নাম গুজরাতি হলেও কোন ভাষা, ধর্ম, বর্ণের সঙ্কীর্ণতার মধ্যে এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ ছিল না। কোনরকম টেকনিক্যাল, প্রফেশানাল স্কিল ছাড়া শুধুমাত্র নৈমিত্তিক রান্নাঘরের জ্ঞান সম্বল করে স্বামী পুত্র পরিবার সামলে তাঁরা হয়ে উঠলেন “বিজনেস উইমেন”। সংসারের বেড়াজাল টপকে অথচ সংসারে থেকে দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে আজ দিনে ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা রোজগার তাঁদের। রোজগারের টাকায় ছেলেমেয়েকে এআইএমএস , আইআইটির মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর উদাহরণও বিরল নয়। বাস্তবিকই “লিজ্জত” তাঁদের “ইজ্জত” দিল।

১৯৬৬ সালে সেই পাঁপড়ের কোম্পানির নাম “শ্রী মহিলা গৃহ উদ্যোগ” নামে রেজিষ্ট্রেশান করা হল।

উৎপাদন পদ্ধতিতেও তাঁরা স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন। অত্যন্ত সুচারুভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। সেন্টারে হয় “ডো নিডিং”। বাড়িতে হয় পাঁপড় তৈরি। কারণ, এতজন মহিলা একসাথে বসে কাজ করতে অনেকখানি জায়গা প্রয়োজন। তাই এই ব্যবস্থা। প্রতিদিন সকালে ‘ডো’ নিয়ে মহিলারা বাড়ি চলে যান। পরদিন সকালে তৈরি পাঁপড় নিয়ে কোম্পানির বাসে চেপে “লিজ্জত সিস্টার”রা পৌঁছোন সেন্টারে। সেখানে তৈরি পাঁপড় জমা দিয়ে প্রাপ্য মজুরি নিয়ে কোম্পানির বাসে চেপে বাড়ি চলে আসেন। সব কিছুর মধ্যেও “কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স” এবং “কোয়ালিটি কন্ট্রোল” এই দুটি বিষয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। সেজন্যই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত পাঁপড়ের স্বাদ একই রকম থাকে।

প্রয়োজনীয় উপকরণের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনও প্রকার আপোষ করেন না। আজও আফগানিস্তান থেকে হিং আমদানি করা হয় কাঁচামাল হিসেবে। দেশে বিদেশে তাঁদের রমরমা ব্যবসার কারণ এগুলোই।

আজ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বিলিয়ন কেজি পাঁপড় উৎপাদিত হয়েছে যা গুণগত এবং আকৃতিগতভাবে সমান। কোম্পানি থেকে প্রত্যেকেকে দেওয়া হয় সমান মাপের অ্যালুমিনিয়াম বেলন চাকি যাতে উৎপাদনের মান সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না উঠতে পারে।

শুধুমাত্র পাঁপড় নয়। ক্রেতাদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে সাবান, মশলা, লঙ্কা, ডিটারজেন্ট, রেডিমেড চাপাটিও বানাচ্ছেন তাঁরা।

সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে উৎপাদন। কিন্তু, ব্যবহৃত হয়নি কোনও প্রযুক্তি। উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন পড়লে বাড়ানো হয়েছে “লিজ্জত সিস্টার”দের সংখ্যা। কারণ তাঁরা চান, লভ্যাংশ
বন্টিত হোক বাড়ির মহিলাদের মধ্যে যাঁরা সারাজীবন রান্নাঘরে বেগার খাটার জন্য জন্মগ্রহণ করেননি। মুনাফা অর্জন যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হতো, যশবন্তিবেন আজ বিলিয়নিয়ার হতেন।

কোম্পানির “ফাউন্ডেশান পলিসি” দাঁড়িয়ে আছে শক্ত ভিতের ওপর। সাপ্লায়ার এবং ডিস্ট্রিবিউটার কারোর কাছে কোনো ধার বাকির ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কোম্পানির নীতি নিয়মগুলি
অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হয়। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা, কোনপ্রকার গুজব সৃষ্টি করা, নিজেদের মধ্যে রেষারেষি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যে যার মত কাজ করে স্বনির্ভর হওয়াই একমাত্র উদ্দেশ্য। একজন সাধারণ গৃহবধূ পাঁপড় তৈরি করতে এসে নিজের যোগ্যতাবলে বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করতে করতে কোন শাখার প্রধান হয়ে যেতে পারেন। আবার সেই কর্ণধারদের মধ্যে থেকেই মুম্বইয়ের প্রধান কার্যালয়ে গঠিত ২১ সদস্যাবিশিষ্ট মুখ্য পরিচালন সমিতির সদস্যাও হয়ে যেতে পারেন। হতে পারেন কোম্পানির কোষাধ্যক্ষ, সভাপতি, সহ সভাপতি।

পুরুষ কর্মীদের কেবল সহায়ক, ড্রাইভার বা অন্যান্য কাজে নিযুক্ত করা হয়।

বিভিন্ন কারণে “লিজ্জত” অন্যান্য কোম্পানির থেকে আলাদা। যন্ত্রনির্ভরতার থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, মুনাফা অর্জনের থেকে সামাজিক উন্নয়ন, লভ্যাংশের থেকে প্রয়োজন এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৯৮-৯৯ এবং ২০০০-২০০১ সালে লিজ্জত “বেস্ট ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ ইনস্টিটিউশান” পুরস্কার, ২০০২ সালে “বিজনেসউইমেন অফ্ দি ইয়ার” পুরস্কার জিতে নেয়।

প্রতি বছর কোম্পানির যা লাভ হয় তা থেকে মহিলা কর্মীদের ৫ থেকে ১০ গ্রামের মুদ্রা “বোনাস” হিসেবে দেওয়া হত। সারা জীবনে একজন মহিলা মোটামুটি ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের সোনার মুদ্রা পেতেন। মহিলা ক্ষমতায়নের এমন উদাহরণ ভারতবর্ষে বিরল।

এমন রূপকথার মতো উত্থান, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার কাহিনীকে বিষয়বস্তু করে বলিউডে তৈরি হচ্ছে সিনেমা। ভারতবর্ষের মতো পিতৃতান্ত্রিক দেশে তদানীন্তন সমাজে মহিলা ক্ষমতায়নের এমন দৃষ্টান্ত প্রশংসনীয়।

নিঃশব্দ বিপ্লব একেই বলে।

শেয়ার করুন

0Shares
0
বিবিধ সাম্প্রতিক