সত্যজিতের রবীন্দ্রপর্ব

সত্যজিতের রবীন্দ্রপর্ব

কলকাতা বসু: ১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথ নিজের নাটক ‘নটীর পূজা’-র চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন। মাত্র চার দিনে গোটা ছবির দৃশ্যায়ন সম্পন্ন হয়েছিল। নিজে স্বয়ং উপালি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আর ছিল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা। চলচ্চিত্র নিয়ে একটা ভাবনা কাজ করছিল রবীন্দ্রনাথের মগজে বেশ অনেকদিন ধরেই। ১৯২৯ সালে শিশির ভাদুড়ির পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি ‘বিচারক’ ছবিটি মুক্তির পর মুরারি ভাদুড়িকে লেখা রবীন্দ্রনাথের সে সময়ের একটি চিঠিতে চলচ্চিত্র নিয়েই ছিল মূল আলোচনা। এ সময়ে তাঁর ‘তপতী’ নিয়ে ছবি করার কথাও ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩০ সালে জার্মানির মিউনিখে বসে লিখে ফেলেছিলেন ‘দ্য চাইল্ড’ নামে একটি চিত্রনাট্য। ‘শিশুতীর্থ’ নামে তাঁর অনবদ্য কবিতাটিও সেই কাহিনি ধরেই লেখা হয়েছে। কিন্তু তিনি খুব দ্রুত অনুধাবন করেছিলেন লেখালিখির জন্য যা খুব বেশি দরকারি নয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে তা খুব জরুরি— অর্থ। এই কারণেই হয়তো এ পথে রবীন্দ্রনাথ নিজে আর বেশি দূর সিনেমা নিয়ে অগ্রসর হননি।

সত্যজিতের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি নেই দেখে “দ্য ইনার আই”( সত্যজিতের জীবনী)-এর লেখক অ্যান্ড্রু রবিনসনের জিজ্ঞাসা ছিল সমকালীন সংস্কৃতিবান বাঙালিদের মতো তাঁর ঘরের দেওয়ালে কেন রবি ঠাকুর নেই। এ প্রশ্নের জবাবে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘সাচ আ ক্লিশে’। রবীন্দ্রনাথের কাজের প্রায় সিকি ভাগ নিয়েও চৰ্চা না করে তাঁকে “গুরুদেব” বা “ঈশ্বর” বা বলা ভাল “লার্জার দ্যান লাইফ” বানানোর যে চিরায়ত বঙ্গীয় মূঢ়তার প্রতিফলন ঘটছিল সুশীল বঙ্গসমাজে (এখনও সেই পরম্পরায় বিরাম নেই), সত্যজিৎ তার ধার ধারেননি।

অথচ রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুপ্রেরণায় ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক চলচ্চিত্র পরিচালক সিনেমা বানাতে চাইলেও সত্যজিতের সৃষ্টিতেই তা পূর্ণতা পেয়েছে, এ কথা বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। একটু ফিরে যাওয়া যাক সত্যজিতের কিশোরবেলায়। যদিও এ গল্প প্রায় সকলেরই জানা। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম। আর পিতা সুকুমার ছিলেন বিশ্বকবির পরম স্নেহভাজন। মা সুপ্রভা রায়ের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা দেখতে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ। বালক সত্যজিৎ রায়কে ‘মানিক’ নামেই চিনতেন রবীন্দ্রনাথ। সেবার প্রবীণ রবি ঠাকুরের কাছ থেকে শখের অটোগ্রাফের খাতাতে উপহার নিয়ে এলেন আট লাইনের ভুবনজয়ী কবিতা। সম্ভবত বালক বয়সেই বিশ্বকবির এই আটটি লাইন অজান্তেই অদ্ভুত স্বতঃস্ফূর্ততায় গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল সত্যজিতের মগজে ও চেতনায়। যে কারণে চেতনায় বিশ্বজনীন হলেও বিষয়ে দেশজ হতে পেরেছিলেন তাঁর পেশাদার জীবনে।

অর্থনীতিতে স্নাতকের পর মায়ের পিড়াপিড়ি আর রবিঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধাবশত ১৯৪০ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যজিৎ ভর্তি হলেন ছবি আঁকা শিখতে । তখনকার বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখার্জীদের সান্নিধ্যে এসে প্রাচ্যকলা সম্পর্কে চর্চার সুযোগ ঘটে তাঁর। ভারতের প্রাচীনতম শিল্পের নিদর্শন অজন্তা-ইলোরা ঘুরে ভারতীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি সম্বন্ধে আরও গভীর শ্রদ্ধা জন্মায় সত্যজিতের।

চারুকলা শিক্ষা অসম্পূর্ণই ছিল তাঁর, পাঁচ বছরের পাঠ্যক্রম শেষ না করেই চাকরি নিলেন জুনিয়র ভিস্যুয়ালাইজ়ার হিসেবে বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা জে ডি কিমার-এ। কাজের সূত্রে লন্ডন ভ্রমণকালে ইতালির ক্লাসিক ছবি ‘বাইসাইকেল থিফ’ দেখে তিনি অনুভব করেন বিনোদনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এই চলচ্চিত্র পরিচালনা। বিখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোয়ার সান্নিধ্যে এসে তাঁর সেই সিনেমা প্রেম আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়।

১৯৬১ সালে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর ব্যক্তিগত অনুরোধে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ৫৪ মিনিটের তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন সত্যজিৎ। রবীন্দ্রনাথ মানবমুক্তির লক্ষ্যে রেখে গিয়েছিলেন সংস্কৃতির এক বিশাল রত্নভাণ্ডার। সত্যজিৎ তাঁর তথ্যচিত্রে বর্ণনার শুরুতেই উল্লেখ করেছেন এভাবে-‘এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর দেহাবসান ঘটলেও তিনি রেখে গেলেন এক মহান ঐতিহ্য, দাহের অনল যাকে আজ গ্রাস করতে পারেনি। এ ঐতিহ্য হল রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট শব্দ, সঙ্গীত ও কাব্যের ঐতিহ্য; চিন্তা ও আদর্শের ঐতিহ্য। তাঁর সৃষ্ট রচনা, গানে, সুরে রয়েছে আমাদের আজ এবং আগামীকে সঞ্চালিত করার অসীম ক্ষমতা।’

ভারতীয় নারীদের মনের অনুভূতির সফলতম চিত্রায়নে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে সত্যজিৎ রায়কে চেনেন গোটা বিশ্বের সিনেপ্রেমীরা। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রথম সারিতে রয়েছে ‘চারুলতা’ এবং ‘তিন কন্যা’। ১৯৬১ সালেই রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’, ‘পোস্টমাস্টার’ ও ‘মণিহারা ’ নিয়ে সত্যজিৎ তৈরি করেন ‘তিন কন্যা’। এক পোস্টমাস্টার এবং বারো বছরের কিশোরী রতনের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক নিয়ে এক অপূর্ব ছবি ‘পোস্টমাস্টার’। দুটি মানব হৃদয়ের ভালোবাসার অনুভূতির সঙ্গে বাস্তবতার রূঢ়তার সংঘাত অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে ওঠে সেলুলয়েডের পর্দায়।

‘পোস্টমাস্টার’-এর ট্র্যাজেডির একেবারেই বিপরীতধর্মী ছবি ‘সমাপ্তি’। কিশোরী বধু মৃন্ময়ীর গয়না সজ্জিত হয়ে বাসর ঘর থেকে গাছ বেয়ে পালিয়ে যাওয়া, পোষা কাঠবিড়ালি চরকির সঙ্গে তার উচ্ছল চপলতা― সবই যেন সেই প্রাচীন বাংলার কিশোরী বধূদের আবহমান ছেলেমানুষিকে বর্ণময় করে তুলেছে।

অন্যদিকে, ‘মণিহারা ’ ছবিটি সামগ্রিক ভাবেই রহস্যাবৃত। এক বিচিত্র নারী মনস্তত্ত্ব উদঘাটনের এই ছবিটিকে আবার ভৌতিক বা হরর ফিল্মের পর্যায়ে পুরোপুরিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা চলে না। ছবির শেষাংশে সোনার কঙ্কণ পরা কঙ্কালের হাতের নাটকীয় আবির্ভাব খানিক ত্রাসের সঞ্চার করে ঠিকই, তবে রহস্যের জাল কেটে বেরোনো যায়না পুরোপুরি।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে নির্মিত “চারুলতা” ছবিটিকে অনেকেই মনে করেন সত্যজিৎ- এর ত্রুটিহীন ছবিগুলির অন্যতম । ছবিটিতে চারুলতা নামের এক নিঃসঙ্গ গৃহবধূর বেদনা এবং পরবর্তীতে তার সম্পর্কের ঠাকুরপোর প্রতি ভালোবাসার অন্তর্দহন সত্যজিৎ যে কৌশলে ফুটিয়ে তুলেছেন তা অতিক্রম করে গেছে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সুনিপুণ কাব্যময়তাকেও। দেশের বাইরে ছবিটি নিয়ে উচ্ছ্বাসের কমতি না থাকলেও, নিজের দেশে ‘চারুলতা’র চিত্রনাট্য নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন সত্যজিৎ রায়। বেশকিছু চিত্র সমালোচক ছবিটির ‘নষ্টনীড়’-এর মূলগল্প থেকে সরে আসবার অভিযোগ করেন।

সত্যজিতের উত্তর “যখন কোনো কেতাবি পন্ডিত ‘নষ্টনীড়’ গল্পের উপসংহার ও ‘চারুলতা’ ছবির উপসংহারের মাত্রাগত তফাত খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন স্বভাবতই আমাদের বলতে হয়, This is surely the result of lopsided film education, lack of connoisseurship, and applies only to a country which took one of the greatest invention of west with the most far reaching artistic potential and promptly cut is down to size.”।

রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’র সফল চিত্রায়নের মাধ্যমে শেষ হয় সত্যজিৎ- এর রবীন্দ্র পর্ব। ছবিটিতে প্রথমবারের মতো একটি চুম্বন দৃশ্যের সংযোজন করা হয়। নিখিলেশ, বিমলা আর সন্দীপের ত্রিকোণ প্রেম এ গল্পের চুম্বক। আদর্শের ফারাকে কীভাবে সম্পর্ক আর বন্ধুত্ব প্রভাবিত হয়, কীভাবে আবেগী রোম্যান্স বস করে মানুষকে,তা রয়েছে এই গল্পে। ঘটনাচক্রে সত্যজিৎ রায় ১৯৪০-এর দশকে তাঁর প্রথম ছবি পথের পাঁচালী নির্মাণেরও আগে এই ছবির প্রাথমিক চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ। যদিও ১৯৮৫ তে এই ছবি নির্মাণের সময় সত্যজিৎ তাঁর অপরিণত বয়সে লেখা চিত্রনাট্যটির অনেক অংশই পুনঃসম্পাদনা করেন।

শেষ করব সত্যজিতের ছায়াছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার সম্পর্কে দু’চার কথা বলে। “পোস্টমাস্টার” ছবির আবহে সারিন্দা এবং দোতারার মতো আটপৌরে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করেছেন সত্যজিৎ। রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ আবহের গানকে বেহালার তারে বেঁধে সেই অনাড়ম্বর সুরব্যঞ্জনা দিয়েই বালিকা রতনের ছবি এঁকেছেন সত্যজিৎ। সংগীতের ক্ষেত্রে নিজের মৌলিকতা এবং স্বাধীন চিন্তা সত্ত্বেও, বারবার তিনি প্রভাবিত হয়েছেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনায়। “চারুলতা” ছবির একটি দৃশ্যে সংলাপের ব্যবহারের পরিবর্তে ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানটির সফল প্রয়োগ পুরো দৃশ্যটিকে অনেক বেশি অর্থপূর্ণ করে তুলেছে। তবে কিশোর কুমারের গাওয়া গানটি স্বরলিপিকে অনুপুঙ্খ ভাবে অনুসরণ করেনি বলে বিবিধ বিতর্ক হয়েছে।

এ প্রসঙ্গেও আমরা অবলম্বন করব সুভাষ চৌধুরীকে দেওয়া সত্যজিতের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার, যেখানে সুরারোপন বা গায়কীতে প্রচলিত রীতি ব্যবহারের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের সুর ও ছন্দ নিয়ে নিরীক্ষা প্রবণতাকে অনুকরণ অপেক্ষা নবীকরণ বলবার স্বপক্ষে সওয়াল করেছেন সত্যজিৎ। রবীন্দ্রসাহিত্য নির্ভর ছবির বাইরেও তাঁর ‘মহানগর’, ‘জনঅরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘আগন্তুক’, ‘গণশত্রু’ এবং ‘কাঞ্চনজংঘা’র মতো ছবিতেও রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।

আজ ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। আবার ইংরেজি’র ২০২১ সাল, চলতি মাসেই এই অনুজীবের পরাক্রমে আক্রান্ত জীবন-মৃত্যুর অসম্ভব দোদুল্যমানতাময় পৃথিবীতে শুরু হয়েছে সত্যজিতের জন্ম শতবর্ষ উদযাপন। সত্যজিতের রবীন্দ্রপর্বের চর্চার মধ্য দিয়েই সূচনা হোক নেতি থেকে ইতিতে উত্তরণের মানবিক অভিযাত্রা।

শেয়ার করুন

0Shares
0
বিবিধ সংস্কৃতি সম্পাদকের পাতা সাম্প্রতিক