ছত্রিশ বছর ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে যুবদের মানসিক বিকাশ, অগ্রসৈনিকের মত সামলাচ্ছেন পার্থ পাল

ছত্রিশ বছর ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে যুবদের মানসিক বিকাশ, অগ্রসৈনিকের মত সামলাচ্ছেন পার্থ পাল

বিশিষ্ট সমাজকর্মী পার্থ পালের সঙ্গে যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত কার্যনির্বাহী সম্পাদক অরিজিৎ লাহিড়ী’র আলাপচারিতা।

প্রায় দেড় বছর ধরে চলা কোভিড বিপর্যয়ে এবং অন্তর্বর্তী সময়ে দানবতুল্য ঘূর্ণিঝড় আমফানের প্রবল দাপটে যখন গঙ্গার পশ্চিমকূলবর্তী এই ভারতীয় অঙ্গরাজ্যে জনজীবন পর্যুদস্ত, বিপর্যস্ত জীবন ও জীবিকা যখন অজস্র মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র সাধারণ পরিবারের সকল আশার আলো ম্লান করে দিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমের দেওয়াল যখন আমাদের অনেকের আত্মীয়,পরিজনের অকস্মাৎ “নেই” হয়ে যাওয়ার শোকবার্তার ভারে ভারাক্রান্ত, ঠিক তখনই প্রায় সমস্ত প্রচারের আলোর অন্তরালে কেউ কেউ আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন নিজের― সম্পূর্ণ নিজের তাগিদে।

সুন্দরবন এলাকায় আমফান পরবর্তী ত্রাণ উদ্যোগে

আসুন ফিরে যাওয়া যাক,১৯৮৫’র দক্ষিণ কলকাতার শহরতলি বিজয়গড়ে। ক্লাস সিক্সের ছাত্র পার্থ পাল আর পাঁচজন ছেলে মেয়ের মত শুধুই খেলাধুলো আর পড়াশোনার রুটিনমাফিক প্রচলিত বিলাসিতায় গা না ভাসিয়ে ডক্টর শ্যামল বরণ মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় যোগদান করল বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সেবা প্রতিষ্ঠান রেড ক্রস সোসাইটির দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা শাখায়। তবে এই অপরিণত বয়সে পরিণতমনস্কদের মত সমাজসেবার আদর্শে ব্রতী হওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রভাবও যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে থাকবেই তা অনুমান করাই যায়। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে কনিষ্ঠতম পার্থ’র বাবার ছিল নিত্যব্যবহার্য রেশন সামগ্রী,কেরোসিন ও বাসের ব্যবসা। ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করতে করতে পার্থবাবু বলছিলেন “সেই সময়ে দূর্গাপুজোর মতোই একটা প্রায় উৎসব ছিল বন্যা। এলাকার বন্যাদুর্গতদের নিত্যদিন পাত পেড়ে খাওয়ানো এবং আশ্রয় দেওয়া ছিল আমার পরিবারের ট্রাডিশন। ” সমাজসেবার ব্যাপারে তার ধার্মিক, দানশীলা মা এবং ব্যবসা করেও প্রকৃত জনদরদী বাবার আদর্শ খুব ছোট বয়সেই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে।

সাউথ সিটি কলেজ থেকে বি.কম পাঠ্যক্রমে পড়াশোনার পর সল্টলেকের ভারতীয় বিদ্যাভবন থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ’র পড়াশোনার সাথে সাথেই চলেছে সামাজিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে। এরপর অবশ্য প্রাথমিকভাবে জীবিকার তাগিদেই শুরু করলেন মনিবালা এডুকেশন সেন্টার। কিন্তু, সেবার আদর্শ যার রক্তে, সে মানুষ কখনওই অর্থোপার্জনের ইঁদুর দৌড়ে সামিল হবে না সমাজের চিরায়ত অলিখিত নিয়মে। দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের, যাদের অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত তাদের দু’বেলা খাইয়ে পড়িয়ে মানুষের মতো মানুষ বানানোর লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন পার্থবাবু। আশি নব্বই শতাংশ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে তাঁরা আজ দেশে বিদেশে স্বকর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। “উচ্চমাধ্যমিকের আগে এক দু’মাস আমার বাড়িতেই ওদের আটকে দিতাম। খাইয়ে-দাইয়ে পড়া রিভিশন করিয়ে পরীক্ষার হল অবধি না পাঠিয়ে শান্তি ছিল না”, বলছিলেন পার্থবাবু।

ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের মানসিক ও নান্দনিক বিকাশের জন্য তাঁদের লেখা সম্বল করে পত্রিকা সম্পাদনার কাজেও হাত দেন পার্থবাবু । নির্ধারিত শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাস নিতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সাথে নিজেও পড়াশোনা শুরু করেন আবার এবং বি.এ পাস করে ফেলেন। এই পর্যন্ত পড়ে যদি মনে হয় এক জীবনের জন্য অনেকটা, তাহলে বলব এ তো শুধু সিনেমার ট্রেলার। মধ্যান্তরের আগে আরও খানিক চড়াই উতরাই রয়েছে।

২০০৭ সালে নিজের উদ্যোগে তৈরি করলেন “অ্যাসোসিয়েশন ফর রিহ্যাবিলিটেশন অফ অ্যাসিডুয়াস ইয়ুথ” বা অ্যারে। এই স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের রেফারেন্স বই, খাতা ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদান এবং পুষ্টিকর খাবারের জোগান দেওয়ার কাজ করছে নিরলসভাবে। এছাড়াও ২০১৬-তে তাঁর অভিভাবকতুল্য শ্যামল বরণ মুখোপাধ্যায়,বিশিষ্ট পর্বতারোহীদের সাথে যৌথ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন “যাদবপুর ইয়ুথ অ্যাডভেঞ্চারারস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন”। পর্বতারোহণ, কায়াকিং-এর মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে কিশোর ও যুবাদের উৎসাহ প্রদান এবং ইট কাঠ পাথর ও কংক্রিটের নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত বর্তমান প্রজন্মের মানবিক বিকাশের লক্ষ্যে অরণ্য ও দুর্গম পরিবেশের সান্নিধ্যলাভ ও মানসিক কাঠিন্য এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে সমান্তরাল জীবনবোধের উন্মেষ ঘটানোর লক্ষ্যে কলেজের ছাত্রছাত্রী ও গ্রামের আর্থিক ভাবে অনগ্রসর যুবাদের তিনি সামিল করেছেন এই উদ্যোগে।

অ্যারের উদ্যোগে দরিদ্রদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, বৃদ্ধাবাস ও অনাথাশ্রমের পরিকল্পনা রয়েছে পার্থবাবুর। পার্থবাবুর ভাবনায় রয়েছে অনাথাশ্রমের শিশুদের পরিবারহীনতা ও বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের একাকিত্বের গ্লানি নির্মোচনের জন্য অভিনব পন্থায় দুই ভিন্নপ্রজন্মের একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল পরিবারবোধ জাগ্রত করার উদ্যোগ। এছাড়াও তাঁর অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে রয়েছে কৃত্তিম ওয়াল নির্মাণ করে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা যা থেকে উৎসাহী কিন্তু আর্থিকসঙ্গতি বিহীন পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও উপকৃত হবে।

গতবছর ২৪শে মার্চ থেকে, অর্থাৎ লকডাউনের আগের দিন থেকে সচেতনতামূলক প্রচার এবং ১০ই এপ্রিল থেকে বিভিন্ন কমিউনিটি কিচেনে ও দুঃস্থ পরিবারকে রাজ্যব্যাপী সাহায্যকল্পে রেডক্রসের সাথে যৌথ ভাবে কাজ করছে তাঁর সংস্থাগুলি। আমফান পরবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে ত্রাণ এবং ত্রিপলের বন্টন, চাল ডাল সহ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ সবকিছুই করে গিয়েছেন নিজ উদ্যোমে। সাক্ষাৎকার শেষে জানাতে ভুললেন না, তাঁর সমস্ত সামাজিক প্রকল্পে তিনি সমস্ত সরকারি সহযোগিতা যখন প্রয়োজন সবই পেয়েছেন, আর পেয়েছেন বহু মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

শেয়ার করুন

0Shares
0
বিবিধ সাম্প্রতিক