লিখছেন রূপম ইসলাম— ৬

লিখছেন রূপম ইসলাম— ৬

কাকিমা

সে অনেকদিন আগের কথা। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখলাম তারিখটা হ’ল ২০১৯-এর ১৫ই অক্টোবর। গায়ক অরিজিৎ সিং লিখেছে— এবারে নভেম্বরে তুমি আমার গঞ্জে আসছ। আমি থাকছি না সে সময়ে। মিস করব। কিপ রকিং রকস্টার।

আমি তখনও জানি না এরকম কোনও কনসার্টের কথা চলছে কিনা। রূপসাকে জিজ্ঞেস করতে ও জানালো— কথা চলছে জিয়াগঞ্জের শো-এর। তবে ফাইনাল নয়।

আমি অরিজিৎকে বললাম যে এখনও ফাইনাল হয়নি। ও দমে না গিয়ে বলল— ফাইনাল হ’লে তুমি আমার বাড়িতে চলে এসো। চিল করবে। কেউ থাকবে না তখন। গঙ্গার উপরে একটা বারান্দা আছে। স্মোকার’স প্যারাডাইস। দেখো, তোমার ভাল লাগবে।

আমি বললাম— আমার স্মোকিং বলতে তো মাঝেসাঝে একটা গোল্ড ফ্লেক লাইটস।— এরপর স্মোকিং-এর জাতি-প্রজাতি নিয়ে কিছু কথা হ’ল— তা এখানে প্রাসঙ্গিক না।

এই পুরনো স্মৃতিতে অবগাহনের একটা কারণ আছে। এক আশ্চর্য পরিবারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বহরমপুরের অনতিদূরে জিয়াগঞ্জে পারফর্ম করতে গিয়ে। উপরোক্ত হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের মাধ্যমে সেই প্রসঙ্গটির সূচনা হয়। এই পরিবারবৃত্তের কেন্দ্রস্থল আলো করেছিলেন অরিজিতের মা, যাঁকে আলাপ হওয়া ইস্তক আমি ‘কাকিমা’ বলে ডাকতাম। তিনি কয়েকদিন আগে (২০ মে, ২০২১) চলে গেলেন, আমাদের আর দেখা হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই রইল না।


অরিজিৎ আমায় বলে রেখেছে, গঙ্গার ওপরে ওর একটা বিশেষ বারান্দা আছে। সেই বারান্দাটা কোথায়? ওই বারান্দায় আমার একটা বিশেষ কাজ করবার আছে। এটাও কলকাতায় বসে হোয়াটসঅ্যাপেই আমাদের প্ল্যান করে রাখা।

গল্পে ফেরত আসি। জিয়াগঞ্জে যখন ফাইনালি পৌঁছলাম, হোটেলে উঠলাম। অরিজিতের তেমন একটা প্রত্যক্ষ সাড়া শব্দ সেদিন প্রথমেই পাইনি। কনসার্টটা অর্গানাইজ করছিল মূলত ওর বন্ধুরাই। তাদের মুখে ওর কথা শুনছিলাম। ও আজ এখানে থাকলে কী করত না করত— এই সব। ও তো খুব খোলামনে মেশে সবার সঙ্গে— সেই সব গল্প ওর পাড়ার ছেলেদের মুখে মুখে ফেরে।

তারপর আমাদের পারফর্মেন্স শুরু হ’ল। সেই পারফর্মেন্সের মাঝপথেই অরিজিতের পাঠানো একটা অডিও বার্তা বাজিয়ে শোনানো হয়— যেখানে সে বলে ‘অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু পৌঁছতে পারলাম না। আমাদের বিখ্যাত রকস্টার এবং তার ব্যান্ডের উপস্থিতি— এটা এখানকার অনেকের স্বপ্ন, আজ বাস্তব। তোরা ফাটিয়ে মজা কর, কলরব হোক—‘ ইত্যাদি।

শো চলাকালীন স্টেজের পাশে কী ঘটছিল তা পরে রূপসার মুখে শুনি। আমাদের পক্ষ থেকে যিনি অর্গানাইজারদের সঙ্গে সংযোগ সাধন করছিলেন, তিনি হঠাৎ রূপসাকে এসে বলেন— ওই যে, সাইডের মনিটরের উপর যিনি বসে আছেন, তিনি অরিজিতের মা। রূপসার খোঁজ করছিলেন তিনি। রূপসা তাড়াতাড়ি যায়, ও তাঁর জন্য একটা চেয়ার জোগাড় করতে বলে। তিনি চেয়ারে বসতে রাজি হন না। রূপসা ওখানে তাঁর পাশেই বসে পড়ে, মনিটরের উপর।

এই সময়টাকে স্মরণীয় করে রাখবার জন্য একটা সেল্ফি তুলতে চাইছিল রূপসা, মনে মনে। অরিজিতের মা— তিনি তো রত্নগর্ভা! কিন্তু বলতে সাহস পাচ্ছিল না। অরিজিৎ কিছুদিন আগে যখন মুম্বইতে আমাদের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিল, কোনওরকম বিশেষ নিরাপত্তা সে নেয়নি, একেবারে দর্শকশ্রোতাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে হেডব্যাং করছিল হুড-টুড পরে। কিন্তু আশেপাশের কেউ সেল্ফি তুলতে এলেই সে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সরিয়ে দিয়েছিল। সে সব দেখে রূপসার আর ভদ্রমহিলাকে সেল্ফির কথা পাড়বার সাহস হচ্ছিল না। এমন সময় রূপসাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে অরিজিতের মা বললেন— তোমার সঙ্গে একটা সেল্ফি তুলে দেবে আমার? আমার ছেলেকে পাঠাতে হবে… ও কিন্তু আমায় বলে রেখেছে তোমাদের সঙ্গে ছবি পাঠাতে

― এইভাবে শুরু। এরপর তাঁর ফরমান— রূপমকে শো-এর পর আমার বাড়িতে আসতেই হবে। অল্প কিছু খেতে হবে। রূপসা তো জানে অরিজিতের সঙ্গে আমার কী কথা হয়েছিল আগেই। সে বলে— এ তো আমাদের সৌভাগ্য। রূপম খুব ক্লান্ত থাকে অনুষ্ঠানের পর। আপনি বলছেন, অরিজিৎ বলে দিয়েছে, যেতে তো হবেই। তবে কী খেতে পারবে বলা মুশকিল।

আমার আসলে যাওয়ার কথা ছিল অনুষ্ঠানের আগে। অরিজিৎকে সে কথা বলাও ছিল। অরিজিৎ বলেছিল— সে তোমার যেমন ইচ্ছে। শো-এর পরও একটু এসো। একটু বাড়ির খাবার খেও।— এই পর্যন্ত। তালে গোলে হরিবোলে (অনুষ্ঠানের আগে যেমন হয়ে থাকে) আর যাওয়া হয়নি। এবার সেই আমন্ত্রণ নিয়ে সোজা স্টেজে চলে এসেছেন মাতৃসমা এই মহিলা।

অবশ্যই আমরা সবাই পৌঁছলাম অনুষ্ঠানের পর ওঁদের বাড়িতে। আমার আপনার মতো বাড়ি। সাধারণ বাড়ি। কোনওরকম হামবড়াই নেই। অরিজিতের বাবা একজন কোমলপ্রাণ মিষ্টভাষ সর্দারজী। তিনি আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকলেন সারাক্ষণ। ততক্ষণে যাঁকে কাকিমা বলতে শুরু করেছি— তিনি মহাব্যস্ত আতিথেয়তায় আর তদারকিতে।


অতি সাধারণ এক পরিবার। অহংকারকে যেন ঘাড় ধরে এই বাড়ির ত্রিসীমানা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

মিষ্টি এল থালাভরে। জল এল। বললেন চা আসছে। ‘ডিম সেদ্ধ খেতেই হবে’, বললেন ‘—এত পরিশ্রমের পর প্রোটিন জরুরি’। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আমিও তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের আইন অমান্যকারী। কাকিমা সাধারণ-অসাধারণ গল্প করছেন। অরিজিতের ঘর দ্যাখাচ্ছেন। ছেলে থাকলে কত খুশি হ’ত— বলছেন। তাঁর ছেলেমেয়ের জেতা ট্রফি দ্যাখাচ্ছেন। তাঁর মেয়েও গানবাজনায় অরিজিতের তুলনায় কম যায় না― বলছেন।

মনে হচ্ছে না এমন এক ভারতসেরা শিল্পীর বাড়িতে বসে আছি— কিছু বছর আগেই সুপারতারকা সলমনের সঙ্গে যাঁর খটাখটির খবর সর্বজনবিদিত। অতি সাধারণ এক পরিবার। অহংকারকে যেন ঘাড় ধরে এই বাড়ির ত্রিসীমানা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ তো সহজ কাজ নয়। সবচেয়ে কঠিন কাজ তো এটাই। ‘অতি সাধারণ পরিবার’ বললাম? ভুল বলেছি। মার্জনা চাইছি। এমন মাটিতে পা রেখে চলা স্বাভাবিক পরিবার আমি বিখ্যাতদের মধ্যে দেখিনি। অ-সাধারণ পরিবার। অতুলনীয় পরিবার।

বাড়ির বাইরে তখন ভিড়। কাকিমা বলছেন— তোমার মতো স্টার আজ এ বাড়িতে, তাই এরকম ভিড়। অরিজিৎ ওঁদের কাছে স্টার নয়, সে তো পাড়ার ছেলে। সে এলে তো ভিড় জমবার প্রশ্নই ওঠে না। তোমার জন্য বাইরে ছবি তুলবার লাইন পড়েছে— তোমাকে ওসব গ্রাহ্য করতে হবে না। তুমি দু’একজনের সঙ্গে কথা বলে চলে যেও। তুমি এত ক্লান্ত।

আমি বললাম— না না। আপনার আতিথেয়তায় কোথায় আর ক্লান্তি। ডিম সেদ্ধ খেলাম না? আমি অবশ্যই ওদের আবদার মেটাবার চেষ্টা করব। তার আগে কিন্তু আমার নিজেরই একটা আবদার আছে। অরিজিৎ আমায় বলে রেখেছে, গঙ্গার ওপরে ওর একটা বিশেষ বারান্দা আছে। সেই বারান্দাটা কোথায়? ওই বারান্দায় আমার একটা বিশেষ কাজ করবার আছে। এটাও কলকাতায় বসে হোয়াটসঅ্যাপেই আমাদের প্ল্যান করে রাখা।

গঙ্গার ওপরে সেই বারান্দাটা খুঁজে বার করা হল। ‘স্মোকার’স প্যারাডাইস’-এ দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। শান্তি! অরিজিৎকে মেসেজ করে জানিয়ে দিলাম— তোমার বাড়ি ঘুরে গেলাম।

কাকিমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলাম। কলকাতায় এলে তাঁরা আমার বাড়িতেই থাকবেন। সেই তো কাকিমা কলকাতায় এলেন। আমার পাড়াতেই এলেন। কিন্তু তাঁর বসবাস আমার বাড়িতে আর হ’ল কই? হ’ল তো ব্রিজের উল্টোদিকের রাস্তায়, এ এম আর আই হাসপাতালে!

তাও রোগ জয় করবেন এই ভরসা রেখেছিলাম। অরিজিৎ চেষ্টা করেছিল সর্বস্ব বাজি রেখে। কিন্তু অত্যন্ত সাধারণ, মাটিতে পা রেখে চলা, সেই স্পিরিটেই অতুলনীয়া মানুষটি নীরবেই চলে গেলেন। তাঁর অসুস্থতা নিয়ে অকারণ শোরগোল হোক, খবর হোক এটা অরিজিৎ চায়নি। সে তার মায়েরই যোগ্য ছেলে— এটা সে প্রমাণ করেছে।

খবরটা পাওয়া অবধি মনটা ভারী হয়ে আছে, ভাল লাগছে না। এই সময়টা যে এরকম আরও কত সর্বনাশা খবর পৌঁছে দেবে আমাদের, অপূরণীয় সমস্ত ক্ষতি করবে, হৃদয়ে লালন করে রাখা সুস্থ সম্ভাবনাগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে দেবে— কে জানে!

কাকিমা, বিদায়।

প্রচ্ছদ : অন্তরূপ চক্রবর্তী

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive লিখছেন রূপম ইসলাম