সৌভিক কথা, পর্ব ৫

সৌভিক কথা, পর্ব ৫

এক বছরের ওপর হয়ে গেল, পৃথিবী এখনও শান্ত হ’ল না। করোনার প্রথম ঢেউ পেরিয়ে এসে, হাজির দ্বিতীয় ঢেউ, এবং এই ঢেউ সমস্ত আলো মুছে দিচ্ছে যেন, খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে জীবন। দেশে হাসপাতাল বেড নেই, পর্যাপ্ত ভ্যাক্সিন নেই, অক্সিজেন সরবরাহ নেই , শুধু আছে ভোটের উন্মাদনা, মিটিং-মিছিল, কুম্ভমেলার নির্লজ্জ জমায়েত, শুধু আছে শহরের রাস্তায় জমতে থাকা মৃতদেহ, প্রতিদিন ফেসবুক খুলে চেনা মানুষের চলে যাবার খবর। এবং এই সেকেন্ড ওয়েভ বয়স মানে না― বত্রিশের তরতাজা যুবক যে সেরে উঠছিল সংক্রামিত হবার পর, হঠাৎ একদিন সে নিভে যায়, ছবি হয়ে যায়, তার ছবির তলায় আমরা লিখি “R.I.P.”… মহীরুহ শঙ্খ ঘোষ, সাংবাদিক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণ কবি ও সংগঠক সৌরভ চন্দ্র― সবাই পরপর, শীর্ষদা ছাড়া সবাই, করোনায় চলে গেছেন। এবং আরও কত, কত জন, রোজ, রোজ, প্রতিদিন… একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাস করতে করতে, ‘ফিয়ার সাইকোসিস’-এর সঙ্গে লড়তে লড়তে, আমরা যারা টিকে রয়েছি এখনও , যারা এখনও ভাবছি একদিন সূর্য উঠবে, খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে মাস্কবিহীন নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে প্রাণভরে , তাদের সবাইকে একরাশ সাহস ও ভালবাসা। এবং আবার লকডাউন – বাধ্য হয়েই, সংক্রমণকে বাগে আনতে চেয়ে বিভিন্ন রাজ্যে নাইট কারফিউ, লকডাউন, স্তব্ধতা। হ্যাঁ, পশ্চিমবঙ্গেও ১৫ দিনের ঘোষিত স্তব্ধতা। একটা ধুঁকে পড়া, ঝুঁকে পড়া অর্থনীতির ওপর, দিন-আনি-দিন-খাই পেটগুলোর ওপর, চাকরি হারিয়ে নতুন জীবনসংগ্রামে সামিল হওয়া অন্ধকার যুবকের চোখের ওপর লকডাউনের নিদারুন রসিকতা। মানুষ, এর চেয়ে বেশি অসহায় আর কোনওদিন হয়েছে কি ?

তবু এই মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে , মন খোঁজে বাঁচার রসদ। তাই, পুরনো বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা হয় , মানে আন্তর্জালীয় ‘ভার্চুয়াল’ আড্ডা (সেইসব রাতদিন এক করা , বেঁধে বেঁধে থাকার ‘আসল’ আড্ডাগুলো কি সত্যিই ইতিহাস হয়ে গেল?) এমনই এক ‘অনলাইন’ আড্ডায় , কথা হচ্ছিল কয়েকজন ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে। এদের মধ্যে কেউ ডাক্তার, কেউ ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন আগুনে ফেমিনিস্ট, সে উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড ট্র্যাফিকিংয়ের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ , নিজস্ব এন জি ও চালায় , তার নাম ধরে যাক “রঞ্জাবতী” … রঞ্জাবতীই সেদিনের ‘টপিক’ ঠিক করল , বলল – “তোরা মুখে যাই বলিস না কেন, আদতে তো পুরুষ ! এখনও অনেক কিছু মেনে নিতে পারিস না। আচ্ছা বল দেখি – গৃহবধূ , না বারবধূ , তোদের কাছে কে বেশি গ্রহণযোগ্য ?! ” কড়া টপিক, সন্দেহ নেই ! সেদিনের এই ভার্চুয়াল আড্ডা ভারতীয় সময় অনুযায়ী রাত আড়াইটে অবধি গড়িয়েছিল, মনে আছে। আমি যা বলেছিলাম, বা যেভাবে নিজের ধ্যানধারণা নিয়ে এগিয়েছিলাম, তা ছোট করে লিখে ফেললে, এরকম দাঁড়ায় –

“গৃহবধূ” বা “হাউজওয়াইফ” কিংবা “হোমমেকার” বলতে চোখে ভেসে ওঠে এক নারী যিনি ঘর-সংসার সামলান, বাচ্চা মানুষ করেন, রান্নাবান্না করেন, কাঁচা হলুদের ছোপ কপালে লাগিয়ে ব্যস্ত হাতে স্বামীর অফিসের লাঞ্চবক্স, সন্তানের টিফিনবক্স সাজিয়ে দেন সকাল ৮-টার মধ্যে, কাজের লোকের পেছনে গজগজ করেন, অবসর সময়ে টিভি দ্যাখেন, গান শোনেন , হয়তো বা ফেসবুক করেন। মানে মধ্যবিত্ত গৃহবধূ বোধহয় এমনই এক চিত্রকল্প। খারাপ কি ? দিব্বি পিসফুল যাপন, তাই না ? কিন্তু, বাইরে থেকে যা আপাত শান্ত নদী, অন্দরে তাই অশান্ত সমুদ্র হলেও হতে পারে। একজন হাউজওয়াইফের নিজের জন্যে কোনও সময় সেভাবে থাকে কি? নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, চাহিদা, দাবি-দাওয়া, মান -অভিমান – সেসব কোথায় যায় ?

সময় এগিয়ে গেছে অনেকটাই, আজকের দুনিয়ায় খুন্তি থেকে এয়ারপ্লেনের ককপিট, অপারেশন থিয়েটার থেকে অলিম্পিকের হার্ডল রেস্, কর্পোরেট বোর্ডরুম থেকে সিনেমার পর্দা – সর্বক্ষেত্রেই নারীরা আপন ক্ষমতায় বিরাজমান। কিন্তু তবু, আজও যাঁরা বাধ্য হয়ে গৃহবধূ হিসেবেই জীবন কাটিয়ে দেন, তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই, এবং তা না থাকার ফলে তাঁদের অনেকের জীবনই অপরের অঙ্গুলিহেলনে চলতে থাকে, চলতে চলতে, ধূসর হতে হতে একদিন মিলিয়ে যায় দিগন্তে। তাঁদের শরীর, তাঁদের মনও কি তাঁদেরই থাকে ? এই দেশের অসংখ্য নারী যাঁরা গ্রামে, আধা-শহরে, কিংবা উজ্জ্বল মেট্রো-সিটিতেও আজ চার দেওয়ালের মধ্যে হাউজওয়াইফ, যাঁদের উপার্জনক্ষমতা নেই, আজও ম্যারিটাল রেপের শিকার, কারণ তাঁদের আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই, মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া। এই গৃহবধূ কি তাহলে বারবধূ নন? বরং একজন বারবধূ কার সঙ্গে শোবেন না শোবেন, কার সঙ্গে উঠবেন-বসবেন বেছে নিতে পারেন, সেই স্বাধীনতা তাঁর রয়েছে, এবং শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করতে পারেন, একজন বিষণ্ণ গৃহবধূর সেই জানলা নেই।

তাই , শান্ত , লক্ষ্মীশ্রী আটপৌরে গৃহবধূ না মুখে রংচং মাখা, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে থাকা, খোলামেলা পোশাক পরা বারবধূ – কে ভাল, কে খারাপ এইসব প্রশ্নের কোনও উত্তর হয় না। আপনি কোন চোখে কী দেখবেন, প্রশ্ন সেটাই।

একজন ভাগ্যহীন মেয়ে যে বেশ্যাখানায় একদিন বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, তারপর রাতের পর রাত নিজের শরীর-মনকে চাবুক মেরে অভ্যস্ত করে নিয়েছিল নতুন পরিবেশে, আর একজন অল্প শিক্ষিত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মেয়ে যার কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা তাকে একদিন বাধ্য হয়েই তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন এবং শ্বশুরবাড়িতে তাকে নানা অত্যাচারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল – এই দুজনের মধ্যে কে ‘বারবধূ’ আর কে যে ‘গৃহবধূ’ , তার হিসেবে গুলিয়ে যায়।

প্রতি বছর ৮-ই মার্চ “আন্তর্জাতিক নারী দিবস” হিসেবে পালিত হয়। সমাজে নারীদের অবস্থান ধীরে ধীরে হলেও, পাল্টাচ্ছে , তাঁরা এগোচ্ছেন, শিক্ষার আলোকে নিজেদের আরও উজ্জ্বল করে তুলছেন। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শেষ কথা বলে, এবং যাঁরা প্রকৃত জ্ঞানী তাঁরা বোঝেন স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। ‘গৃহবধূ’ বা ‘বারবধূ’, নারী বা পুরুষ , নারীদিবস সবার জন্যেই একটি নিটোল ‘মানুষ দিবস’ হয়ে উঠবে কোনওদিন – এ আশায় ধোঁয়া-ধুলোয় ভরা আকাশে আজও রামধনু ওঠে , দিগন্ত থেকে “মানুষ মানুষের জন্য / জীবন জীবনের জন্য / একটু সহানুভূতি কি / মানুষ পেতে পারে না / ও বন্ধু …” – গেয়ে ওঠেন ভূপেন হাজারিকা …

এতসব কথা বলার পর, বা আড্ডাকে এই ট্র্যাকে নিয়ে যাবার পর, রঞ্জাবতী বলে উঠলো – ” জিও গুরু !”

সবাই ভাল থাকবেন। একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে, একটা অবিশ্বাস্য, অতল জলের দুনিয়ায় ডুবে যেতে যেতে , আবার বলি – “ভাল থাকবেন। জিততেই হবে …”

 

প্রচ্ছদ: ত্রিনাথ মজুমদার 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive সৌভিক কথা