অন্য একতারা— ৬

অন্য একতারা— ৬

তোমার সুরের ধারা ঝরে

ভাঙা পথের ধূলায় যত জীবনচিহ্ন পড়ে ,তার কোনটির ওপর দুঃখ এসে দাঁড়িয়েছিল, কোনটির উপর ফুলের নম্রধ্বনি-  আমরা জানতে পারি না। আকাশে বিছিয়ে থাকা অপরূপ রক্তিমাংশুক কাউকে ভোরের হাতে স্পর্শ করে, কাউকে গোধূলির হাতে । একটিমাত্র জীবন আমাদের ঝুলিতে। দিনের ঢেলা কুড়াতে কুড়াতে ঝুলি ভার হয়ে আসে। হালকা পায়ে চলা শুরু করার সময় যত উষ্ণতা বুকের গভীরে ভরা ছিল, পা যত ভারি হয়ে আসে, সেই উষ্ণতা যেন দিনের ঢেলার নীচে চাপা পড়ে থেকে থেকে বৃতি মেলে দিতে ভুলে যায়। ঢেলা সরিয়ে তাকে তুলে আনি যদি, দেখব তার গায়ে কতশত রাত্রির আনন্দচরের জ্যোৎস্না, দুঃখনদীর কাজল লেগে আছে।
জ্যোৎস্না বলতে মনে পড়ে- দার্জিলিংয়ের এক হোমস্টেতে থাকাকালীন এক ভাবের পাগলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সে অবশ্য অন্য জন্মের কথা। যে জন্মে পৃথিবীর সব গল্পকে সত্যি বলে মনে হয়, পৃথিবীর সব মানুষকে সৎ ও সুন্দর। ম্যাল রোড থেকে অনেকটা দূরে এক পাকদণ্ডী যেখানে কাব্যকথার মতো  মোড় নেয়, তারই এক পাশে পোখরাজ রঙের একটি বাড়ি। তার সিঁড়িময় অর্কিড, গোলাপ দরজা, বারান্দায় হাস্যরত অমায়িক বুদ্ধমূর্তি,  নিস্তেজ আলোর জানলায় বসে থাকা মধ্যবয়সিনীর চুলে নির্জন অন্ধকারের সংবেদ যে প্ররোচনা সৃষ্টি করেছিল, তার আবেদন স্মৃতিতে আজও  অমলিন। আমরা ছাড়াও সেই বাড়িতে ছিলেন ফিলিপিন্সের এক পর্যটক। তাঁর সমস্ত মনোযোগটুকু অবশ্য সংন্যস্ত ছিল রহস্যময় ভারতের আনাচে কানাচে ঘুরে স্থানীয় উপকথার উদ্ধারে। আর ছিল এক বোহেমিয়ান তরুণ। বুলান বলেই তাকে ডাকত সবাই। তার আসল নাম আজ আর মনে নেই। সে ছিল আদতে সমুদ্রপাড়ের যুবক। যতদূর মনে পড়ে, কেরালার কোন এক গ্রামে তার আদি বাড়ি। চাকরির সূত্রে  দার্জিলিঙে এলেও সেই চাকরিকে সে বহুদিন আগেই মুক্তি দিয়েছিল। বদলে বেছে নিয়েছিল গান ও কবিতা। দার্জিলিঙের বাংলো প্যাটার্নের সেই কাঠের বাড়ির পিছন দিকের একটি ঘর তার বরাদ্দ ছিল । সেই ঘরের জানলা খুলে দিলেই পিঠ উপুড় করে শুয়ে থাকা সবুজ ঘাসের জঙ্গল। শিয়রে সন্ন্যাসীসদৃশ ধ্যানগম্ভীর পাহাড়  সেই প্রাণবন্ত সবুজকে দূরের পৃথিবী থেকে দুহাত বিস্তৃত করে আড়াল করে রেখেছে।
ঘরের দেওয়ালে এলামাটি ও বাদামি রঙের সুচারু সংযোগ দেখে মনে হয়েছিল, যেন ভ্যান গঘ নিজে হাতে তুলি টেনে গেছেন সেখানে। গৃহসজ্জা বলতে ছিল দু-তিনটি গিটার। ঘরের একপাশে অপ্রশস্ত বিছানা। তার চাদরের রঙে সূর্যোদয়ের উত্তাপ। একটি মুখচোরা টেবিল এবং হলদে বার্নিশের একটি দাম্ভিক চেয়ার ছাড়া তেমন আসবাব ছিল না। তার বদলে ছিল ঘরের মেঝেতে, চেয়ারে, বিছানায় নরম হয়ে ছড়িয়ে থাকা জামাকাপড়ের তারল্য, মরচেরঙা কার্পেটে কাগজের মণ্ড খুলে বেরিয়ে পড়া অর্ধপক্ক গানের কথা, টেবিলে আধখাওয়া আপেলের পাশে কমলালেবুর খোসার ভেতরে আরাম করে শুয়ে থাকা একটি বিদেশি রিস্টওয়াচ,  আর সমস্ত কিছুর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক অদৃশ্য সুরের দ্যোতনা। অবিকল সালভাদর দালির হাতে আঁকা পার্সিস্টেন্স অফ মেমোরি। সময়ের তারল্য।

মাত্র দিন সাতেকের সেই দার্জিলিং ভ্রমণে  ওই ঘরটি ছিল আমার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু । সারাদিনে পাহাড়ের সঙ্গে  দেখাশোনা যত প্রিয় ছিল, সন্ধ্যায় ততই প্রিয় ছিল গরম চায়ের কাপ ও সদ্য আভেনমুক্ত কেকের ওপর দিয়ে উষ্ণ ধোঁয়ার মতো বয়ে যাওয়া বিদেশি গানের সুর। আশ্চর্যময় সাতটি সন্ধ্যা। সেই বাড়ির মালিক মিস্টার লামার মনের সমস্তটুকুই ন্যস্ত ছিল হিসেবের খাতায়। প্রতিদিন সান্ধ্যকালীন চা পর্বের শেষে বাবা এবং সেই ফিলিপিনি ভদ্রলোককে দরজার কাছে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেদিনের খরচটুকু বুঝে নিতেন তিনি। আমি ভাবতাম – কেরালার তরুণ বুলান যে চাকরি-বাকরি ছেড়ে সারাদিন গিটারের সুর তুলে দিন কাটাচ্ছে, তার খরচ তবে কে যোগায়?


হ্যালেলুইয়া কথাটির সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচিতি ছিল অন্যভাবে। হয়তো সেই কারণেই প্রথমে গানটিকে যেকোনও ধর্মীয় সঙ্গীত মনে করে তত মনোযোগ দিইনি। আমার সবটুকু মন তখন  নিবদ্ধ ছিল জ্যোৎস্নাপ্লাবিত চরাচর ও নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকা দূর পাহাড়ের ঘরগুলোর দিকে। ঠিক আচমকা নয়, খুব সন্তর্পণে গানের সুরটি বেষ্টন করেছিল আমাকে।

পাহাড়পথিক জানে, পথ শুধু পায়ে হাঁটার নয়। পাহাড়ের শরীরে যত ভাঙা গান, তার সামান্যটুকু উপলব্ধি করতে হলেও পথচলার মাঝে মাঝে একটু আড়াল দিতে হয় তাকে। তার শরীরে ভরা বিধুর প্রস্তাব, ঋতুস্বর অনুভব করতে হয় একান্তে বসে। তেমনই এক একান্ত বিকেলাবসানে লামা হাউজের বারান্দায় জলের ভেতরকার ছায়াসম্ভারের মতো গভীর আবেশময় একটি গান বেজে উঠেছিল বুলানের কন্ঠে। গানের নাম হ্যালেলুইয়া। গানটির জনক লেনার্ড কোহেন।

বুলানের কণ্ঠস্বর ছিল আর পাঁচজন গায়কের চাইতে আলাদা। আশ্চর্য এক ব্যথামেদুরতা ছেয়ে থাকত তার স্বরে। গভীর ও সুরেলা সেই কণ্ঠের অন্তর্নিহিত বেদনাসম্ভার যেন কোন অতলে টেনে  নিয়ে যেত তার শ্রোতৃসমূহকে। হ্যালেলুইয়া কথাটির সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচিতি ছিল অন্যভাবে। হয়তো সেই কারণেই প্রথমে গানটিকে যেকোনও ধর্মীয় সঙ্গীত মনে করে তত মনোযোগ দিইনি। আমার সবটুকু মন তখন  নিবদ্ধ ছিল জ্যোৎস্নাপ্লাবিত চরাচর ও নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকা দূর পাহাড়ের ঘরগুলোর দিকে। ঠিক আচমকা নয়, খুব সন্তর্পণে গানের সুরটি বেষ্টন করেছিল আমাকে। যেন টের পেলেই আমাকে আর সে ধরতে পারবে না। প্রথম স্তবকের পরে পরেই যখন মিসেস লামা বুলানের সঙ্গে গলা মেলালেন, তখন টের পেলাম আমার অস্তিত্বের ওপর কেমন ধীরে ধীরে সর্পিল আসঞ্জন হয়ে উঠছে সেই সুর। বিধর্মী প্রেমিকের মতো এক নিষিদ্ধ আনন্দের দিকে, বোধিময় এক বীজকল্পের  দিকে  টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।
বহুকাল আগে এক গোপন সেতার
ডেভিডের  হাতে বেজে ওঠে। ঈশ্বর
প্রীত হন । সংগীত তেমন কি ভালবাসো প্রিয়?
এক তার বেজে ওঠে এক তার  থামে
উদারার থেকে সুর মুদারায় নামে
ব্যর্থ রাজার হাতে সুর বেজে ওঠে
হ্যালেলুইয়া।
তুমি তো জানতে, তবু তুমিও প্রমাণ
চেয়েছিলে, দেখেছিলে ছাদে তার স্নান,
সুন্দর দেহ তবু জ্যোৎস্নার কাছে
তার হেরে যাওয়া আর তোমাকে দুহাতে
একবার বেঁধে, ফের নিষ্কৃতি দিয়ে
তোমার সিংহাসন ভেঙে ও গুঁড়িয়ে
তোমারই ঠোঁটের থেকে
সে যে শুষে নিল হ্যালেলুইয়া।
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
হয়তো কোথাও কোনও ঈশ্বর আছে
আমি যা শিখেছি প্রেম-প্রণয়ের কাছে
প্রতিদ্বন্দী এলে তাকে হারানোর কৌশল।
যা শুনেছ তাকে কি আজ পাপ বলা ভাল?
তীর্থপ্রবণ চোখ  যত দেখে আলো
তার চাইতে শীতল
এই ভেঙেচুরে যাওয়া হ্যালেলুইয়া।
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
দেখো প্রিয়তমা, আমি আগেও তো এসেছি এখানে।
এই ঘর এই মেঝে আমাকেও ততটাই জানে।
তোমাকে চেনার আগে আমার জীবন ছিল একা।
যদি চাও গম্বুজে বিজয়ের পতাকা উড়িও
তবু বলি, ভালোবাসা বিজয় মিছিল নয় প্রিয়
এ হল শীতল আর
ভেঙেচুরে যাওয়া হ্যালেলুইয়া।
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
একটা সময় ছিল তুমি রোজ আমাকে জানাতে
যা ঘটে, যা নাও ঘটে প্রতিদিন তোমার জগতে।
সময় বদলে গেছে, আর কি রেখেছ কিছু বাকি?
যতবার যতক্ষণ তোমার গভীরে
পবিত্র পাখি যতদূর গেছে উড়ে
প্রতিটি শ্বাসের গানে বেজে উঠেছিল
হ্যালেলুইয়া।
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
আমাকে উজাড় করা হয় তো যথেষ্ট ছিল না।
 হয়তো বুঝিনি তাই বারবার ভেঙেছে সীমানা।
মিথ্যে বলিনি আমি। আজ এই শহরে ফিরেছি।
তোমাকে ঠকাতে নয়, অজান্তে যে ভুল করেছি
আমার দেবতা সুর, আমি তার মুখোমুখি হয়ে
গাইতে থাকব শুধু প্রণামের গান
হ্যালেলুইয়া।
হালেলুইয়া হালেলুইয়া
হালেলুইয়া হালেলুইয়া।
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া
হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া

 


বয়স ও সংগীতের একটি আশ্চর্য সমীকরণ আছে। অপরিণত বয়সের অর্বাচীনতায় যে গানকে ঢিমে এবং নিরুৎসাহক বলে দূরে ঠেলে রাখি, পরিণত বয়সে সেই গান প্রতিশোধের মতোই আমাদের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে ক্রমশ গ্রাস করে ফেলে। মনোযামিনীর নীরব দুয়ার খুলে অলোক আলোর দ্যুতিময় হাত এসে স্পর্শ করে আমাদের।

একটি গান কীভাবে কয়েকটি শব্দবন্ধ ও সুরের মারণ উচাটন ছাড়িয়ে, ঘর বারান্দা পথ-প্রান্তর ছাড়িয়ে অনন্ত হয়ে উঠতে পারে, হ্যালেলুইয়া তার অমোঘ উদাহরণ। বয়স ও সংগীতের একটি আশ্চর্য সমীকরণ আছে। অপরিণত বয়সের অর্বাচীনতায় যে গানকে ঢিমে এবং নিরুৎসাহক বলে দূরে ঠেলে রাখি, পরিণত বয়সে সেই গান প্রতিশোধের মতোই আমাদের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে ক্রমশ গ্রাস করে ফেলে। মনোযামিনীর নীরব দুয়ার খুলে অলোক আলোর দ্যুতিময় হাত এসে স্পর্শ করে আমাদের। গানে যতটুকু বলা হয়, না বলা থাকে তার বেশি। সেই অশ্রুত সুরের ইশারা ফুল ফোটায় অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনের মতো। চেতনার স্তরে স্তরে সে এক আশ্চর্য বিনিময়।

গায়কের আকুলতা, কবির অশ্রুজলভার, সুরের অতিক্রম ছাপিয়েও একটি অনাবিষ্কৃত উৎসার থাকে। এই সমাহার শ্রোতাকে যে বাঁধনে বেঁধে রাখে,  সেই বাঁধন, সেই যন্ত্রণা যেন তার কত জন্মের আত্মীয়। দালি তাঁর ছবিতে যে সময়ের তারল্য তুলে ধরেন, সংগীত যেন সেই তারল্যের আবহমানকালের বাহক। কবিতা যদি বা কখনও ভাষা ও শব্দের প্রাচীর নিয়ে অলঙ্ঘ্য হয়ে ওঠে, সুর কখনওই তার তারল্য হারায় না। হয়তো সেই পার্সিস্টেন্স অফ মেমোরিকেই আমরা জিনের ভেতর বহন করে চলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাই অচেনা দেশের সুরও হঠাৎ কেমন করে যেন চেনা হয়ে ওঠে।
বুলানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি যে হঠাৎ এই পাহাড়ের দেশে এসে থাকতে শুরু করলে – তার কারণ কি শুধুই কি পাহাড়ের সৌন্দর্য? নাকি ভিন্নতর কোন কারণ আছে”। বুলান এক অপ্রত্যাশিত উত্তর দিয়েছিল।  বলেছিল, এই অচিন ভাষার দেশে এসেই সে তার চেনা মানুষের সন্ধান পেয়েছে। যখন সে কেরালায় নিজের দেশঘরে নিজের মানুষজনের মধ্যে ছিল, সেখানে কেউ তার সত্যিকারের আপন হয়ে উঠতে পারেনি। আত্মীয় নয়, বন্ধু নয়, এমনকি রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলোও নয়। সবার যেন তার কাছে অনেক প্রত্যাশা। বুলান আর পাঁচটা কিশোরের মত ছিল না বলেই বোধহয় তার ওপর সেই প্রত্যাশার ভার আরো চেপে বসেছিল। পাহাড়প্রমাণ সেই প্রত্যাশার চাপ এড়াতে সে দূরের জীবন বেছে নিয়েছিল। এখানে আসার পর সে মিসেস লামার প্রতি এমন বন্ধন অনুভব করেছে, যা তার নিজের মায়ের সঙ্গে কখনো গড়ে ওঠেনি।
মিসেস লামা এক সদা প্রজ্বলিত ধূপকাঠির মতো স্নেহের অরূপগন্ধে ঘিরে রেখেছেন তার আশ্রয়প্রার্থী এই সুরের পাগল ছেলেটাকে। “তুমি মিসেস লামাকে মা বলে ডাকো কেন?” জিজ্ঞেস করেছিলাম। বুলান হেসেছিল। বলেছিল, ” মা শুধু একটা শব্দ নয়। আমি কী অনুভব করি সেটাই আসল। মিসেস লামা আমার ঈশ্বর। উনি আমার উপর কোন শর্ত আরোপ করেন না কখনও, আমিও করি না। উনি আমাকে বিশ্বাস করেন, আমিও তাই। যেমন মাটিকে ভরসা করি, হাওয়াকে ভরসা করি, তেমনি”। এখন ভাবলে মনে হয়, এটুকুই সব নয় হয়তো।
লিখতে হলে নিজেকে বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে ফেলতে জানতে হয়। পরিচিত পরিবেশ, এমনকী পরিচিত অনিশ্চয়তাও সৃষ্টির পরিপন্থী। বুলানের মতোই কোহেনও তাঁর চেনা পরিবেশ ছেড়ে শুধুমাত্র গান লিখবেন বলেই একসময় গ্রিসের হাইড্রা দ্বীপে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। শহরের সভ্যতার কোলাহল ও বাহুল্যবর্জিত হাইড্রার পুরাণগন্ধী পরিবেশ তাঁকে  এতটাই আকৃষ্ট করে যে তিনি পনেরো  হাজার ডলারের বিনিময়ে একটি অতিসাধারণ চুনকাম করা বাড়ি কিনে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করেন। সেটুকুই সব নয়। লেখায় মনোযোগ বাড়াতে অদ্ভুত সব উপায় অবলম্বন করেছেন কোহেন। দিনের পর দিন উপোস করে থেকেছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ছাদে বসে থেকেছেন শুধু ঈশ্বরকে দেখবেন বলে। পট, স্পিড, এসিড ইত্যাদি হাজারো ড্রাগের সাহায্য নিয়েছেন। কোহেনের কবিতা একটু মন দিয়ে পড়লেই বোঝা যাবে, সংগীত,  কবিতা ও প্রেম- এই তাঁর ত্রিশক্তি, তিন ঈশ্বর তথা হোলি ট্রিনিটি।
বুলান কোহেন হতে পারেনি। এই সময়ের এক তরুণ কবিকে জানি (তার নাম উহ্য থাক), সে শুধু কবিতায় আশ্চর্য কিছু করবে বলেই রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে কবিতা নিয়ে। অবসাদ, নার্ভের অসুখ ক্রমশ গ্রাস করেছে তাকে। আরও কয়েকজন বন্ধুকে জানি, যাঁরা শুধুমাত্র  সাহিত্যে জীবন উৎসর্গ করবেন বলেই প্রচলিত জীবনপ্রবাহে গা ভাসাতে চাননি। তথাকথিত সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করলে হয়তো তাঁদের অনেককেই সফল বলা যাবে না। তবে কেবলমাত্র সাফল্যই যদি বিচার্য হয়, তাহলে তো জীবনকেই অস্বীকার করতে হবে। পাহাড়ের দিকে যখন তাকাই, শুধু কি তার শীর্ষকেই দেখি? তার হিমবন্ত চূড়ায় রোদের মোহনছটা  যতই আমাদের আবিষ্ট করুক, তাই বলে কি তার সানুদেশ, গিরিখাত, উপত্যকা ও ঢালকে অস্বীকার করা যায়? সবটুকু নিয়েই তো তার অস্তিত্ব। সাফল্যকে শিরোধার্য করার পাশাপাশি প্রয়াসকেও তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার কথা মনে রাখতে হবে আমাদের। অসাফল্যকে অকারণ  অসম্মান করার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রত্যেকটি অসাফল্য আদতে সাফল্যের দিকে যাবার একটি ধাপ, এবং আমাদের সে কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে।
 দার্জিলিং আমার কাছে শুধু হিম জ্যোৎস্নাময় চরাচর নয়। বুলানের কণ্ঠস্বর, মিসেস লামার স্নেহের শর্তহীনতা। এরপরেও কয়েকবার গেছি দার্জিলিঙে। আগের ও পরের সেই যাওয়ার  মাঝখানে সময়ের একটা বড় ব্যবধান ছিল বলেই বোধহয়  মিসেস লামার সেই বাড়ি আর কোনদিন খুঁজে পাইনি। বুলানকেও নয়। তবুও যখনই ম্যালের রাস্তায় গিটার হাতে কোন দারুচিনি রঙের যুবককে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি, অবধারিতভাবে সে আমার কাছে বুলানের স্মৃতি হয়ে ধরা দিতে চেয়েছে। প্রতিবারই আমি বিস্মৃত হয়েছি যে আমার কৈশোরে যে যুবককে  দেখেছিলাম, তার কণ্ঠ ও শরীরে এখন নিশ্চিত অপরাহ্নের ছায়া। বহু পরে যখন ইউটিউবে লেনার্ড কোহেনের কন্ঠে হ্যালেলুইয়া গানটি শুনেছি, উপলব্ধি করেছি – বুলান কোহেনের গায়কীর এক-চতুর্থাংশও অর্জন করতে পারেনি। তবুও  সেই রাতের গানে  যে পাহাড়ি অর্কিডের গন্ধ, কুন্দকুসুম চাঁদ, অনাত্মীয় নদীতে ভেসে যাওয়া একটি অভিমানী নৌকার গল্প ছিল, পাণ্ডুর আলোর দারুবারান্দায় এক হিসেবী ভদ্রলোকের নিতান্ত বিরুদ্ধস্বভাবী পৃথুলা সহধর্মিনীর হৃদয়ের নিরুৎসাহিত স্নেহফুলের স্পর্শ ছিল, সেই অপার্থিব আমাকে শিখিয়েছে – সুর শুধু স্বরের অনায়াস উত্থান-পতন নয়, কবিতা শুধু শব্দ ও ছন্দের চতুরালী নয়, তার চাইতে অনেক বেশি কিছু। ঠিক যেমন সম্পর্ক, যেমন একটি আসত্তি। প্রতিটি গান, কবিতা ও স্পর্শের মধ্যে একটি সময়ের আখ্যান থাকে, পারিপার্শ্বিকের মহিমা থাকে। প্রতিটি ছবির মধ্যে একটি সম্পর্কের রূপকথা থাকে। সেসব একজীবনে সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা হয়ে ওঠে না বলেই বোধহয় মানুষের বহুজন্মে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়।
(ক্রমশ)

শেয়ার করুন

0Shares
0
অন্য একতারা যুগান্তর Exclusive