সৌভিক কথা, পর্ব- ৬

সৌভিক কথা, পর্ব- ৬

আসলে , “উত্তর কলকাতা” কোনও জায়গা নয়, এক বোধের নাম। এই যে মায়াবী , মেঘলা দিনে আপনি নেমে পড়লেন শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনে , আর তারপর জয়পুরিয়া কলেজ পেরিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গেলেন শোভাবাজার সিংহদুয়ারের দিকে , এটা একটা কবিতা – ধুলোপড়া ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে যেন হেঁটে গেল হারানো সময়। শ্যামপুকুর স্ট্রিটের আলস্যঘেরা পার্ক পেরিয়ে এক একটা দিন যে কোথায় ভেসে যায়, কেউ জানেনা ; এক অন্য কলকাতা যখন ছুটে চলেছে কার্ল লুইসের মতো, তখন শোভাবাজার রাজবাড়ি, শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের পাশে “বিপজ্জনক বাড়ি” তকমাধারী দুঃখী এক প্রাচীন হাওয়ামহল , বাগবাজার ঘাটের কাছে রংচটা , হলুদ দেয়াল তখন স্মৃতি-বিস্মৃতির মধ্যে ভেসে আছে আবহমান। বৌবাজারের ভীম নাগের মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটা আলোছায়া সময়, ঝাপসা ট্রামে চড়ে ঢিমেতালে এগিয়ে চলে সামনের দিকে, উঠে যাওয়া সিনেমাহল, বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলা মদের ঠেক পেরিয়ে একটা ট্রাম ঢুকে পড়ে সত্তর দশকের কলেজ স্ট্রিটে, কফিহাউসের টেবিলে টেবিলে তখন নতুন দিনের স্বপ্ন, বিনয় লিখে চলেছেন “গায়ত্রী , ফিরে এসো, চাকার মত ফেরো …”, কমলকুমার মজুমদার ট্রাম থেকে নেমে পড়ে তড়িঘড়ি হেঁটে চলেছেন খালাসিটোলার দিকে, আর প্রেসিডেন্সির সামনের গেটে দাঁড়িয়ে ঘনঘন হাতঘড়ি দেখছে কাব্য-প্রিয় প্রেমিক। উত্তর কলকাতার অলি-গলি-পাকস্থলীর ভেতরেই তো রয়েছে এ শহরের গোপন রোম্যান্স, গুলু ওস্তাগর লেনের দোতলার বারান্দা থেকে ভেসে আছে বেথুন কলেজের দু-বিনুনী মেয়েটির চোখ। মনে হয় কথা কিছু বাকি রয়ে গেছে, এই গলিতেই তো গুলি লেগেছিল সত্তর দশকের পিঠে, আর তৃণাদিকে জোর করে চুমু খেয়েছিল বে -পাড়ার ছেলে। যে কলকাতা শপিং মল, বারিস্তা আর রংচঙে বহুতলের কলকাতা, যে কলকাতায় সকালের ভালবাসা সন্ধের মিথ্যে নিয়ন হয়ে যায়, যে কলকাতায় কেউ বলেছিল “দেখা হবে” কিন্তু আর দেখা হয়ে ওঠেনি কোনওদিন , সেই কলকাতা, উত্তর কলকাতা নয়। উত্তর মানে এক স্মৃতির শহর, বিশ্বায়নের হাঙরের হাঁ-মুখের সামনে দাঁড়ানো শেষ প্রতিবাদ, হানি সিংয়ের বিপরীতে গিরিশ ঘোষ , ফাঁকা ফ্ল্যাটের যৌনতার বিরুদ্ধে ভেসে থাকা অপাপবিদ্ধ প্রেমিক-চিলেকোঠা, গ্লাস ক্যাপসুল লিফটের উড়ালের বিপরীতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আহিরিটোলার গুলতানি-চাতাল, হিপ হপ গানের ডিস্কোপ্রিয়তার অপোজিটে বরানগরে ভাস্কর চক্রবর্তীর দেড়তলার ঘর, আইফোন এক্সের উল্টোদিকে শান্ত দাঁড়িয়ে থাকা লিটল ম্যাগাজিন।

নন্দলাল ও পশুপতি বসুর বাড়ি যা ছিল উনিশ শতকের শেষের দিকে জাতীয়বাদী আন্দোলনের আখড়া, সেই ইতিহাস-রঙের বাড়ি পেরিয়ে, বোসপাড়া, দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট, হরলাল মিত্র স্ট্রিটের আধো-আলো-আঁধার পেরিয়ে একদিন বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবের প্যান্ডেলে দেখা হয়ে যায় দময়ন্তীর সঙ্গে, বাগবাজার স্ট্রিটের দময়ন্তী মুখার্জি , যার সঙ্গে একদিন ছিল আলো দেওয়া নেওয়ার খেলা। আজ মহাসপ্তমী, “থিম ” পুজোর আগ্রাসন এখনও খেয়ে নিতে পারেনি উত্তর কলকাতার প্রাচীন পুজোগুলোকে, এখনও এখানে ঢাক আর ধূপ -ধুনোর কোলাজে দেবী আসেন কয়েকদিনের জন্যে। দময়ন্তীর সঙ্গে ঠিক কতদিন পর আজ দেখা, মনে পড়ল না, দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষন, তারপর প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলাম – “কেমন আছো ?” ; কিছুদূরেই বাগবাজার ঘাট, যা এককালে জমিদার রঘু মিত্রের ঘাট বলে পরিচিত ছিল , আমি আর দময়ন্তী ধীরে ধীরে পড়ন্ত বিকেলে এগিয়ে গেলাম ঘাটের দিকে। পেছনে ঢাকের শব্দ, সামনে গঙ্গা বয়ে চলেছে , নদীর জল অনেক গল্প জানে – আশা-আকাঙ্খা, জন্ম-মৃত্যু, ভালোবাসা-বিচ্ছেদের গল্প। দূরে, কয়েকটা নৌকা ভেসে চলেছে আনমনে, প্রকান্ড কমলালেবুর মত সূর্য ঢলে পড়ছে দিগন্তে, আমি আর দময়ন্তী পাশাপাশি বসে ছুঁয়ে নিচ্ছিলাম অনেক বছর আগেকার কিছু গুলমোহর। দময়ন্তী এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় সংসার করে, পুজোয় এসেছে বাবা-মায়ের কাছে। আমাদের বিশেষ কথা হয় না, শুধু নৈঃশব্দ আদান-প্রদান হয়, বাগবাজার সার্বজনীন প্যান্ডেলে ততক্ষনে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে উঠছে। বলুন কমরেড, উত্তর কলকাতা ছাড়া আর অন্য কোথাও এই ক্যানভাস পাবেন, পাবেন ঐতিহাসিক গলি-ঘুঁজি , নদী, ঘাট, অস্পষ্ট জানলায় বসে থাকা মুখ যার সঙ্গে কিছু কথা বাকি রয়ে গেছে? দেবীর ত্রিনয়ন জানে, যা যা হারিয়ে গেছে, তা আসলে হারায়নি, রয়ে গেছে হাওয়া-জল-নদীর ভেতর।
আসলে, যা বলেছি আগে, উত্তর কলকাতা কোনও জায়গা বা ভৌগোলিক অবস্থান নয়, উত্তর কলকাতা একটা বোধ, মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলা এক স্মৃতিপথ, সমস্ত ভাঙনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা দুঃখিত প্রতিবাদ, বিশ্বায়নের বিপরীতে কলার তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বলিভিয়া, বহুতল হয়ে যাওয়া শহরের পেটের নীচে চাপা পড়া সম্পর্কের দলিল। দক্ষিণ কলকাতার কিছু কিছু জায়গার মধ্যেও তাই রয়ে যায় উত্তর কলকাতার চিঠি –  দক্ষিণের কালীঘাট, ভবানীপুর অঞ্চলের অলি-গলির মধ্যে, শ্যাওলা-পাঁচিলের আঁকিবুঁকির মধ্যে, লোকাল কমিটির বন্ধ অফিসঘরের দেয়ালে, প্রাচীন শরিকি বাড়ির কার্নিশে, স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া পোষা হুলোবেড়ালের চোখে, সরস্বতী পুজোর চাঁদায়, সদানন্দ রোডের ছাদ থেকে উড়িয়ে দেওয়া পেটকাটি ঘুড়িতে, চিলেকোঠার ঘরের দেয়ালে গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনির পোস্টার-হাসিতে, “মা লক্ষ্মী জুয়েলার্স”-এর ঘুপচি ঘরে, “গ্র্যান্ড সেলুন”-এর ধুলোপড়া আয়নায়, বাবার যুবক মোটরসাইকেল আর মায়ের যুবতী ধনেখালি শাড়ির আঁচলে – তাই চিরকাল রয়ে যায় উত্তর কলকাতার পদছাপ। যা কিছু পুরোনো, যা কিছু হারাতে চায়নি কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে, যা কিছু চোখের কোণে মুক্তো আর মনের কোণে নীল রং, সবই আমাদের উত্তর কলকাতা, আমাদের দক্ষিণ কলকাতা, আমাদের কালীঘাট, আমাদের ভবানীপুর, আমাদের প্রতাপাদিত্য রোড, আমাদের গিরিশ পার্ক, আমাদের গুলু ওস্তাগর লেন।

গুলু ওস্তাগর লেন

জুন মাসের খরশান দুপুরে
গুলু ওস্তাগর লেনে ঘুরে মরছি
শিউচরণ সাউয়ের প্রাচীন বাড়ি পেরিয়ে
বন্ধ দর্জির দোকান , তার পাশে চওড়া রকে বসে
গুলতানি করছে উত্তর কলকাতা
আর আমি জিজ্ঞেস করছি –
“দাদা , ২৮/১ কোনদিকে হবে ?”
ডানদিক বেঁকে আবার ডানদিক, তারপর বাঁদিক চেপে
আরও একটা সরু গলির দিকে চলে যাচ্ছি
ছাতুর জল খেতে খেতে আমাকে মেপে নিচ্ছে
বিহারি রিক্সাচালক , নীচু ছাদ থেকে
যে ঝুঁকে আছে নীচে, তার কি দু-বিনুনি বেথুন কলেজ ?
জুন মাসের রোদে জ্বলা শ্রান্ত দুপুরে
গুলু ওস্তাগর লেন ঘুরে মরছে আমার ভেতরে
আর আমি জিজ্ঞেস করে চলেছি –
“২৮/১ কোনদিকে, কেউ বলছেননা কেন ?”
কেউ কিছু জানেনা এখানে , আমিও তো জানিনা
আজ কেন এখানে এলাম …
কেন মনে হয় নির্জন দুপুরে কবিতা শুনতে চেয়ে
আজ কেউ ভ্রু-পল্লবে ডাক দিয়েছে আমায় ?
গলির ভেতর গলি , শোভাবাজার মেট্রো পেরিয়ে
আজ একশো বছর ধরে গুলু ওস্তাগর লেন খুঁজে চলেছি
ডানদিক পেরিয়ে বাঁদিক , নীচু ছাদ থেকে ঝুঁকে পড়া চোরা চোখ
প্রাচীন পাঁচিলের পাশ থেকে সরে যাওয়া ছায়া
রকে বসে অনন্ত উত্তর কলকাতা গুলতানি
গুলু ওস্তাগর লেন নামে কোনো রাস্তা
উঁচু উঁচু ডিজাইনার এপার্টমেন্টের এ শহর
আজ আর চিনতে পারছে না ।

গুলু ওস্তাগর লেন, মোহনবাগান লেন , হাতিবাগান, আহিরীটোলায় ঘুরপাক খেয়ে মরছি, হাতড়ে বেড়াচ্ছি স্মৃতিমুখ, খুঁজে বেড়াচ্ছি বসন্তে হারিয়ে ফেলা প্রেমের গন্ধ, আর সন্ধে নেমে আসছে শহরের মাথার ওপর, ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে ল্যাম্পপোস্ট, উত্তর কলকাতাবিহীন একটা কলকাতা আঙুল তুলে বলে উঠছে – ” এই কে তুমি …কোথা থেকে এসেছো, কোথায় যাবে ? এখানে তোমার কোনও জায়গা নেই, এ শহরে কোনো পুরনো মোটিফ নেই, নতুন মোটিভ আছে, খাপ খাওয়াতে পারলে থাকো নইলে চলে যাও যেখানে যাবার …”
মনে হয়, কেউ ছিল পাশে একদিন, হেঁটেছিল পাশাপাশি কয়েকটা বছর, তারপর চলে গেছে কালের নিয়মে, ম্যাজিশিয়ানের আশ্চর্য ইশারায়। চলে গেছে বহুদূরে, আর দেখা হবে না কখনও , ছেড়েছে শহর, দেশ, সমস্ত সীমানা , অথচ একদিন ছিল, কাছে ছিল এতটাই, তার নিঃশ্বাস এখনও চোখের ওপর এসে পড়ে , আর চমকে উঠি হাজার মানুষের ভিড়ে। খুব শীত করে ওঠে, এই বাতাসে ভেসে আসা শীতলতা, এই কেঁপে উঠে সিগারেট ধরানো, শহরের ক্যানভাসে এই ছবি খুঁজে চলা – এই অমোঘ , অনিবার্য দূরত্ব অন্তরীণ করে নেবার নামই “উত্তর কলকাতা” ….পুরনো দালান, গাড়িবারান্দা , তেতলার গাছঘেঁষা ঘর, জানলায় ভেসে থাকা হারানো মানুষের মুখ – সবকিছু ভেঙে ভেঙে আমাদের শরীর ও মন স্কোয়্যার ফুটে মাপা হবে একদিন , একদিন রংচটা লেটারবক্স থেকে সময়ের রাস্তায় উপচে পড়বে ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্কের চিঠি, সেদিন আর কোনো উত্তর কলকাতা থাকবেনা , কোনো কান্না থাকবেনা , সবকিছু চকচকে, রঙীন হয়ে যাবে , শপিং মলের হাঁ-মুখের ভেতরে ঢুকে পড়বে হাসিখুশি জোকার। নিমতলা ঘাটের গাঁজার ধোঁয়ায় ভেসে উঠবে পূর্বজন্ম , জোড়াসাঁকো থেকে ছুটতে শুরু করবে মেহের আলি , “সব ঝুট হ্যায় …” বলতে বলতে মিলিয়ে যাবে হাওয়ায় , ভিন গ্রহ থেকে নেমে এসে শহরের দখল নেবে এলিয়েনের দল …

 

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

0Shares
0
যুগান্তর Exclusive সৌভিক কথা